একটা আইডিয়া, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে ভাবনা থেকে শুরু হওয়া একটা প্রজেক্ট, শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেল সিউল পর্যন্ত। আর সেখানে গিয়ে ১৬টা দেশের ২৫২টা দলকে পেছনে ফেলে সবার ওপরে জায়গা করে নিল বাংলাদেশের দুই শিক্ষার্থীর একটা দল। এটা কোনো সিনেমার গল্প না, এই মাসেই ঘটে যাওয়া বাস্তব একটা অর্জন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত ১৬তম ই-আইকন ওয়ার্ল্ড কনটেস্ট ২০২৬-এ প্রথম স্থান অর্জন করেছে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের দুই শিক্ষার্থী, মো. শফিউল আলম সিদ্দিকী শ্রেষ্ঠ আর অরণ্য আবীর খান প্রাপ্য। তাদের দল “অরূপ-বিট” জিতে নিয়েছে প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় সম্মাননা, “কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের শিক্ষামন্ত্রী পুরস্কার”।
যে প্রতিযোগিতায় ৭৫৬ জনের মধ্যে সেরা দশে জায়গা করে নেওয়াই কঠিন
এই বছরের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল ১৬টা দেশের ২৫২টা দল, প্রায় ৭৫৬ জন শিক্ষার্থী আর শিক্ষক। এত বিশাল অংশগ্রহণের মধ্য থেকে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা পেয়েছিল মাত্র ৮টা দেশের ১০টা দল। ৩ থেকে ৭ আগস্ট সিউলে অনুষ্ঠিত হওয়া এই চূড়ান্ত পর্ব শেষে ৭ আগস্ট স্ট্যানফোর্ড হোটেল সিউলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হয় চ্যাম্পিয়নের নাম, অরূপ-বিট। প্রতিযোগিতাটির আয়োজক ছিল কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আর ব্যবস্থাপনায় ছিল কোরিয়া ডিজিটাল এডুকেশন ফ্রন্টিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন।
অরূপ-বিট দলটা শুধু বাংলাদেশের দুই শিক্ষার্থীর না, এটা ছিল একটা আন্তর্জাতিক টিম। শ্রেষ্ঠের নেতৃত্বে এই চার সদস্যের দলে ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সিওংজে মিডল স্কুলের দুই শিক্ষার্থী, ইউনকিউ লি আর জুনমো কিমও।
লাইটহাউস, একটা অ্যাপ যেটা কিশোর-কিশোরীদের মনের কথা শোনে
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৩, “সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ” নিয়ে কাজ করে দলটা তৈরি করেছে “লাইটহাউস” নামের একটা এআই ওয়েলনেস ওয়েব অ্যাপ, যা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সুস্থতায় সহায়তা করার জন্য বানানো। অ্যাপটির কেন্দ্রে আছে “লুমি” নামের একটা এআই সঙ্গী, যেটা বাংলা, ইংরেজি, আর কোরিয়ান, এই তিন ভাষাতেই কথা বলতে পারে। ভাষার এই বৈচিত্র্যই দেখিয়ে দেয়, প্রজেক্টটা শুরু থেকেই একটা বৈশ্বিক দর্শকের কথা মাথায় রেখে বানানো হয়েছিল।
শুধু সফটওয়্যারেই থেমে থাকেনি দলটা। তারা তৈরি করেছে “লাইটহাউস বিকন” নামে একটা স্ক্রিনবিহীন হার্ডওয়্যার ডিভাইসও, যেটা এমন কিশোর-কিশোরীদের জন্য বানানো, যারা মাঝে মাঝে ফোন থেকে একটু বিরতি নিতে চায়। মানসিক স্বাস্থ্যের একটা অ্যাপ বানাতে গিয়ে ফোন থেকে দূরে থাকার একটা সমাধানও ভেবে রাখাটাই বলে দেয়, দলটা সমস্যাটাকে কতটা গভীরভাবে বুঝেছিল।
যাদের হাত ধরে এই যাত্রা সম্ভব হয়েছে
এই পুরো প্রজেক্টের পেছনে তত্ত্বাবধানে ছিলেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষক সৈয়দ মাহবুব হাসান আমিরী আর সিওংজে মিডল স্কুলের শিক্ষক সানইয়ং ইউন। দুই দেশের দুই শিক্ষকের এই যৌথ তত্ত্বাবধানও একটা উদাহরণ তৈরি করে, কীভাবে সীমানা পেরিয়ে একটা আইডিয়া বড় হতে পারে।
এই অর্জনের খবর দক্ষিণ কোরিয়ার গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে এই সাফল্যের গুরুত্ব শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
একটা ছোট্ট আইডিয়া থেকে বিশ্বমঞ্চ পর্যন্ত
শ্রেষ্ঠ আর আবীরের এই গল্পটা আসলে সেই সত্যিটাই আবার মনে করিয়ে দেয়, একটা ভালো আইডিয়ার সাথে যদি ধারাবাহিক পরিশ্রম আর সঠিক দিকনির্দেশনা যোগ হয়, তাহলে স্কুল বা কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে সেটা পৌঁছে যেতে পারে বিশ্বমঞ্চ পর্যন্ত। মানসিক স্বাস্থ্যের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই উপেক্ষিত বিষয় নিয়ে কাজ করা, আর সেটাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তব একটা সমাধানে রূপান্তরিত করা, এই পুরো যাত্রাটাই বাংলাদেশের তরুণ উদ্ভাবকদের জন্য একটা অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

