back to top
শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬
HomeBusinessStartupসুইজারল্যান্ড থেকে ১৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ পেল iFarmer

সুইজারল্যান্ড থেকে ১৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ পেল iFarmer

বাংলাদেশের মাটিতে যে মানুষটা ফসল ফলায়, সে প্রায়ই জানে না তার ফসলের ন্যায্য দাম কত। সার কিনতে গিয়ে দাদন নেয়, বাজারে যেতে গিয়ে দালালের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষক আনুষ্ঠানিক ঋণ সুবিধার বাইরে থাকেন। ব্যাংকগুলো কৃষকদের ঋণের অযোগ্য মনে করে, ফলে তারা বাধ্য হন মহাজন বা সুদখোরদের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে।

এই বাস্তবতা দেখেই ২০১৯ সালে জন্ম নিয়েছিল iFarmer — একটি অ্যাগ্রিটেক স্টার্টআপ, যার স্বপ্ন ছিল প্রযুক্তি দিয়ে কৃষির পুরো চেইনটাকে বদলে দেওয়া। আর সেই স্বপ্নের উপর আস্থা রাখল এবার সুইজারল্যান্ড।

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ড-ভিত্তিক ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং প্ল্যাটফর্ম Symbiotics, iFarmer-কে ১৫ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই অর্থ iFarmer-এর কার্যকরী মূলধনের চাহিদা পূরণ করবে এবং সারা বাংলাদেশে কৃষি উপকরণ বিতরণ ও বাজার সংযোগ আরও শক্তিশালী করবে।

এটা শুধু টাকার গল্প না। এটা বিশ্বাসের গল্প — এই বিশ্বাসের যে, বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষিতে প্রযুক্তির মিলন ঘটালে সত্যিকারের পরিবর্তন সম্ভব।

Symbiotics হলো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং প্ল্যাটফর্ম, যারা মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে অর্থায়নের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনে কাজ করে। তারা শুধু মুনাফা দেখে না — তারা দেখে মানুষের জীবন বদলাচ্ছে কিনা।

iFarmer কী করে আসলে?

iFarmer এমন একটি ইন্টিগ্রেটেড কৃষি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে যা কৃষক, খুচরা বিক্রেতা, সরবরাহকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের একসাথে সংযুক্ত করে — অর্থায়ন, ডিজিটাল পরামর্শ, কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং পণ্য বিক্রির বাজার — সব এক জায়গায়।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাপ্লাই চেইনে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে বাংলাদেশের কৃষক তার পণ্যের মাত্র ৪০ শতাংশ মূল্য পান, এবং প্রতি বছর ২৫০ কোটি ডলারের ফসল নষ্ট হয় পণ্য হাতবদলের একাধিক স্তরে। iFarmer এই দুষ্টচক্র ভাঙতে চায়।

২০১৯ সাল থেকে iFarmer ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য “ওয়ান-স্টপ সলিউশন” হিসেবে কাজ করছে — জামানতমুক্ত ঋণ, মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ, এবং সরাসরি বাজার সংযোগ। বর্তমানে iFarmer সারা দেশের ৪২টি জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং তাদের প্ল্যাটফর্মে ৩ লাখেরও বেশি কৃষক নিবন্ধিত।

পাশাপাশি ২৪,০০০ কৃষি খুচরা বিক্রেতাকে সংযুক্ত করে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে।

KriShop: ডিজিটাল হাট কৃষকের দোরগোড়ায়

নতুন এই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ যাবে iFarmer-এর কৃষি উপকরণ বিতরণ প্ল্যাটফর্ম KriShop-এ। KriShop-এর মাধ্যমে সাপ্লাই চেইন আরও শক্তিশালী করা হবে, যাতে কৃষকরা মানসম্মত উপকরণ পান এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য নির্ভরযোগ্য বাজার নিশ্চিত হয়।

ভাবুন একজন কৃষকের কথা — যিনি আগে সার কিনতে শহরে ছুটতেন, এখন মোবাইলে অর্ডার করলেই পৌঁছে যায় বাড়িতে। ফসল উঠলে নিজেই বায়ার খুঁজতেন, এখন iFarmer সেই সংযোগ ঘটিয়ে দেয়। এটাই KriShop-এর গল্প।

একটি স্বপ্নের বিবর্তন

iFarmer-এর যাত্রা শুধু এক ধাপে হয়নি। শুরুতে কোম্পানিটি ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের সাথে কৃষকদের সংযুক্ত করত — মানুষ iFarmer প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফার্ম প্রকল্পে বিনিয়োগ করত এবং ফসল তোলার পর মুনাফা ভাগ পেত। এই মডেল প্রমাণ করল যে কৃষক ঋণযোগ্য, এবং তৈরি করল গুরুত্বপূর্ণ ডেটা।

এরপর ২০২২ সালে IDLC ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড, Millville Opportunities এবং Startup Bangladesh-এর অংশগ্রহণে ২১ লাখ ডলারের pre-Series A রাউন্ড সম্পন্ন হয়। আর ২০২৫ সালের এপ্রিলে Nexus for Development-এর Pioneer Facility থেকে আরও ৫ লাখ ডলার ঋণ এলো।

এই আন্তর্জাতিক ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধার দিকে iFarmer-এর এই বিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখাচ্ছে যে ইমপ্যাক্ট-ওরিয়েন্টেড আন্তর্জাতিক ঋণ এখন সরাসরি বাংলাদেশের কৃষি সাপ্লাই চেইনে আসছে।

যারা বিশ্বাস করলেন

iFarmer-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও Fahad Ifaz বলেছেন, “Symbiotics-এর সাথে এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের কৃষির জন্য ডিজিটাল ও আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তোলার আমাদের যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই ১৫ লাখ ডলার ফার্ম থেকে বাজারের দূরত্ব কমাতে সাহায্য করবে।”

Symbiotics-এর ফিনটেক প্রধান Aldric Luyt বলেছেন, “এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত কৃষি সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। iFarmer-এর উদ্ভাবনী মডেল সাপ্লাই চেইনের দক্ষতা বাড়াচ্ছে এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে।”

বড় ছবিটা কী?

বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশকে কাজ দেয় এবং GDP-তে প্রায় ১২ শতাংশ অবদান রাখে। দেশে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ কৃষক আছেন, যারা ১ কোটি ৭০ লাখ খামারে কাজ করেন। কিন্তু এই বিশাল খাতটিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ছিল প্রযুক্তির দিক থেকে। iFarmer সেই শূন্যতা পূরণ করছে। আর এখন যখন সুইজারল্যান্ড থেকে বিনিয়োগ আসে — এর মানে হলো বিশ্ব স্বীকার করছে: বাংলাদেশের কৃষকের গল্পটা বদলাচ্ছে।

মাটির সাথে যার সম্পর্ক, পৃথিবীও তার পাশে দাঁড়ায় — শুধু দরকার সঠিক মানুষের হাত ধরে সেই মাটিকে প্রযুক্তির আলোয় দেখানো।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular