back to top
শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬
HomeLifestyleHealthy Livingমাস্ক পরলেই কি বায়ুদূষণ থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকা যায়?

মাস্ক পরলেই কি বায়ুদূষণ থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকা যায়?

ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই জানালার বাইরে ধূসর কুয়াশার মতো কিছু একটা ঝুলে আছে। আসলে ওটা কুয়াশা নয়, ধুলো আর ধোঁয়া। আপনি অভ্যাসমতো মুখে একটা মাস্ক এঁটে বেরিয়ে পড়লেন। ভাবলেন, যাক, এবার তো সুরক্ষিত।

কিন্তু আপনার মাস্ক কি সত্যিই সেই সুরক্ষা দিচ্ছে, যা আপনি ভাবছেন?

শত্রুটা চোখে দেখা যায় না

বায়ুদূষণের সবচেয়ে ক্ষতিকর অংশ হলো PM2.5, অর্থাৎ ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে ছোট কণা। মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (EPA) বলছে, এগুলো মানুষের চুলের ব্যাসের প্রায় ৩০ ভাগের এক ভাগ। এত ছোট বলেই এরা ফুসফুসের গভীরে ঢুকে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হিসাবে, বায়ুদূষণ প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার, অ্যাজমা, কোনোটাই এর বাইরে নয়।

আর আমাদের দেশে শীতকাল এলেই ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় উঠে আসে, এটা এখন প্রায় বার্ষিক খবর।

সব মাস্ক এক নয়

এখানেই প্রথম ধাক্কা। রাস্তায় যে মাস্কগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, সেগুলো এই কাজের জন্য তৈরিই হয়নি।

– কাপড়ের মাস্ক: ধুলোর বড় কণা কিছুটা আটকায়। কিন্তু PM2.5-এর মতো সূক্ষ্ম কণার বিরুদ্ধে এর সুরক্ষা সীমিত।

– সার্জিক্যাল মাস্ক: মূলত তৈরি হয়েছে মুখ থেকে বেরোনো ফোঁটা আটকানোর জন্য। দূষিত বাতাস থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য নয়। এর পাশ দিয়ে অনেক বাতাস ঢুকে যায়।

– N95 / KN95 / FFP2: এগুলোই দূষণের জন্য তুলনামূলক কার্যকর। মার্কিন NIOSH মানদণ্ড অনুযায়ী N95 সঠিকভাবে পরলে ০.৩ মাইক্রোমিটার আকারের অন্তত ৯৫ শতাংশ কণা আটকায়।

“ঠিকমতো পরলে” কথাটা আসলে কঠিন

N95 হলেও সমস্যা শেষ হয় না। মাস্কের ফিল্টার যত ভালোই হোক, নাক আর গালের পাশ দিয়ে ফাঁক থাকলে দূষিত বাতাস সেই পথেই ঢুকে পড়ে। স্বাস্থ্য ও শ্রম-নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, মুখের সঙ্গে মাস্ক ঠিকমতো না বসলে কাগজে-কলমের ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা বাস্তবে অনেক কমে যায়। দাড়ি, ঢিলে ফিতা, নাকের ক্লিপ না চাপা, এসবই ফাঁক তৈরি করে।

বাচ্চাদের জন্য আরও জটিল, কারণ বাজারের বেশিরভাগ মাস্ক বড়দের মুখের মাপে বানানো।

মাস্ক যা পারে না

এই কথাটা অনেকেই জানেন না। N95-এর মতো মাস্ক কণা আটকায়, কিন্তু গ্যাস আটকায় না। গাড়ির ধোঁয়া থেকে আসা নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, ওজোন, উদ্বায়ী জৈব যৌগ, এগুলো সাধারণ মাস্ক ভেদ করে ঢুকে যেতে পারে। অর্থাৎ বাতাসের একটা অংশের বিরুদ্ধে আপনি সুরক্ষিত, আরেকটা অংশের বিরুদ্ধে প্রায় অরক্ষিত।

আরেকটা বিষয়, মাস্ক পরে আপনি শুধু রাস্তার কয়েক ঘণ্টা সামলান। বাকি ২০-২২ ঘণ্টা আপনি ঘরে, অফিসে, বাসে। ঘরের ভেতরের বাতাসও দূষিত হতে পারে, বিশেষ করে রান্নার ধোঁয়া বা বাইরের ধুলো ঢুকলে।

তাহলে মাস্ক কি অকেজো?

একেবারেই না। বিষয়টা “পুরোপুরি নিরাপদ” আর “একেবারে অসুরক্ষিত”-এর মাঝামাঝি। সঠিক মাস্ক ঠিকভাবে পরলে এক্সপোজার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, আর সেটা বিশেষ করে হৃদরোগ, অ্যাজমা বা ফুসফুসের সমস্যা আছে এমন মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মাস্ক একটা ঢাল, দেয়াল নয়।

কী করবেন

– ঘরের বাইরে গেলে N95 বা KN95 ব্যবহার করুন, আর নাকের ক্লিপ চেপে ফিটিং পরীক্ষা করুন।

– দূষণ বেশি থাকা দিনে ভোরে ও রাতে খোলা জায়গায় ব্যায়াম এড়ান।

– ঘরে জানালা বন্ধ রাখুন এবং সম্ভব হলে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করুন।

– এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) অ্যাপে দেখে দিনের পরিকল্পনা করুন।

– হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ বা গর্ভাবস্থায় থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

মাস্ক আপনাকে কিছুটা সময় কিনে দিতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ মাস্ক পরে সারা জীবন শ্বাস নেবে, এটা কোনো সমাধান হতে পারে না। যে শহরে শিশুকে স্কুলে পাঠাতে মাস্ক লাগে, যে বাতাসে বৃদ্ধ বাবা-মা বারান্দায় দাঁড়াতে ভয় পান, সেই বাতাস মাস্ক দিয়ে ঠিক হয় না। আজ আপনি নিজের মুখের মাস্কটা ঠিকঠাক এঁটে নিন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নটাও করতে শিখুন: বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেওয়া কবে আমাদের অধিকার হবে, বিলাসিতা নয়?

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular