back to top
শুক্রবার, আগস্ট ২১, ২০২৬
HomeLifestyleHealthy Livingপেঁয়াজের রস কি সত্যিই চুল গজায়? জানুন বিজ্ঞানের উত্তর

পেঁয়াজের রস কি সত্যিই চুল গজায়? জানুন বিজ্ঞানের উত্তর

ইউটিউব বা ফেসবুকে স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে, পেঁয়াজের রস মাথায় লাগিয়ে চুল ঘন করার ভিডিও, আগে-পরের ছবি, হাজারো কমেন্টে মানুষ লিখছে “কাজ করেছে”। রান্নাঘরের এই সাধারণ সবজিটাই যেন হয়ে উঠেছে চুল পড়া বন্ধ করার সবচেয়ে জনপ্রিয় ঘরোয়া সমাধান। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, এই বিশ্বাসের পেছনে সত্যিকারের বিজ্ঞান কতটা আছে, নাকি এটা মূলত ভাইরাল হওয়া একটা ট্রেন্ড।

উত্তরটা প্রথম শুনতে অবাক লাগতে পারে, পেঁয়াজের রস নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার প্রায় পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে একটামাত্র ছোট গবেষণার ওপর। চলো দেখি, গবেষণা আসলে কী বলছে, আর কোথায় বাস্তবতা আর জনপ্রিয় বিশ্বাসের মধ্যে ফারাক তৈরি হয়েছে।

যে একটা গবেষণা থেকে পুরো ট্রেন্ডের শুরু

পেঁয়াজের রস নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হওয়া গবেষণাটা প্রকাশিত হয়েছিল ২০০২ সালে, Journal of Dermatology-তে। এই গবেষণায় ৩৮ জন অংশগ্রহণকারীকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল, একদল দিনে দুইবার মাথায় কাঁচা পেঁয়াজের রস লাগিয়েছিল, আরেক দল শুধু কলের পানি লাগিয়েছিল। ছয় সপ্তাহ পর দেখা গেছে, পেঁয়াজের রস ব্যবহারকারী দলের প্রায় ৮৭ শতাংশের মধ্যে চুল গজানো শুরু হয়েছে, যেখানে পানি ব্যবহারকারী দলে এই হার ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ।

সংখ্যাটা দেখতে চমকপ্রদ মনে হলেও, এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা লুকিয়ে আছে, এই গবেষণাটা করা হয়েছিল শুধুমাত্র alopecia areata নামের একটা নির্দিষ্ট অবস্থার রোগীদের ওপর। এটা একটা অটোইমিউন কন্ডিশন, যেখানে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে চুলের ফলিকলকে আক্রমণ করে, ছোট ছোট গোলাকার প্যাচে চুল পড়ে যায়। এটা প্রসব-পরবর্তী চুল পড়া, নারী বা পুরুষের সাধারণ প্যাটার্ন বাল্ডনেস, বা টেলোজেন এফ্লুভিয়ামের মতো সাধারণ চুল পড়ার কারণগুলোর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বিষয়।

গবেষণাটা যতটা শক্তিশালী মনে হয়, ততটা না

এই গবেষণার নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে, যেগুলো প্রায়ই ভাইরাল ভিডিওতে উল্লেখ করা হয় না। গবেষণাটা ছিল open-label এবং non-blinded, মানে অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই জানতেন তারা কোন গ্রুপে আছেন, যেটা ফলাফলে পক্ষপাত তৈরি করতে পারে। মাত্র ৩৮ জনের একটা ছোট নমুনা নিয়ে করা এই গবেষণাটা, এত বছর পরেও বড় পরিসরে পুনরায় যাচাই করা হয়নি। যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা MHRA বা NICE-এর মতো কোনো স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাও কখনো পেঁয়াজের রসকে কোনো ধরনের চুল পড়ার চিকিৎসা হিসেবে অনুমোদন দেয়নি।

Androgenetic Alopecia-র জন্য প্রমাণ প্রায় নেই বললেই চলে

বেশিরভাগ মানুষ যেই কারণে চুল পড়া নিয়ে চিন্তিত থাকে, সেটা হলো androgenetic alopecia, অর্থাৎ জেনেটিক কারণে হওয়া সাধারণ প্যাটার্ন হেয়ার লস, যা ৮০ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ পুরুষকে প্রভাবিত করে। এই ধরনের চুল পড়ার ক্ষেত্রে পেঁয়াজের রসের সরাসরি কোনো ক্লিনিক্যাল প্রমাণই নেই। ত্বক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেঁয়াজের তেল বা রস সরাসরি চুলের ফলিকলকে উদ্দীপিত করে না। এতে থাকা সালফার আর কোয়ারসেটিনের মতো উপাদান তাত্ত্বিকভাবে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু এই প্রক্রিয়াগুলো এখনো পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত না, এগুলো এখনো অনুমানের পর্যায়েই আছে।

নিরাপত্তা নিয়ে যা জানা দরকার

পেঁয়াজে থাকা সালফার যৌগ ত্বকের জন্য জ্বালাময় হতে পারে। অতিরিক্ত ব্যবহারে স্ক্যাল্পে প্রদাহ তৈরি হতে পারে, যেটা আসলে চুলের ফলিকলের স্বাস্থ্যের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনে। মূল গবেষণায় সপ্তাহে মাত্র দুইবার ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল, প্রতিদিন ব্যবহারের কোনো প্রমাণিত ভিত্তি নেই। তাই কেউ যদি ঘরোয়া প্রতিকার হিসেবে এটা চেষ্টা করতে চায়, সংযত পরিমাণে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

তুলনামূলকভাবে যেসব বিকল্পের প্রমাণ বেশি শক্তিশালী

চুল পড়ার জন্য প্রমাণিত চিকিৎসার মধ্যে আছে টপিক্যাল মিনোক্সিডিল, যেটার পেছনে বিশাল পরিমাণ ক্লিনিক্যাল প্রমাণ আছে, আর ফিনাস্টেরাইডের মতো মুখে খাওয়ার ওষুধ। রোজমেরি অয়েল বা কুমড়ার বীজের তেলের মতো আরও প্রাকৃতিক বিকল্পও জনপ্রিয়, যদিও এগুলোরও পেঁয়াজের মতোই সীমিত গবেষণা আছে। রেড লাইট থেরাপির মতো FDA-অনুমোদিত পদ্ধতিও এখন ঘরে বসে ব্যবহারযোগ্য একটা নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পেঁয়াজের রস সম্পূর্ণ অকার্যকর, এটাও বলা যাচ্ছে না, কিন্তু এটা সব ধরনের চুল পড়ার জন্য একটা প্রমাণিত সমাধান, এই দাবিটাও সত্যি না। যাদের নির্দিষ্টভাবে alopecia areata আছে, তাদের জন্য একটা ছোট গবেষণায় কিছুটা আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের সাধারণ চুল পড়ার জন্য এর কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। চুল পড়া অব্যাহত থাকলে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হলো, ঘরোয়া টোটকা চেষ্টা করার আগে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া, যাতে আসল কারণটা চিহ্নিত করে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা যায়।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular