কাজটা ফেলে রাখলে যে পরে সমস্যা হবে, সেটা পুরোপুরি জানা আছে। ডেডলাইন কাছে আসছে, রাতে ঘুম কম হবে, শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করতে হবে, এই পুরো চিত্রটাই স্পষ্ট মাথায় আঁকা। তবু কাজটা শুরু হয় না। এই সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়টাই মনোবিজ্ঞানের একটা পুরনো ধাঁধা, প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা একে বলতেন akrasia, নিজের ভালো জেনেও তার বিপরীতে কাজ করা।
মনোবিজ্ঞানী পিয়ার্স স্টিল procrastination-কে সংজ্ঞায়িত করেছেন ঠিক এভাবেই, “worse off হবে জেনেও কাজ পিছিয়ে দেওয়া”। এটা কোনো সাধারণ দেরি না, এটা একটা সচেতন সিদ্ধান্ত, যেটা নিজের ভবিষ্যতের ক্ষতির বিপরীতে গিয়ে নেওয়া হয়। চলো দেখি, কেন যুক্তি জেনেও মানুষ বারবার এই একই ফাঁদে পড়ে।
Intention-Action Gap, জানা আর করার মাঝখানের ফাঁক
পিয়ার্স স্টিল আর তার সহকর্মীদের একটা বড় গবেষণায়, যেখানে সাত হাজারেরও বেশি মানুষের ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, দেখা গেছে procrastination সরাসরি যুক্ত intention-action gap-এর সাথে, ইচ্ছা আর কাজের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্বের সাথে, নিজের ইচ্ছার সাথে না। মানুষ ঠিকই ইচ্ছা করে সময়মতো কাজ শুরু করার, কিন্তু সেই ইচ্ছাটা বাস্তব কাজে রূপান্তরিত হতে গিয়ে বাধা পায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ইচ্ছা আর কাজের মধ্যে সময়ের দূরত্ব যত বেশি হয়, এই ফাঁকটাও তত বড় হতে থাকে।
Temporal Motivation Theory, সময় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
স্টিল আর König-এর তৈরি temporal motivation theory ব্যাখ্যা করে, কেন মানুষ ভবিষ্যতের পুরস্কারকে কম গুরুত্ব দেয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটা কাজের প্রতি মানুষের প্রেরণা নির্ভর করে চারটা বিষয়ের ওপর, কাজটা সফল হওয়ার প্রত্যাশা, তার মূল্য, ডেডলাইনের দূরত্ব, আর বিলম্বের প্রতি সংবেদনশীলতা। ডেডলাইন যত দূরে থাকে, প্রেরণা তত কমে যায়, একটা hyperbolic curve মেনে। এই কারণেই এক মাস পরের একটা পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা শুরু করাটা এত কঠিন মনে হয়, যদিও যুক্তিসঙ্গতভাবে সেটাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
যা সত্যিই predict করে procrastination
৬৯১টা গবেষণার একটা বিশাল মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, procrastination-এর সবচেয়ে শক্তিশালী পূর্বাভাসকারী বিষয়গুলো হলো কাজের প্রতি বিরক্তি, কাজ কতটা দূরে ফেলে রাখা হয়েছে, নিজের সামর্থ্যের প্রতি আস্থা, আর impulsiveness। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, নিউরোটিসিজম বা বিদ্রোহী মানসিকতার সাথে procrastination-এর সম্পর্ক আসলে খুবই দুর্বল। অর্থাৎ, procrastination ব্যক্তিত্বের কোনো গভীর ত্রুটি না, এটা মূলত একটা স্ব-নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা, যেখানে মনোযোগ ধরে রাখা, শক্তি ব্যবস্থাপনা, আর অভ্যাস তৈরির মতো দক্ষতাগুলোই আসল ভূমিকা রাখে।
প্রলোভনের নৈকট্য কীভাবে সিদ্ধান্ত বদলে দেয়
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, procrastinator-রা প্রলোভনের নৈকট্যের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। ফোনটা হাতের কাছে থাকা, একটা মজার ভিডিওর নোটিফিকেশন আসা, এই তাৎক্ষণিক প্রলোভনগুলো দূরের, বিমূর্ত পুরস্কারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে হয়, যদিও যুক্তিসঙ্গতভাবে জানা থাকে কোনটা আসলে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজেকে ক্ষমা করাই ভাঙার প্রথম ধাপ
একটা গুরুত্বপূর্ণ প্যারাডক্স হলো, procrastination নিয়ে নিজেকে দোষারোপ করাটা সমস্যাটাকে আরও গভীর করে তোলে। অপরাধবোধ আর লজ্জা মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়, আর চাপ বেড়ে গেলে মানুষ আবারও এড়িয়ে চলার দিকেই ঝোঁকে, একটা দুষ্টচক্র তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতের procrastination-এর জন্য নিজেকে ক্ষমা করতে পারা মানুষদের মধ্যে ভবিষ্যতে একই আচরণ পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে, কারণ ক্ষমা মানসিক ভার কমিয়ে দেয়, আর ভবিষ্যতের কাজে মনোযোগ দেওয়ার জায়গা তৈরি করে দেয়।
চক্রটা ভাঙার কার্যকর কিছু উপায়
– দূরের ডেডলাইনকে কাছাকাছি ছোট মাইলফলকে ভাগ করা, যাতে temporal motivation theory অনুযায়ী প্রেরণা কমে যাওয়ার সমস্যাটা কমে
– প্রলোভনগুলো চোখের আড়ালে রাখা, কাজের সময় ফোন অন্য ঘরে রাখা বা নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা
– প্রথম পাঁচ মিনিটের একটা ছোট প্রতিশ্রুতি দেওয়া নিজেকে, পুরো কাজ শেষ করার চাপ ছাড়াই
– attention control আর energy regulation-এর মতো দক্ষতা অনুশীলন করা, কারণ গবেষণায় এই দুটোই procrastination ব্যাখ্যা করার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে
– অতীতের বিলম্বের জন্য নিজেকে ক্ষমা করা, শাস্তি দেওয়ার বদলে
জেনেশুনে নিজের ক্ষতি করাটা অদ্ভুত শোনায়, কিন্তু এটাই মানুষের মনের একটা বাস্তব প্যাটার্ন, যুক্তি আর তাৎক্ষণিক প্রলোভনের মধ্যে একটা চিরন্তন টানাপোড়েন। এই সত্যিটা বোঝাই প্রথম মুক্তি, procrastination কোনো নৈতিক দুর্বলতা না, এটা সময়ের সাথে মানুষের সম্পর্কের একটা জটিল রসায়ন। আর যেকোনো জটিল সমস্যার মতো, এটাও সমাধান হয় ছোট ছোট, বাস্তবসম্মত পদক্ষেপে, নিখুঁত ইচ্ছাশক্তিতে না।

