রাত একটা বেজে গেছে। ফোনের স্ক্রিনে আলো জ্বলছে, চোখ জ্বালা করছে, তবু মনে মনে বলছেন, “আর একটু, কাজটা শেষ করেই শুয়ে পড়ব।”
চেনা দৃশ্য, তাই না? আমাদের সংস্কৃতিতে ঘুম কমানো প্রায় গর্বের ব্যাপার। যে যত কম ঘুমায়, সে তত পরিশ্রমী। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়। এটা মস্তিষ্কের সবচেয়ে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের সময়।
ঘুমালে মস্তিষ্ক আসলে কী করে?
আমরা ভাবি, ঘুমালে মস্তিষ্কও বিশ্রাম নেয়। আসলে ঘুমের সময়েই সে সবচেয়ে ব্যস্ত থাকে।
২০১৩ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী মাইকেন নেডারগার্ডের গবেষণা দল Science জার্নালে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার প্রকাশ করে। তারা দেখান, ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কোষের মাঝের ফাঁক বড় হয়ে যায় এবং সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সেই পথে প্রবাহিত হয়ে জমে থাকা বর্জ্য ধুয়ে নিয়ে যায়। এই ব্যবস্থার নাম “গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম”। এই বর্জ্যের মধ্যে বিটা-অ্যামাইলয়েডও আছে, যে প্রোটিন আলঝেইমার্স রোগের সঙ্গে জড়িত বলে ধরা হয়।
সহজ করে বললে, সারাদিন কাজ করতে করতে মস্তিষ্কে যে জঞ্জাল জমে, ঘুম তাকে পরিষ্কার করে। ঘুম না হলে সেই জঞ্জাল জমতেই থাকে।
শুধু পরিষ্কার নয়, ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের স্মৃতিগুলো গুছিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে পাঠায়। পরীক্ষার আগের রাতে যা পড়লেন, তা মাথায় গেঁথে নেওয়ার কাজটা হয় ঘুমের মধ্যেই। সারারাত জেগে পড়ে পরদিন সব গুলিয়ে ফেলার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। এর পেছনে এটাই কারণ।
“আমার ৬ ঘণ্টাতেই চলে যায়”, সত্যিই?
অনেকেই এ কথা বলেন। কিন্তু ২০০৩ সালে Sleep জার্নালে প্রকাশিত ভ্যান ডঙ্গেন ও সহকর্মীদের একটি বিখ্যাত গবেষণা এই বিশ্বাসে ধাক্কা দেয়। অংশগ্রহণকারীদের টানা দুই সপ্তাহ প্রতিরাতে ৬ ঘণ্টা ঘুমাতে দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়, তাদের মনোযোগ ও কাজের সক্ষমতা এতটাই কমে গিয়েছিল যে অবস্থা প্রায় দুই রাত না ঘুমানোর কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
সবচেয়ে চমকের কথা হলো, তারা নিজেরা মনে করছিলেন তারা ঠিকই আছেন। অর্থাৎ ঘুমের অভাবে আমাদের কর্মক্ষমতা কমে, আর সেই কমে যাওয়াটা টের পাওয়ার ক্ষমতাও কমে যায়।
আরেকটি গবেষণায় (Williamson ও Feyer, ২০০০) দেখা গেছে, টানা ১৭ থেকে ১৯ ঘণ্টা জেগে থাকলে কাজের দক্ষতা কমে প্রায় ০.০৫% অ্যালকোহল মাত্রার মানুষের কাছাকাছি নেমে আসে। অর্থাৎ ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো বা জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের ভাবনার চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকির।
মস্তিষ্ক ছাড়াও আরও অনেক কিছু
ঘুমের অভাবের প্রভাব শুধু মাথায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
– মেজাজ: অল্প ঘুমে খিটখিটে ভাব, দুশ্চিন্তা ও মন খারাপ বাড়ে। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা বিষণ্নতার ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত।
– রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ঘুম কম হলে শরীর সহজে অসুস্থ হয়।
– হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিস: দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে এসবের ঝুঁকি বাড়ার প্রমাণ মিলেছে।
সংস্থাগুলো সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিরাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেয়। মার্কিন সিডিসি এবং আমেরিকান একাডেমি অফ স্লিপ মেডিসিনও এই মাত্রাই বলে।
আজ রাত থেকেই শুরু করুন
বড় কোনো পরিবর্তন লাগবে না। ছোট কয়েকটি অভ্যাসই যথেষ্ট:
– প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং উঠুন, ছুটির দিনেও।
– ঘুমের আধা ঘণ্টা আগে ফোন সরিয়ে রাখুন। স্ক্রিনের আলো ও অন্তহীন স্ক্রলিং ঘুম পিছিয়ে দেয়।
– বিকেলের পর চা-কফি এড়িয়ে চলুন। ক্যাফেইন শরীরে অনেকক্ষণ থাকে।
– ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখুন।
– মাথায় চিন্তার ভিড় থাকলে ঘুমের আগে খাতায় পরদিনের কাজগুলো লিখে ফেলুন। মাথা হালকা লাগবে।
আমরা সবাই জীবনে কিছু একটা হয়ে উঠতে চাই। সাফল্য, স্বপ্ন, নিজের এবং প্রিয়জনদের জন্য ভালো একটা ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই স্বপ্ন দেখার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার, ভালোবাসার আর হাসার মতো মস্তিষ্কটাই যদি ক্লান্ত আর ভেঙে পড়ে, তাহলে এত দৌড়ঝাঁপ কার জন্য? কাজ আগামীকালও থাকবে। ইমেইল আগামীকালও আসবে। কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক আজ রাতেই আপনার কাছে একটু যত্ন চাইছে।
তাই আজ, ঠিক এখনই, স্ক্রিনটা বন্ধ করুন। আলো নিভিয়ে দিন। কারণ ঘুমানো মানে কাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। ঘুমানো মানে কালকের জন্য নিজেকে নতুন করে তৈরি করা।
শুভ রাত্রি।

