রাত ১১টা। মায়ের জ্বর, ডাক্তার পাওয়া কঠিন, হাতে সময়ও নেই। আপনি নিচের ফার্মেসিতে গিয়ে বললেন, “ভাই, জ্বর আর গলাব্যথার জন্য একটা কিছু দিন।” দোকানি এক পাতা ওষুধ বের করে দিলেন। দাম মাত্র কয়েকটা টাকা, আর ঝামেলাও শেষ।
আমাদের অনেকের জীবনেই এই দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়: এই সুবিধার দাম আসলে কে দিচ্ছে?
আমরা কতটা নির্ভর করি ফার্মেসির ওপর
ঢাকার ৪৫০ জনের ওপর করা একটি সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ গত ছয় মাসে নিজে নিজে ওষুধ খেয়েছেন, আর ওষুধ সম্পর্কে তথ্যের সবচেয়ে বড় উৎস ছিলেন ফার্মেসির কর্মীরা (প্রায় ৪৫ শতাংশ)। কুমিল্লার একটি গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৭৪ শতাংশ নিয়মিত নিজে নিজে ওষুধ খান বলে জানা গেছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশে ফার্মেসি অনেক সময় প্রথম চিকিৎসা-কেন্দ্র, আর কখনো কখনো একমাত্র।
সমস্যাটা কোথায়
ফার্মেসিতে মাথাব্যথা বা গ্যাসের ওষুধ চাওয়াকে বিপজ্জনক বলার কারণ নেই। আসল ঝুঁকি অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে।
আইন অনুযায়ী ফার্মেসিতে গ্রেড-সি ফার্মাসিস্ট থাকার কথা, আর নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিষিদ্ধ। বাস্তবে ছবিটা আলাদা। আইসিডিডিআর,বি-র একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাঁরা ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনেছেন, তাঁদের প্রায় অর্ধেক (৫০.৯ শতাংশ) প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কিনেছেন। আরেকটি গবেষণা বলছে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা অ্যান্টিবায়োটিকের হার ছিল ৫৬.৬ শতাংশ, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারণ ছিল জ্বর, ঠান্ডা-কাশির মতো “অগুরুতর” উপসর্গ।
আরও উদ্বেগের তথ্য: একটি জরিপে ফার্মেসিগুলোর মাত্র ৭.৩ শতাংশে ফার্মাসিস্ট উপস্থিত ছিলেন। তাহলে যিনি ওষুধটা হাতে তুলে দিচ্ছেন, তাঁর প্রশিক্ষণ কতটুকু? একটি গবেষণা জানাচ্ছে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ খুচরা ওষুধ বিক্রেতা খুব সামান্য প্রশিক্ষণ পান, অথবা একেবারেই পান না।
ঝুঁকিটা শুধু আপনার একার নয়
ভুল ওষুধ বা ভুল ডোজের প্রথম ক্ষতি আপনার শরীরে। এর মধ্যে আছে অ্যালার্জি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, আর আসল রোগটা চাপা পড়ে যাওয়া। জ্বর কমে গেল, কিন্তু টাইফয়েড বা ডেঙ্গুর মতো রোগ ভেতরে ভেতরে থেকে গেল।
এরপর আসে বড় সমস্যা: অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। অকারণে বা অর্ধেক কোর্স খেলে জীবাণু ওষুধের সঙ্গে লড়তে শিখে যায়। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের শীর্ষ দশ হুমকির একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিএসএমএমইউ-র এক গবেষণার বক্তারা সতর্ক করেছিলেন, এভাবে চললে আগামী সাত থেকে দশ বছরে গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে মাত্র তিনটি, আর গ্রাম-নেগেটিভের বিরুদ্ধে একটি অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর থাকতে পারে।
মানে আজ যে সাধারণ সংক্রমণ এক কোর্সেই সেরে যায়, কাল সেটাই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আপনার আমার সন্তান বা নাতি-নাতনির জন্য।
তাহলে কি ফার্মেসিতে যাওয়াই বন্ধ করব?
না। ফার্মেসি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দরকার শুধু একটু সচেতনতা:
– অ্যান্টিবায়োটিক চাইবেন না, দিলেও নেবেন না। ডাক্তারের লেখা ছাড়া নয়।
– সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর-কাশির বেশির ভাগই ভাইরাসজনিত।অ্যান্টিবায়োটিক এতে কাজ করে না।
– শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক এবং ডায়াবেটিস, কিডনি বা হৃদরোগের রোগীদের জন্য নিজে থেকে ওষুধ নয়।
– তিন-চার দিনে উপসর্গ না কমলে, জ্বর খুব বেশি হলে, বা শ্বাসকষ্ট, তীব্র পেটব্যথা, রক্তপাতের মতো লক্ষণ থাকলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান।
– কোনো ওষুধ কেন খাচ্ছেন, কতদিন খাবেন আর কী কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, জিজ্ঞেস করুন।
– আগের প্রেসক্রিপশনের ওষুধ, আত্মীয়ের জন্য কেনা ওষুধ, বা “গতবার কাজ করেছিল” বলে রেখে দেওয়া ওষুধ আবার খাবেন না।
“গতবার তো এটা খেয়েই ভালো হয়েছিল”, এই বাক্যটাই হয়তো সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ শরীর এক নয়, রোগও এক নয়, আর জীবাণু প্রতিদিন আরও চতুর হচ্ছে।
ফার্মেসির ওষুধ আপনাকে আজ রাতে একটু আরাম দিতে পারে। কিন্তু প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক কাল কারও জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা একটু একটু করে কমিয়ে দেয়। সেই কারও মধ্যে আপনার নিজের মানুষটিও থাকতে পারেন। পরেরবার ফার্মেসিতে দাঁড়িয়ে একটা প্রশ্ন নিজেকে করুন: “আমি কি ওষুধ চাইছি, নাকি উত্তর?” উত্তর যদি আপনার জানা না থাকে, তাহলে সেটা ডাক্তারের কাছ থেকেই নিন।

