বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
HomeBusinessMoney Managementটাকার দাম পড়লে দাম কে দেয়? মূল্যস্ফীতির আসল গল্প

টাকার দাম পড়লে দাম কে দেয়? মূল্যস্ফীতির আসল গল্প

মাস শেষে বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে কখনো কি মনে হয়েছে, ব্যাগটা আগের মতোই আছে, অথচ ভেতরে জিনিস কমে গেছে?

গত বছর যে টাকায় তিন কেজি চাল আর একটু মাছ আসত, এ বছর সেই টাকায় আসে আড়াই কেজি চাল আর ডাল। মাছ বাদ। কেউ আপনাকে বলেনি যে আপনি গরিব হয়ে গেছেন। বেতনের অঙ্কও একই আছে, বরং একটু বেড়েছে। তবু আপনি টের পাচ্ছেন, কিছু একটা চুপচাপ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

এই চুপচাপ কেড়ে নেওয়ার নামই মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতিবিদরা একে বলেন “লুকানো কর” (hidden tax)। এই কর কোনো রসিদে লেখা থাকে না। কেউ আপনার পকেটে হাতও দেয় না। তবু প্রতি মাসে আপনার ক্রয়ক্ষমতার একটা অংশ নিঃশব্দে সরে যায়।

আগে একটা ভুল ধারণা ভাঙি

মূল্যস্ফীতি কমলে আমরা ভাবি জিনিসের দাম কমবে। আসলে তা হয় না।

মূল্যস্ফীতি কমার মানে হলো দাম আগের চেয়ে ধীরে বাড়ছে। দাম নামছে না। ১০০ টাকার জিনিস ১১০ হয়ে ১১৮ হলে স্ফীতি কমেছে ঠিকই, কিন্তু জিনিসটা তো ১১৮ টাকাতেই কিনতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান এই পার্থক্যটাই বারবার বলছেন: কম মূল্যস্ফীতির মানে কম দাম নয়।

তাই সংখ্যা যখন “ভালো খবর” দেয়, তখনো অনেকের পকেটে স্বস্তি পৌঁছায় না।

সংখ্যাগুলো কী বলছে

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২%। এপ্রিলে ছিল ৯.০৪%। বাড়ার মূল কারণ খাদ্যপণ্যের দাম।

একই মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.২১%। অর্থাৎ দাম বাড়ছে ৯.৪২% হারে, আয় বাড়ছে ৮.২১% হারে। পার্থক্যটা ছোট শোনায়। কিন্তু একই ঘটনা মাসের পর মাস ঘটলে সেই ছোট পার্থক্যই জমে পাহাড় হয়ে যায়।

প্রথম আলোর বিশ্লেষণ বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারির পর থেকে একটি মাসও মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। জুন পর্যন্ত টানা ৫৩ মাস মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬%, মজুরি বেড়েছে ৮.১৮%।

সাড়ে চার বছর ধরে মানুষ বেশি টাকা আয় করছে, অথচ কম জিনিস কিনতে পারছে।

প্রথম দাম দেয় কারা

মূল্যস্ফীতি সবাইকে সমানভাবে আঘাত করে না। যার হাতে যত কম টাকা, আঘাতটা তার গায়ে তত জোরে লাগে।

কারণটা সহজ। সিপিডি ও বিবিএসের তথ্য বলছে, দেশের ভোক্তা মূল্যসূচকের ঝুড়ির ৫৯% খাদ্য। ষাট শতাংশের বেশি পরিবার আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবারেই খরচ করে। গরিব পরিবারে এই অনুপাত আরও বেশি।

একজন ধনী মানুষ চালের দাম বাড়লে বিরক্ত হন। একজন দিনমজুর চালের দাম বাড়লে ঠিক করেন, আজ কী না খেয়ে চলবে।

ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেছেন, আয় কমলে মানুষ প্রথমে প্রোটিন কমায়, তারপর সস্তা ও নিম্নমানের খাবারের দিকে সরে যায়। সানেমের একটি গবেষণা দেখিয়েছিল, দরিদ্র পরিবারগুলো চাল ও গমের মতো প্রধান খাদ্যের ভোগও কমিয়েছে।

এ সংখ্যাগুলো কাগজে কেবল শতকরা হিসাব। বাস্তবে এর অর্থ হলো কোনো শিশুর পাতে ডিমটা আর পড়ছে না। কোনো মায়ের থালায় ভাত থাকলেও তরকারি নেই।

