কোনো নোটিফিকেশন নেই, কোনো নতুন মেসেজ নেই, তবু হাতটা নিজে থেকেই পকেটের দিকে চলে যায়। ফোনটা আনলক করে স্ক্রিনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আবার রেখে দাও, কিছুই না দেখেই। গড়পড়তা একজন মানুষ দিনে দেড়শ বারেরও বেশি ফোন চেক করে, প্রতিদিন প্রায় ১২০টারও বেশি নোটিফিকেশনের চাপে। এই অভ্যাসটাকে ইচ্ছাশক্তির অভাব মনে হতে পারে, কিন্তু নিউরোসায়েন্স বলছে এর পেছনে আছে একটা সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত মেকানিজম।
স্ট্যানফোর্ডের অ্যাডিকশন মেডিসিন ক্লিনিকের প্রধান ডা. আনা লেমকে ফোনকে বলেছেন “আধুনিক যুগের হাইপোডার্মিক নিডল”, প্রতিটা নোটিফিকেশন, লাইক, আর স্ক্রলের সাথে সামান্য একটু করে ডোপামিন শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়ার একটা যন্ত্র। চলো দেখি, মস্তিষ্কের ভেতরে ঠিক কী ঘটে, যার কারণে ফোন চেক করাটা এতটা কঠিন অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডোপামিন, আনন্দের রাসায়নিক না, প্রত্যাশার রাসায়নিক
সবচেয়ে বড় একটা ভুল ধারণা হলো, ডোপামিনকে “আনন্দের রাসায়নিক” মনে করা। বাস্তবে ডোপামিন হলো প্রত্যাশার রাসায়নিক। মস্তিষ্ক এটা নিঃসরণ করে পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশায়, পুরস্কারটা হাতে পাওয়ার সময় না। কিছু একটা ভালো ঘটার সংকেত পেলেই ডোপামিন নিঃসৃত হয়, ফোনটা হাতে তোলার মুহূর্তেই। এই কারণেই দশম বারের স্ক্রলিং প্রথমবারের চেয়ে কম আনন্দদায়ক মনে হয়, ডোপামিন তো আগেই নিঃসৃত হয়ে গেছে, ফোন হাতে নেওয়ার সময়েই।
স্লট মেশিনের মতোই কাজ করে সোশ্যাল মিডিয়া
মানুষের মস্তিষ্ক নিশ্চিত পুরস্কারের চেয়ে অনিশ্চিত পুরস্কারে বেশি ডোপামিন নিঃসরণ করে, ঠিক যেভাবে স্লট মেশিনের লিভার টানার সময় কাজ করে। মেসেজটা কারো কাছ থেকে এসেছে নাকি স্প্যাম, ছবিতে নতুন লাইক পড়েছে নাকি কিছুই না, এই অনিশ্চয়তাটাই আসক্তি তৈরি করে। একে বলা হয় variable reward schedule, আর গবেষকরা বলছেন এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী আসক্তিমূলক প্যাটার্ন যা এখন পর্যন্ত চিহ্নিত হয়েছে। ইনফিনিট স্ক্রল আর র্যান্ডম নোটিফিকেশন, দুটোই বিজ্ঞানসম্মতভাবে ডিজাইন করা হয়েছে ঠিক এই মেকানিজমকে কাজে লাগানোর জন্য।
মস্তিষ্কের গঠনে বাস্তব পরিবর্তন
২০২৫ সালের একটা নিউরোইমেজিং মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, nucleus accumbens আর anterior cingulate cortex, এই দুটো অংশ, যেগুলো ডোপামিন-চালিত পুরস্কার আর craving-এর কেন্দ্রবিন্দু, স্মার্টফোন আসক্তিতে আক্রান্ত মানুষ আর মাদকাসক্ত মানুষের মধ্যে প্রায় একই রকম প্যাটার্নে সক্রিয় হয়ে ওঠে, যখন তারা সংশ্লিষ্ট উদ্দীপকের মুখোমুখি হয়। একই স্নায়ুপথ, একই মেকানিজম। ২০২৫-২০২৬ সালের একাধিক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া আর স্মার্টফোন ব্যবহার কম কগনিটিভ পারফরম্যান্স, দুর্বল স্মৃতিশক্তি, আর মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তনের সাথেও যুক্ত, যার মধ্যে আছে cortical thickness কমে যাওয়া।
তাৎক্ষণিক পুরস্কারের নেশা
ঐতিহ্যবাহী বিনোদন, একটা সিনেমা বা একটা বই, উপভোগ করতে সময় লাগে, ধৈর্য লাগে। কিন্তু স্মার্টফোন অ্যাপগুলো ঠিক এর উল্টো, প্রতিটা কাজের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেয়, নোটিফিকেশন, লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে। গবেষণায় ফোন আসক্তির তিনটা প্রধান মেকানিজম চিহ্নিত করা হয়েছে, variable reward-চালিত ডোপামিন লুপ, অ্যাপ ডিজাইনে গেঁথে দেওয়া তাৎক্ষণিক পুরস্কার সিস্টেম, আর নেতিবাচক আবেগ সামলানোর জন্য এড়িয়ে যাওয়ার একটা কৌশল হিসেবে ফোন ব্যবহার।
আবেগ এড়ানোর একটা হাতিয়ার হিসেবে ফোন
গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোন ব্যবহার শরীরে dopaminergic reward system সক্রিয় করে, ঠিক অন্যান্য আচরণগত আসক্তির মতোই। এটা compulsive checking-এর প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়, আর সময়ের সাথে সাথে তাৎক্ষণিক তৃপ্তি বিলম্বিত করার ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। জর্ডানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর করা একটা গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোন আসক্তি সরাসরি মানসিক কষ্টের সাথে যুক্ত, শুধু একটা উপসর্গ না, একটা স্বতন্ত্র আচরণগত আসক্তি হিসেবেই এটা চিহ্নিত হচ্ছে ক্রমশ।
চক্রটা ভাঙার উপায়
– ফোন থেকে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে দেওয়া, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের
– নির্দিষ্ট সময়ে ফোন ব্যবহারের একটা সীমা ঠিক করা, সারাদিন এলোমেলোভাবে চেক করার বদলে
– পড়াশোনা বা কাজের সময় ফোন হাতের নাগালের বাইরে রাখা
– শরীরচর্চা, হাঁটা, বা অন্য কোনো শখে সময় দেওয়া, যা মস্তিষ্ককে বিকল্প, স্বাস্থ্যকর একটা রিওয়ার্ড সোর্স দেয়
– হঠাৎ পুরোপুরি বন্ধ করার বদলে ধীরে ধীরে ব্যবহার কমিয়ে আনার কৌশল অনুসরণ করা, যা গবেষণায় বেশি টেকসই বলে প্রমাণিত
ফোন বারবার চেক করাটা ইচ্ছাশক্তির অভাব না, এটা একটা নিখুঁতভাবে ডিজাইন করা সিস্টেমের প্রত্যাশিত ফলাফল, যেটা মস্তিষ্কের প্রাচীন পুরস্কার ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এই সত্যিটা জানা মানেই নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করা, আর সচেতনভাবে এমন কিছু সীমারেখা তৈরি করা, যেগুলো এই সিস্টেমটাকে পুরোপুরি জয়ী হতে না দেয়।

