২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে স্টার্টআপ খাতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির প্রথম বড় বাস্তবায়ন দেখা গেল ১৬ আগস্ট, যখন ঢাকার আইসিটি বিভাগে এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলো ‘বাংলাদেশ ফান্ড অব ফান্ডস’। সরকারের মালিকানাধীন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড (এসবিএল) এই তহবিলের ব্যবস্থাপনায় থাকছে, আর এর প্রাথমিক আকার ৪০০ কোটি টাকা, প্রায় ৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
কিন্তু এই টাকা সরাসরি কোনো স্টার্টআপের হাতে যাচ্ছে না। পুরো মডেলটাই আসলে ভিন্ন, আর সেটাই এই ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফান্ড অব ফান্ডস আসলে কী
এসবিএলের এখন পর্যন্ত পরিচিত কাজ ছিল সরাসরি স্টার্টআপে বিনিয়োগ করা, যেমনটা তারা করেছে চালডাল বা হিসাব টেকনোলজিসের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ফান্ড অব ফান্ডস এই পথে হাঁটছে না।
এই তহবিল সরাসরি কোনো স্টার্টআপে যাবে না, বরং যাবে বাছাই করা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড ম্যানেজারদের কাছে। এরপর সেই ফান্ড ম্যানেজাররা তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ কৌশল অনুযায়ী বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলোতে টাকা ঢালবেন। সহজ কথায়, সরকার এখানে সরাসরি বিনিয়োগকারী না হয়ে হয়ে উঠছে পেশাদার বিনিয়োগকারীদের পেছনের পুঁজির উৎস।
শর্তটাও স্পষ্ট। কোনো ফান্ড ম্যানেজার যদি এই তহবিল থেকে টাকা পান, তাহলে তাকে অন্তত সমান পরিমাণ টাকা বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করতে হবে। একে বলা হচ্ছে ১:১ ম্যাচিং শর্ত। এর মাধ্যমে সরকারি টাকার প্রতিটি টাকা কার্যত দ্বিগুণ হয়ে বাজারে ঢুকবে।
কারা টাকা পাবে
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির জায়গা। এই তহবিল থেকে সরাসরি টাকা পাবেন “ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড ম্যানেজাররা”, কোনো একক স্টার্টআপ নয়।
এসবিএলের ভাষ্য অনুযায়ী, যে ফান্ড ম্যানেজারদের বিবেচনা করা হবে তাদের থাকতে হবে:
– শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক গভর্নেন্স
– পেশাদার ফান্ড ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা
– বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট বা পরিকল্পনা
– বিশ্বাসযোগ্য বিনিয়োগ কৌশল ও ট্র্যাক রেকর্ড
স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক, তিন ধরনের ফান্ড ম্যানেজারই আবেদন করতে পারবেন। খাতভিত্তিক কোনো কড়াকড়ি নেই, তবে আর্থিক সেবা, ই-কমার্স, লজিস্টিকস, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষির মতো উচ্চ-প্রবৃদ্ধির খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আর যে স্টার্টআপগুলো শেষ পর্যন্ত উপকৃত হবে, তারা হলো বাংলাদেশে নিবন্ধিত সিড ও গ্রোথ স্টেজের উদ্যোগ, যাদের মধ্যে ইতিমধ্যে একটা ন্যূনতম প্রোডাক্ট এবং গ্রাহক বা রেভিনিউ বৃদ্ধির প্রমাণ আছে। কিন্তু তারা টাকা পাবে ফান্ড ম্যানেজারদের মাধ্যমে, এসবিএলের কাছে সরাসরি আবেদন করে নয়।
কীভাবে আবেদন করতে হবে
এসবিএল এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে একটি “রিকোয়েস্ট ফর এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (REOI)” এর মাধ্যমে। এটাই এখন আবেদনের একমাত্র বৈধ পথ।
ফান্ড ম্যানেজারদের জন্য প্রক্রিয়াটা এমন:
– এসবিএলের ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রথমে সম্পূর্ণ REOI ডকুমেন্ট পড়ে নিতে হবে