তারপর দাম দেয় যারা সঞ্চয় করেছিল

যাদের আয়ে কুলায় না, তাদের সামনে তিনটি পথ থাকে। খরচ কমানো, জমানো টাকা ভেঙে ফেলা, অথবা ধার করা।

সিপিডির বিশ্লেষণ ঠিক এই কথাই বলছে। দীর্ঘ মূল্যস্ফীতিতে পরিবারগুলো ভোগ কমাতে, সঞ্চয় ফুরিয়ে ফেলতে বা ঋণ করতে বাধ্য হয়। ফলে তাদের দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। অর্থাৎ যে পরিবার কোনোমতে দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিল, সে-ই এখন নিচে নামার কিনারায়।

আর দেশের অর্থনীতির প্রায় ৮৬% কাজ হয় অনানুষ্ঠানিক খাতে। সেখানে মজুরি নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ কম, বছর শেষে ইনক্রিমেন্টও নেই। দাম বাড়লে এই মানুষগুলোর হাতে ঢাল বলতে কিছুই থাকে না।

আর কে লাভ করে?

প্রশ্নটা একটু অস্বস্তিকর, কিন্তু করা দরকার। কেউ কি এই পরিস্থিতিতে লাভবান হয়?

অর্থনীতির সাধারণ যুক্তিতে, যাদের সম্পদ আছে, যেমন জমি বা সম্পত্তি, তাদের সম্পদের মূল্য সাধারণত দামের সঙ্গে বাড়ে। যারা ধার নিয়ে রেখেছিল, তাদের ঋণের প্রকৃত বোঝা হালকা হয়। আর যাদের আয় নির্দিষ্ট ও কম, তাদের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি।

সিপিডির গবেষণা আরও একটি বিষয় তুলে ধরেছে: খাদ্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে বাজার, মুনাফার ব্যবধান ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা আছে। উৎপাদনকারীর হাত থেকে ভোক্তার পাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দাম কীভাবে বাড়ে, সেই গল্পও মূল্যস্ফীতির আসল গল্পের অংশ।

তাহলে সমাধান কী?

সহজ কোনো জাদুকাঠি নেই। তবে অর্থনীতিবিদরা যা বলছেন:

– টার্গেটেড সহায়তা: স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য বিতরণ বাড়ানো, যাতে অন্তত ন্যূনতম পুষ্টি নিশ্চিত থাকে।

– মজুরি ও দামের সমন্বয়: সরকারের জিইডি নিজেই সতর্ক করেছে যে সমন্বিতভাবে মজুরি ও দাম ব্যবস্থাপনা দরকার।

– ইউটিলিটি খরচে সতর্কতা: বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচ বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগে।

– সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা: বাজার তদারকি, মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফা ও আমদানির চাপ নিয়ে নজরদারি।

বিশ্লেষকরা আরও মনে করিয়ে দেন, মূল্যস্ফীতি ৭% বা তার নিচে নামলে হয়তো আয় আবার দামকে ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু সেই আশা তখনই বাস্তব হবে, যখন সতর্কভাবে নীতি চলবে।

টাকার দাম পড়লে দাম দেওয়ার জন্য কেউ রসিদ পায় না। কেউ বিল পাঠায় না। দামটা দেওয়া হয় সন্তানের পাতের ডিমে, বন্ধ হয়ে যাওয়া চিকিৎসায়, অসমাপ্ত থেকে যাওয়া স্কুলের পড়ায়, আর রাতে ঘুম না আসা দুশ্চিন্তায়। আমরা যখন খবরে দেখি “মূল্যস্ফীতি ০.৩৮% বেড়েছে”, তখন সংখ্যাটা ছোট মনে হয়। কিন্তু ওই ০.৩৮% কারও জন্য একটা পুরো বেলার খাবার।

তাই পরের বার যখন কেউ মূল্যস্ফীতিকে বলবে “শুধু একটা অর্থনৈতিক সূচক”, মনে রাখবেন: সূচকের পেছনে মানুষ থাকে। আর সেই মানুষগুলোই, যাদের কণ্ঠস্বর সবচেয়ে ক্ষীণ, দাম দেয় সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি। অর্থনীতির সত্যিকারের সাফল্য মাপা হয় জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নয়। মাপা হয় এই প্রশ্নে: সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির পাতে আজ ভাত আছে তো?

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular