ধরুন আপনি মাসের পর মাস ডায়েট করছেন। ভাত কমিয়েছেন, মিষ্টি ছেড়েছেন, সকালে হাঁটছেন, তবুও স্কেলের কাঁটাটা নড়ছে না। তখন কেউ একজন বলল, “আরে, একটা ইনজেকশন আছে সপ্তাহে একবার নিলেই হয়। ওজন এমনিতেই কমে যায়।”
শুনতে রূপকথার মতো লাগছে, তাই না?
কিন্তু এই ওষুধগুলো আসলেই বাস্তব। বিশ্বজুড়ে এখন এগুলো নিয়ে বিশাল আলোচনা চলছে। বাংলাদেশেও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এই ওষুধ ঠিক কীভাবে কাজ করে, কাদের জন্য, আর কাদের জন্য একদমই না — সেটা না জেনে নিলে বিপদ হতে পারে।
আজকে সেটাই জানব।
ওজন কমানোর আসল সূত্র
শুরুতেই একটা জিনিস পরিষ্কার করা দরকার। ওজন কমানোর সূত্র আসলে খুব সহজ। সারা দিনে যতটা ক্যালরি খাবেন, তার চেয়ে বেশি খরচ করবেন। এই একটাই নিয়ম। কিন্তু এই নিয়ম মানা যে কতটা কঠিন, সেটা যারা চেষ্টা করেছেন তারাই জানেন। ক্ষুধা লাগে, ইচ্ছাশক্তি কমে যায়, আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়া হয়।
আর এখানেই এই নতুন ওষুধগুলো একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একটা কথা মাথায় রাখবেন — সপ্তাহে আধা কেজি থেকে এক কেজির বেশি ওজন কমানো স্বাস্থ্যসম্মত নয়। তাড়াহুড়া করলে শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই ওষুধ কীভাবে কাজ করে
এই ওষুধগুলোর নাম জিএলপি-১ অ্যাগোনিস্ট। একটু কঠিন শোনাচ্ছে, তাই সহজ করে বলি।
আমাদের শরীরে একটি হরমোন আছে যার নাম গ্লুকাগন লাইক পেপটাইড-১ বা জিএলপি-১। খাবার খাওয়ার পর এই হরমোন ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে বের হয় এবং মস্তিষ্ককে সংকেত দেয়, “পেট ভরে গেছে, আর খেতে হবে না।” এই ওষুধগুলো মূলত সেই হরমোনের নকল করে। ফলে কী হয়?
হজমপ্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা মনে হয়, অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায়, রক্তে সুগারের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে থাকে। মানে আপনি এমনিতেই কম খাচ্ছেন কিন্তু জোর করে না, শরীর নিজেই চাইছে না। স্বাভাবিকভাবেই ক্যালরি কম ঢুকছে, ফলে ওজন কমার পথ তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু এখানে একটা বড় “কিন্তু” আছে।
শুধু ওষুধ নিলেই হবে না
এই ওষুধ নেওয়ার মানে এই না যে আপনি যা খুশি খাবেন আর ওজন কমবে। সেটা হবে না। বরং যারা এই ওষুধ নিচ্ছেন, তাদের জন্য বিশেষভাবে খাদ্যতালিকা তৈরি করা হচ্ছে। বেশি আমিষ খেতে বলা হচ্ছে, কারণ ওজন কমার সাথে সাথে পেশিও যেন না কমে। প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল দরকার শক্তির জন্য।
আর ব্যায়াম? সেটা আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রেজিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ যেমন ভারোত্তোলন বা বডিওয়েট ট্রেনিং পেশিক্ষয় রোধ করতে অপরিহার্য।
যারা ওষুধের পাশাপাশি সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম চালিয়ে যেতে পারবেন, তাদের ফলাফল অনেক ভালো হয় — এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম হয়।
কাদের জন্য এই ওষুধ
সবার জন্য এই ওষুধ নয়। ডাক্তার সাধারণত দুটি ক্ষেত্রে এটি বিবেচনা করেন —
যাদের বিএমআই ৩০ বা তার বেশি, এবং যাদের বিএমআই ২৫ বা তার বেশি, কিন্তু সাথে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ফ্যাটি লিভার, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো জটিলতাও আছে।
তবে কিছু মানুষের জন্য এই ওষুধ একদমই নয়। যাদের অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের ইতিহাস আছে, পাকস্থলীর গতিশীলতা কম, থাইরয়েড ক্যানসারের ইতিহাস আছে, বা কিছু বিশেষ হরমোনসংক্রান্ত টিউমার আছে, তাদের এই ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে। গর্ভবতী এবং স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্যও এটি নিষিদ্ধ।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী হতে পারে
সরাসরি বলছি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এবং সেগুলো জানা দরকার।
শুরুর দিকে বমিভাব, বুক জ্বালাপোড়া, পেটে অস্বস্তি, পাতলা পায়খানা বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। খাবারের স্বাদ বদলে যেতে পারে, ক্ষুধামান্দ্য দেখা দিতে পারে। বেশি সমস্যা হলে বমি বা পাতলা পায়খানায় পানিশূন্যতা হতে পারে, যা থেকে মাথাব্যথা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি আসতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যাভ্যাস ঠিক না রাখলে পুষ্টির ঘাটতি এবং পেশিক্ষয় হতে পারে, বিশেষত বয়স্কদের জন্য এটি গুরুতর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় — যারা ইনসুলিন বা সুগার কমানোর অন্য ওষুধ নিচ্ছেন, তাদের রক্তে সুগার অস্বাভাবিক কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে ডাক্তারের সাথে অবশ্যই কথা বলতে হবে।
কিছু জরুরি বিষয় যা অবশ্যই মনে রাখবেন
বাংলাদেশে সিমেগ্লুটাইড, লিরাগ্লুটাইড এবং টারজেপেটাইড এই তিনটি ওষুধই পাওয়া যায়। তিনটিই আমেরিকার এফডিএ অনুমোদিত। তবে কোনটি আপনার জন্য, কত ডোজে, কতদিন এটা একমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই বলতে পারবেন।
ওষুধের পেন বা ডিভাইস কখনো অন্যের সাথে ভাগ করবেন না। এমনকি সুই বদলে নিলেও না। সংরক্ষণের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। ২ থেকে ৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ফ্রিজের শেলফে রাখতে হবে। ডিপ ফ্রিজে নয়, ফ্রিজের দরজায়ও নয়। ঘরের তাপমাত্রায় রাখলে ইনজেকশনভেদে ২১ থেকে ৫৬ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে।
কিডনি রোগীরাও নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত এটি ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি কিছু ওষুধ কিডনি বিকল রোগীদের জন্যও নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে।
১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার সম্ভব, তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা, ওষুধ বন্ধ করলে অনেক ক্ষেত্রে ওজন আবার বাড়তে শুরু করে। তাই ওজন কমার পর ডোজ কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ওজন কমানোর এই ওষুধ একটি সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা এতে আছে। কিন্তু এটি কোনো জাদুর ওষুধ নয়। সঠিক মানুষের হাতে, সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শে, সঠিক জীবনযাপনের সাথে মিলিয়ে নিলে তখনই এটি কাজ করে।
নিজের শরীরকে ভালোবাসুন। তাড়াহুড়ো করবেন না। এবং যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে একজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন কারণ ওজন কমানোর চেয়েও বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্থ থাকা।

