একসময় প্রতিদিন কথা হতো। সকালে উঠেই ফোন, রাতে ঘুমানোর আগে মেসেজ। এখন? মাসে একবারও হয় না। হয়তো জন্মদিনে একটা ‘Happy Birthday’ আসে, বা হঠাৎ কোনো মিম ফরওয়ার্ড হয় — ব্যস, এটুকুই। মানুষটা কিন্তু একই আছে। আপনিও একই আছেন। তাহলে কী বদলেছে?
সময় গেছে এটা সহজ উত্তর। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো: সময়ের সাথে সাথে কি সম্পর্কটাও সত্যিই বদলে গেছে? বন্ধুত্ব কি আসলে স্থায়ী হয়? নাকি এটা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, একটা নির্দিষ্ট বয়সের জন্য?
বয়স বাড়লে জীবনের অগ্রাধিকার বদলায়
স্কুল-কলেজের দিনগুলো মনে আছে? তখন সময় ছিল অঢেল। ক্লাসের পরে আড্ডা, রোদে দাঁড়িয়ে গল্প, ক্যান্টিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা, এসব করার জন্য কোনো পরিকল্পনা লাগত না। দায়িত্ব ছিল কম, মাথায় চিন্তা ছিল কম, তাই বন্ধুত্বের জন্য সময় দেওয়া সহজ ছিল।
কিন্তু চাকরি আসে। সংসার আসে। ক্যারিয়ারের দৌড় শুরু হয়। হঠাৎ করেই মনে হয় সারাদিনে ২৪ ঘণ্টা আছে, তবুও কারো জন্য সময় নেই। সময় তো আসলে কমেনি, কিন্তু সেই সময়ের দাবিদার বেড়ে গেছে। বন্ধুত্বের জায়গা বদলায়, কিন্তু তার গুরুত্ব কমে না। শুধু সেটা এখন আর সবার আগে থাকে না — এটাই বাস্তবতা।
Shared Experience কমে যায়
বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় আঠা হলো একসাথে কাটানো অভিজ্ঞতা। একই ক্লাসরুম, একই পরীক্ষার ভয়, একই শিক্ষক, একই রুটিন এই “একই”টাই আমাদের কাছে টানত। কিন্তু বয়স বাড়লে জীবন আলাদা ট্র্যাকে চলে যায়। কেউ শহর বদলায়, কেউ দেশ বদলায়। কারো বিয়ে হয়, কারো বাচ্চা হয়। কারো স্টার্টআপ আছে, কেউ সরকারি চাকরিতে আছে। অভিজ্ঞতার মিল কমে যায়।
আর যখন অভিজ্ঞতা আলাদা হয়ে যায়, তখন emotional sync কমে। আপনি অফিসের চাপের কথা বলছেন, বন্ধু বাচ্চার ঘুমানোর সমস্যার কথা বলছে — দুজনেই সত্যি কথা বলছে, কিন্তু কেউ কাউকে পুরোপুরি বুঝতে পারছে না।
Emotional Maturity ও পরিচয়ের পরিবর্তন
১৮ বছরে আপনি যে মানুষ ছিলেন, ৩০ বছরে কি আপনি সেই একই মানুষ? নিশ্চয়ই না। আপনার মূল্যবোধ বদলেছে, চিন্তার ধরন বদলেছে, আপনি কী চান সেটা বদলেছে। সমস্যা হলো সবাই একসাথে, একই দিকে evolve করে না। কারো চিন্তা উদার হয়, কারো রক্ষণশীল থাকে। কারো স্বপ্ন বড় হয়, কেউ ছোট ছোট সুখে তুষ্ট থাকে। আর যখন দুজনের মূল্যবোধে ফাটল ধরে, তখন কথোপকথন কঠিন হয়ে পড়ে।
এটা কেউ ইচ্ছে করে করে না। এটা স্বাভাবিক মানবিক বিকাশের অংশ। প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব গতিতে, নিজস্ব পথে এগিয়ে যায়।
প্রতিযোগিতা ও তুলনার সংস্কৃতি
এটা কেউ স্বীকার করতে চায় না, কিন্তু সত্যি। বন্ধুর সাফল্য দেখে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয় আনন্দ আর ঈর্ষা একসাথে মিশে। “ও এত কম বয়সে এতদূর গেছে, আমি কোথায়?” এই প্রশ্নটা মনে মনে জাগে।
Social media এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। বন্ধুর নতুন গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, প্রমোশনের পোস্ট, এগুলো দেখতে দেখতে একটা অজানা দূরত্ব তৈরি হয়। কেউ ইচ্ছে করে দূরে যায় না, কিন্তু comparison culture ধীরে ধীরে সম্পর্কে বিষ ঢালে। ভালো বন্ধুত্বের একটা লক্ষণ হলো তুমি তোমার ব্যর্থতার কথাও বলতে পারো, শুধু সাফল্য নয়। যেখানে সেটা সম্ভব হয় না, সেখানে সম্পর্ক ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
নীরব দূরত্ব: ঝগড়া না হয়েও দূরে যাওয়া
সবচেয়ে কষ্টের বিচ্ছেদ সেটা নয় যেখানে ঝগড়া হয়, রাগারাগি হয়, কষ্ট দেওয়া হয়। সবচেয়ে কষ্টের বিচ্ছেদ হলো সেটা যেখানে কিছুই হয় না। একদিন ফোন করা হয় না। পরেরদিনও না। সপ্তাহ যায়, মাস যায়। কেউ কাউকে দোষ দেয়নি, কোনো বড় ঘটনা নেই, শুধু যোগাযোগটা আস্তে আস্তে কমতে কমতে শেষ হয়ে যায়। এটাকে বলে silent drifting।
এরপর আসে guilt আর nostalgia। “কবে দেখা হবে” বলতে বলতে দেখা আর হয় না। পুরনো ছবি দেখলে মন খারাপ হয়, কিন্তু ফোন করার সাহস হয় না — এত দিন পরে কী বলব?
সব বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী হওয়ার জন্য নয়
এটা শুনতে কঠিন লাগতে পারে, কিন্তু এটাই সত্যি। কিছু বন্ধু আসে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্কুলের বন্ধু, কলেজের বন্ধু, প্রথম চাকরির বন্ধু। তারা সেই সময়টাকে অর্থবহ করে তোলে, তারপর নিজের পথে চলে যায়। কিছু বন্ধু আসে জীবনের জন্য কথা কম হলেও, দেখা কম হলেও, যখন দরকার হয় তখন পাশে থাকে।
আর কিছু বন্ধু শুধু স্মৃতির জন্য। তারা চলে গেছে, কিন্তু তাদের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো আজও মনে হাসি আনে। সেটাও একধরনের বন্ধুত্ব কম মূল্যবান নয়।
বন্ধুত্ব বদলানো মানেই শেষ হওয়া নয়
কম কথা মানেই কম ভালোবাসা নয়। এটা বোঝাটা জরুরি। Mature friendship-এর একটা সুন্দর বৈশিষ্ট্য হলো এখানে frequency কম থাকতে পারে, কিন্তু গভীরতা অনেক বেশি। বছরে একবার দেখা হলেও মনে হয় গতকালই কথা হয়েছে। পুরনো বন্ধুর সাথে কথা শুরু হলে কোথাও কোনো জড়তা নেই সেখান থেকে শুরু হয় যেখানে ছেড়ে গিয়েছিল। এটাই প্রকৃত বন্ধুত্বের চিহ্ন — সময়ের ব্যবধান সম্পর্কের গভীরতা কমাতে পারে না।
কীভাবে বন্ধুত্ব ধরে রাখা যায়
বন্ধুত্ব ধরে রাখতে হলে কিছু সচেতন চেষ্টা দরকার। Intentional যোগাযোগ করুন — “একদিন কথা হবে” বলে বসে থাকলে হবে না, একটা তারিখ ঠিক করুন, কফি হোক বা ভিডিও কল। Comparison কমান — বন্ধুর সাফল্যে খুশি হতে শিখুন, আপনার জীবন আলাদা, তুলনা অর্থহীন। Boundary সম্মান করুন — সবার জীবনে নিজস্ব অগ্রাধিকার আছে, সেটা মানুন। আর expectation adjust করুন — আগের মতো প্রতিদিন কথা হবে না, এটা মেনে নিন, কিন্তু গুণমানের কথোপকথনে বিনিয়োগ করুন।
বয়স বন্ধুত্ব কেড়ে নেয় না, শুধু ফিল্টার করে
বছর যায়, বন্ধুর সংখ্যা কমে। এটা দুঃখজনক, কিন্তু এটা খারাপ নয়। বয়স আসলে একটা ফিল্টারের কাজ করে — যে বন্ধুত্ব টিকে থাকে, সেটা সোনার মতো খাঁটি। সংখ্যায় কমে, কিন্তু মানে বাড়ে। ২০ জন পরিচিতের চেয়ে ২ জন প্রকৃত বন্ধু অনেক বেশি মূল্যবান — যারা আপনার ব্যর্থতার কথা জানে, তবুও পাশে থাকে; যারা আপনার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয় না, বরং উৎসব করে।
তাই যাদের হারিয়েছেন — কিছু স্মৃতির সাথে রেখে দিন, কৃতজ্ঞতার সাথে। আর যারা আছেন — তাদের একটু সময় দিন, আজই।
“বন্ধুত্ব কমে না বয়সে, শুধু বদলে যায় তার রূপ।”

