বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করেও ঘুম আসছে না, এপাশ-ওপাশ করতে করতে ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে, এই অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই হয়েছে। আমরা তখন ফোনের ব্রাইটনেস কমাই, ঘরের আলো নিভিয়ে দিই, কিন্তু একটা জিনিসের কথা প্রায়ই ভুলে যাই, রাতের খাবারের পর কী খাচ্ছি সেটাও ঘুমের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ঘুম শুধু বিশ্রাম না, এটা শরীরের মেরামতের সময়, মস্তিষ্কের রিসেট বাটন। আর এই প্রক্রিয়াটা অনেকটাই নির্ভর করে শরীরে মেলাটোনিন আর সেরোটোনিনের মতো হরমোনের ওপর। কিছু খাবার সরাসরি এই হরমোনগুলোর উৎপাদনে সাহায্য করে। চলো দেখি, গবেষণায় প্রমাণিত এমন কিছু খাবারের কথা, যেগুলো রাতে ঘুমানোর আগে খেলে ঘুম আর শরীর দুটোই উপকৃত হয়।
কিউই, ঘুমের জন্য প্রমাণিত একটা ফল
Asia Pacific Journal of Clinical Nutrition-এ প্রকাশিত একটা গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের সমস্যায় ভোগা মানুষরা ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে দুটো কিউই খেলে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে, বেশি সময় ঘুমায় আর ঘুমের মান বেড়ে যায়। কিউইতে থাকা সেরোটোনিন মেলাটোনিন তৈরিতে সাহায্য করে, আর এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আর ফোলেট শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।
টার্ট চেরি, প্রাকৃতিক মেলাটোনিনের উৎস
টার্ট চেরি বা টক চেরিতে একসাথে মেলাটোনিন, সেরোটোনিন, ট্রিপটোফ্যান আর পটাশিয়াম থাকে, যেগুলো একসাথে কাজ করে ঘুম আনতে সাহায্য করে। American Journal of Therapeutics-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, টার্ট চেরির জুস ইনসমনিয়া বা ঘুম না আসার সমস্যা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে সামান্য পানি মিশিয়ে টার্ট চেরির জুস খাওয়ার অভ্যাস নিয়মিত রাখলে সময়ের সাথে ঘুমের উন্নতি টের পাওয়া যায়।
বাদাম, ম্যাগনেসিয়ামের ভাণ্ডার
আমন্ড, আখরোট, পেস্তার মতো বাদামে থাকে ম্যাগনেসিয়াম, একটা মিনারেল যা স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে আর পেশি শিথিল করতে সাহায্য করে। আখরোটে আছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা সেরোটোনিনের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে, আর পেস্তায় প্রাকৃতিক মেলাটোনিনের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। ইঁদুরের ওপর করা একটা গবেষণায় দেখা গেছে, আমন্ড এক্সট্র্যাক্ট খাওয়ানো ইঁদুররা আগের চেয়ে বেশি সময় আর গভীরভাবে ঘুমিয়েছে।
কলা, সহজলভ্য অথচ কার্যকর
কলায় আছে ট্রিপটোফ্যান, যেই অ্যামিনো অ্যাসিড শরীরকে সেরোটোনিন আর মেলাটোনিন তৈরি করতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি কলায় থাকা ম্যাগনেসিয়াম আর পটাশিয়াম স্নায়ুতন্ত্র শান্ত রাখে আর পেশি রিল্যাক্স করতে সাহায্য করে। একটা কলা সামান্য আমন্ড বাটার বা এক চিমটি দারুচিনি দিয়ে খাওয়া রাতের একটা সহজ অথচ কার্যকর অভ্যাস হতে পারে।
ওটস আর দুধ, পুরনো অভ্যাস, নতুন প্রমাণ
ওটসে প্রাকৃতিক মেলাটোনিন থাকে, আর এটা শরীরে ট্রিপটোফ্যান শোষণেও সাহায্য করে। ওটস একটা কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট হওয়ায় রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে, যা ভালো ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, দুধেও মেলাটোনিন আর ট্রিপটোফ্যান থাকে, যে কারণে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস গরম দুধ খাওয়ার পুরনো অভ্যাসটার পেছনেও বিজ্ঞান রয়েছে।
কোনো একটা খাবারই জাদুর মতো রাতারাতি ঘুমের সমস্যা সমাধান করে দেবে না। ঘুম নির্ভর করে পুরো একটা রুটিনের ওপর, খাবার, আলো, স্ক্রিন টাইম, আর মানসিক প্রশান্তি সব মিলিয়ে। তবে ছোট এই অভ্যাসগুলো, রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে হালকা কিছু বেছে নেওয়া, নিয়মিত একই সময়ে খাওয়া, শরীরকে ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। আজ রাতেই একটা কিউই বা এক গ্লাস দুধ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে, পার্থক্যটা হয়তো প্রথম রাতেই টের পাবে
না, কিন্তু শরীর মনে রাখবে।