– ফান্ড ম্যানেজারদের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড যাচাই করে নিতে হবে
– ওয়েবসাইটের নির্ধারিত ফর্মে এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (EOI) জমা দিতে হবে
– এসবিএলের যাচাই ও নির্বাচন প্রক্রিয়া পার হলে তহবিল বরাদ্দের আলোচনা শুরু হবে
যারা এই মুহূর্তে সরাসরি বিনিয়োগ পেতে চান, অর্থাৎ স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতারা, তাদের জন্য পথটা ভিন্ন। এসবিএলের নিজস্ব ভেঞ্চার ক্যাপিটাল শাখা এখনও সচল আছে এবং আগের মতোই সরাসরি স্টার্টআপ বিনিয়োগ চালিয়ে যাবে। সেখানে আবেদন করতে হয় এসবিএলের ওয়েবসাইটের পৃথক ‘অ্যাপ্লিকেশন ফর ইনভেস্টমেন্ট’ পোর্টাল থেকে, ফান্ড অব ফান্ডসের REOI প্রক্রিয়া থেকে নয়।
কেন এই মডেল, কেন এখন
পরিসংখ্যানটা কারণ ব্যাখ্যা করে। এসবিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলো প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে, কিন্তু তার মধ্যে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল মাত্র ৭ শতাংশের মতো। দেশে পেশাদার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেমের ঘাটতিই এর মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তহবিলটি একটি বৃহত্তর নীতিগত প্যাকেজের অংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শূন্য শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্সের মতো কর ও ভ্যাট সুবিধা। এই তহবিল তারই পরের ধাপ।
অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এমপি প্রধান অতিথি ছিলেন, আর প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেছেন, বাংলাদেশের ঘাটতি প্রতিভা বা আইডিয়ার নয়, ঘাটতি এমন একটা ব্যবস্থার, যেখানে ভালো আইডিয়া টাকার অভাবে থেমে যাবে না। জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার প্রতিনিধিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, যা এই তহবিলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার দিকটিও স্পষ্ট করে।
সংক্ষেপে যা জানা জরুরি
– তহবিলের নাম: বাংলাদেশ ফান্ড অব ফান্ডস, ব্যবস্থাপনায় স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড
– প্রাথমিক আকার: ৪০০ কোটি টাকা (প্রায় ৩৩ মিলিয়ন ডলার), ভবিষ্যতে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে
– টাকা যাবে: ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড ম্যানেজারদের কাছে, স্টার্টআপে সরাসরি নয়
– শর্ত: ফান্ড ম্যানেজারকে বাংলাদেশে অন্তত সমপরিমাণ (১:১) বিনিয়োগ করতে হবে
– তহবিলের মেয়াদ: ৩০ বছর
– আবেদনের পথ: REOI পড়ে এসবিএলের ওয়েবসাইট থেকে EOI জমা দেওয়া
– স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতাদের সরাসরি বিনিয়োগের জন্য পথ ভিন্ন, এসবিএলের নিজস্ব ভিসি শাখার মাধ্যমে
৪০০ কোটি টাকা নিজেই খুব বড় অঙ্ক নয়, বিশেষ করে যখন গত এক দশকে দেশের স্টার্টআপগুলো একাই ১.২ বিলিয়ন ডলার তুলেছে। কিন্তু এই তহবিলের আসল পরীক্ষা তার আকারে নয়, বরং সে কতটা বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক পুঁজি টেনে আনতে পারে তাতে। যদি ১:১ ম্যাচিং শর্তটা বাস্তবেই কাজ করে, তাহলে এই ৪০০ কোটি টাকা কার্যত দ্বিগুণ বা তার বেশি পুঁজি বাজারে টানতে পারে। তবে এই পরিকল্পনা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে বাছাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আর বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতার ওপর, ঘোষণার আড়ম্বরের ওপর নয়।

