মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২৬
HomeWellbeingPositive Thinkingভেতরে ভয় থাকলেও বাইরে আত্মবিশ্বাসী হবেন যেভাবে

ভেতরে ভয় থাকলেও বাইরে আত্মবিশ্বাসী হবেন যেভাবে

ক্লাসে প্রশ্নের উত্তরটা আপনি জানতেন। হাতটা অর্ধেক উঠেও গেল। তারপর মনে হলো, “যদি ভুল হয়? সবাই কী ভাববে?” হাত নেমে গেল। আর কয়েক সেকেন্ড পরে অন্য কেউ ঠিক সেই উত্তরটাই দিল। এই অনুভূতিটা চেনা, তাই না?

আমাদের চারপাশে উপদেশের অভাব নেই: “আত্মবিশ্বাসী হওয়ার ভান করো, একসময় সত্যিই হয়ে যাবে।” কিন্তু যার ভেতরটা কাঁপছে, তার কাছে ভান করাটা আরও ক্লান্তিকর। মনে হয় প্রতিদিন একটা মুখোশ পরে আছি, আর যেকোনো মুহূর্তে সেটা খুলে পড়বে।

সুখবর হলো, আত্মবিশ্বাসের জন্য মুখোশ লাগে না। লাগে প্রমাণ।

আত্মবিশ্বাস আসলে কী?

মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট ব্যান্ডুরা ১৯৭৭ সালে “self-efficacy” ধারণাটি দেন। সহজ করে বললে, এটি হলো “আমি চেষ্টা করলে কাজটা করতে পারব” এই বিশ্বাস। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, এই বিশ্বাসের সবচেয়ে শক্তিশালী উৎস হলো নিজের আগের ছোট ছোট সফলতা, জোর করে নিজেকে “তুমি পারবে!” বলা নয়।

অর্থাৎ আত্মবিশ্বাস কোনো মেজাজ বা জন্মগত গুণ নয়। এটা জমানো প্রমাণের একটা ভান্ডার। যত প্রমাণ, তত ভরসা।

১. ভান নয়, ছোট প্রতিশ্রুতি রাখুন

বড় লক্ষ্য দিয়ে শুরু করবেন না। আজ ১০ মিনিট পড়বেন, একটা ইমেইলের উত্তর দেবেন, একটা প্রশ্ন করবেন, ব্যস। হার্ভার্ডের গবেষক টেরেসা অ্যামাবিলের কর্মক্ষেত্র-গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থপূর্ণ কাজে ছোট অগ্রগতিও মানুষের আবেগ ও আত্মমূল্যবোধ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। নিজের সঙ্গে করা ছোট প্রতিশ্রুতি রাখলে মস্তিষ্ক একটা বার্তা পায়: “আমি নির্ভরযোগ্য।”

২. ভয়কে ভয় পাবেন না, নাম পাল্টে দিন

প্রেজেন্টেশনের আগে বুক ধড়ফড় করছে? “শান্ত হও” বলে নিজেকে থামানোর চেষ্টা প্রায়ই কাজ করে না। অ্যালিসন উড ব্রুকসের একটি গবেষণায় (২০১৪) দেখা গেছে, উদ্বেগের মুহূর্তে নিজেকে “আমি উত্তেজিত” বললে গান, বক্তৃতা ও অঙ্কের পারফরম্যান্স তুলনামূলক ভালো হয়েছে। কারণ শরীরের প্রতিক্রিয়া প্রায় একই থাকে, শুধু তার অর্থটা বদলে যায়, “বিপদ” থেকে “সুযোগ”। ভয় থাকলেও ঠিক আছে। ভয় নিয়েই কাজটা করুন।

৩. নিজের প্রতি বন্ধুর মতো হোন

অনেকে ভাবেন, নিজেকে কঠোর সমালোচনা না করলে উন্নতি হবে না। গবেষণা উল্টো কথা বলে। ক্রিস্টিন নেফের কাজ এবং ব্রেইনস ও চেনের ২০১২ সালের গবেষণা দেখায়, আত্মসহানুভূতিশীল মানুষ ভুলের পর হাল ছেড়ে দেয় কম, শেখার আগ্রহ ধরে রাখে বেশি। ব্যর্থতার পর নিজেকে বলুন, “কাজটা ভালো হয়নি, কিন্তু আমি শিখছি।” এটা দুর্বলতা নয়, এটাই টিকে থাকার জ্বালানি।

৪. নিজের সঙ্গে একটু দূরত্ব রাখুন

ইথান ক্রসের গবেষণা বলছে, নিজের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের নাম ধরে বললে আবেগ সামলানো সহজ হয়। “আমি কেন এত অযোগ্য?”-র বদলে ভাবুন, “রহিম, এখন কী করা যায়?” নিজের নামটা বসিয়ে দিন। এতে মনে হয় আপনি একজন বন্ধুকে পরামর্শ দিচ্ছেন, নিজেকে বিচার করছেন না।

৫. “ইম্পোস্টার” অনুভূতিটা আপনার একার নয়

১৯৭৮ সালে পলিন ক্ল্যান্স ও সুজান ইমস প্রথম “impostor phenomenon” নিয়ে লেখেন। সফল মানুষদেরও মনে হয়, “আমি আসলে এর যোগ্য নই, যেকোনো দিন ধরা পড়ে যাব।” যদি আপনার এমন মনে হয়, তার মানে আপনি অযোগ্য নন। মানে আপনি নিজের মান নিয়ে সচেতন। এই অনুভূতির নাম জানলেই অর্ধেক ভার কমে যায়।

একটা সতর্কবার্তা

“পাওয়ার পোজ” বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি বদলালেই হরমোন বদলে যায় আর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, এমন জনপ্রিয় দাবির হরমোনগত অংশ পরবর্তী গবেষণায় পুনরায় প্রমাণিত হয়নি। সোজা হয়ে বসলে হয়তো একটু ভালো লাগে, কিন্তু সেটা শর্টকাট নয়। স্থায়ী আত্মবিশ্বাস আসে কাজ থেকে, ভঙ্গি থেকে নয়।

আজই শুরু করার একটা উপায়

একটা কাগজ নিন। লিখুন, গত এক বছরে এমন তিনটা কাজ, যা করার আগে আপনি ভয় পেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত করেছেন। ছোট হলেও চলবে। ওটাই আপনার প্রমাণের প্রথম পাতা। আত্মবিশ্বাসী মানুষ মানে এমন কেউ নয়, যার ভয় নেই। সে সেই মানুষ, যে কাঁপা হাত নিয়েও হাতটা তুলেছিল।

সেদিন ক্লাসে যে হাতটা নেমে গিয়েছিল, কাল সেটা আবার উঠুক। উত্তর ভুল হলেও ক্ষতি নেই। কারণ প্রতিবার হাত তোলার সঙ্গে সঙ্গে আপনি নিজেকে একটা কথাই প্রমাণ করছেন: “আমি ভয় পাই, তবুও আমি এগিয়ে যাই।”

আর এই প্রমাণটাই একদিন আপনার সবচেয়ে বড় আত্মবিশ্বাস হয়ে দাঁড়াবে। ভান করা আত্মবিশ্বাস যেমন ফাটে, এটা তেমন ফাটে না। আপনি এখনই যথেষ্ট। বাকিটা শুধু অভ্যাসের ব্যাপার।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular