টোকিওর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুক্রবার সকালের ক্লাসরুম। হঠাৎ সব স্মার্টফোনে একসাথে বেজে ওঠে এক অদ্ভুত সতর্কধ্বনি। “জিশিন দেসু! জিশিন দেসু!” (ভূমিকম্প আসছে!) শিক্ষক কিছু বলার আগেই ৭ বছরের ছোট্ট ইউকি এবং তার সহপাঠীরা নিজেদের ডেস্কের নিচে ঢুকে টেবিলের পা শক্ত করে ধরে ফেলেছে। খেলার মাঠের বাচ্চারা দৌড়ে মাঠের মাঝখানে চলে এসেছে, দালান থেকে দূরে। এই দৃশ্য জাপানে যেমন স্বাভাবিক, তেমনি আমাদের বাংলাদেশের জন্য এখনো অকল্পনীয়।
গত ২১ নভেম্বর শুক্রবার ভোর ৫টায় ঢাকায় ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে যেভাবে আমরা আতঙ্কিত হয়েছি, ঘুম থেকে উঠে রাস্তায় ছুটে গিয়েছি, সেটা আসলে আমাদের অপ্রস্তুতির একটা বড় প্রমাণ। কিন্তু পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে ভূমিকম্প এতটাই নিয়মিত ব্যাপার যে, সেখানকার মানুষেরা শিখে নিয়েছে কীভাবে এর সঙ্গে বসবাস করতে হয়। আজ জেনে নেওয়া যাক, কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ এবং সেখানকার মানুষেরা কীভাবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।
জাপান: যেখানে প্রতিদিন মাটি কাঁপে
জাপান হলো বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। বছরে প্রায় ১,৫০০টি ভূমিকম্প হয় এই দ্বীপদেশে, যার বেশিরভাগই সামান্য কম্পন মাত্র। কারণটা হলো জাপান অবস্থিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অফ ফায়ারে, যেখানে চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেট একসাথে মিলিত হয়েছে।
কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, ২০১১ সালে ৯.০ মাত্রার ভয়ানক ভূমিকম্পেও জাপানের মৃত্যুসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অন্যদিকে, ২০২৩ সালে তুরস্ক ও সিরিয়ায় ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৬০,০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। এর পেছনে রয়েছে জাপানের বছরের পর বছরের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা।
শিশুদের থেকেই শুরু হয় প্রশিক্ষণ
জাপানে স্কুলে প্রতি মাসে ভূমিকম্প ড্রিল হয়। শিশুরা খুব ছোটবেলা থেকেই শিখে নেয় কীভাবে ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিতে হয়, কীভাবে খোলা জায়গায় পালিয়ে যেতে হয়। ফায়ার ডিপার্টমেন্ট এমনকি ছোট বাচ্চাদের ভূমিকম্প সিমুলেটরে ঢুকিয়ে প্রকৃত কম্পন অনুভব করায়, যাতে তারা বুঝতে পারে কখন কোন ধরনের ভূমিকম্প হচ্ছে।
টোকিওর হনজো লাইফ সেফটি লার্নিং সেন্টারে পরিবারগুলো একসাথে ট্রেনিং নিতে আসে। সেখানে বন্যা, অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমিকম্পের বাস্তব সিমুলেশন দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত দুর্যোগের সময় মানুষ আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
প্রযুক্তি যা জীবন বাঁচায়
জাপানের প্রতিটি স্মার্টফোনে ইনস্টল করা আছে ভূমিকম্প সতর্কীকরণ সিস্টেম। ভূমিকম্পের ৫-১০ সেকেন্ড আগে এই সিস্টেম সতর্কধ্বনি দেয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ড, কিন্তু এই সময়টুকুই যথেষ্ট নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য।
দেশের সব শিনকানসেন (বুলেট ট্রেন) সিস্টেমেও ভূমিকম্প সেন্সর লাগানো। ২০১১ সালে যখন ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তখন চলন্ত ২৭টি শিনকানসেনের একটিও দুর্ঘটনায় পড়েনি। সব ট্রেন আগেই থেমে গিয়েছিল ছোট ভূকম্পন শনাক্ত করেই।
দালান যা দুলে, কিন্তু ভাঙে না
জাপানের ভবনগুলো বানানো হয় ভূমিকম্পের কথা মাথায় রেখে। টোকিও স্কাইট্রি বিল্ডিং ডিজাইন করা হয়েছে প্রাচীন কাঠের প্যাগোডার আদলে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ভূমিকম্প সহ্য করেছে। অনেক দালান বানানো হয় টেফলনের উপর, অথবা রাবার ও তরলে ভরা বেসের উপর, যা ভূমিকম্পের শক শোষণ করে নেয়।
জাপানের ভবন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি নতুন দালান ভূমিকম্প সহ্য করার মতো শক্তিশালী হতে হবে। এমনকি পুরনো দালানগুলোও সংস্কার করে ভূমিকম্প-সহনীয় করা হয়েছে। ফলে টোকিওর প্রায় ৮৭% ভবন ভূমিকম্প সহ্য করতে পারে।
দুর্যোগ সচেতনতা সংস্কৃতির অংশ
১৯২৩ সালের ভয়াবহ কান্টো ভূমিকম্পের স্মরণে জাপান সরকার ১ সেপ্টেম্বর “দুর্যোগ প্রতিরোধ দিবস” হিসেবে পালন করে। পুরো সপ্তাহজুড়ে চলে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম, ড্রিল এবং প্রশিক্ষণ।
প্রতিটি জাপানি পরিবারের ঘরে আছে জরুরি সরঞ্জামের কিট – বোতলবন্দী পানি, খাবার, ফার্স্ট এইড, টর্চ, এমনকি রেডিও যা নিয়মিত আপডেট দেয়। সাধারণ সুপারশপ বা ড্রাগস্টোরেই পাওয়া যায় এসব সরঞ্জাম।
চিলি: অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দেশ
চিলিতে ১৯৬০ সালে রেকর্ড করা হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প – ৯.৫ মাত্রার। সেই দুর্যোগ থেকে শিখে চিলি তৈরি করেছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা বিল্ডিং কোড।
বিল্ডিং কোড যা প্রাণ বাঁচায়
২০১০ সালে চিলিতে ৮.৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ৫০০ মানুষ মারা যায়, যা প্রচণ্ড দুঃখজনক। কিন্তু এই মাত্রার ভূমিকম্পে অন্য দেশে হলে মৃত্যুসংখ্যা হতো হাজার হাজার। এর কারণ চিলির কড়াকড়ি বিল্ডিং কোড।
চিলির আইন অনুযায়ী, প্রতিটি দালান ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারার মতো শক্তিশালী হতে হবে। দালান ভেঙে পড়তে পারবে না, এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মানুষের জীবন রক্ষা করতে হবে। চিলির দালানগুলো বানানো হয় শক্ত কলাম ও নমনীয় বিমের সমন্বয়ে, যাতে ভূমিকম্পের সময় দালান দুলতে পারে কিন্তু ভেঙে না পড়ে।
ইউনাইটেড নেশনস ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অফিস চিলিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে বিশ্বের সামনে। ২০১৪ সালে ৮.২ মাত্রার ভূমিকম্পে মাত্র ৬ জন মারা যায় চিলিতে, যার মধ্যে ৪ জন হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন।
জনসচেতনতা এবং সিমুলেশন ড্রিল
চিলিতে নিয়মিত সারাদেশব্যাপী ভূমিকম্প ড্রিল হয়। ২০১২ সালে ভালপারাইসো উপকূলীয় এলাকায় একটি মহড়ায় ৫ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল।
চিলির সরকারি সংস্থা ONEMI (এখন নতুন সংস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে) “চিলে প্রিপারাদো” বা “চিলি রেডি” নামে একটি প্রোগ্রাম চালায়। তারা স্কুল ও মিউনিসিপ্যালিটিতে গিয়ে মেলা আয়োজন করে, ওয়ার্কশপ করে এবং জরুরি কিট বিতরণ করে। ছোট শিশুরাও ক্লাসরুমে সিমুলেশনের মাধ্যমে শিখছে কীভাবে দুর্যোগে মোকাবেলা করতে হয়।
সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা
২০১০ সালে চিলির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল সুনামি সতর্কতা দিতে না পারা। সরকারি যোগাযোগে বিলম্ব হওয়ায় অনেক মানুষ মারা যায়। সেই ভুল থেকে শিখে চিলি তৈরি করেছে উন্নত সতর্কতা ব্যবস্থা।
এখন চিলির ন্যাশনাল সিসমোলজিক্যাল সেন্টার ২৪ ঘণ্টা কাজ করে। সারাদেশে ছড়িয়ে আছে ভূমিকম্প সেন্সর নেটওয়ার্ক। উপকূলে বসানো হয়েছে DART (ডিপ-ওশান অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড রিপোর্টিং অফ সুনামিস) স্টেশন, যা পানির নিচের চাপ পরিমাপ করে সুনামির আগাম সতর্কতা দিতে পারে।
২০১৫ সালে ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ১০ লাখ মানুষকে উপকূলীয় এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টায়। ১৫ ফুট উঁচু ঢেউ এসেছিল, কিন্তু মানুষ আগেই নিরাপদ হয়ে গিয়েছিল।
ইন্দোনেশিয়া, চীন ও অন্যান্য দেশ
ইন্দোনেশিয়া প্রতি বছর ৬.০ মাত্রার ওপরে প্রায় একটি করে ভূমিকম্প অনুভব করে। রিং অফ ফায়ারে থাকায় এই দেশে ১২০টিরও বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে।
চীনও টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষস্থলে থাকায় ভূমিকম্পপ্রবণ। ২০০৮ সালের সিচুয়ান ভূমিকম্পের পর চীন ব্যাপক গবেষণা ও উন্নয়ন কাজে মনোনিবেশ করেছে।
ইরান, তুরস্ক, ফিলিপাইন্স, মেক্সিকো – প্রতিটি দেশই তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়। কিন্তু যেসব দেশ প্রস্তুতি নিয়েছে, শিক্ষায় বিনিয়োগ করেছে এবং কড়া বিল্ডিং কোড প্রয়োগ করেছে, তারা মৃত্যুসংখ্যা অনেক কমিয়ে আনতে পেরেছে।
বাংলাদেশ কী শিখতে পারে:
আমাদের ঢাকা শহর অবস্থিত একটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছে। বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরে সতর্ক করছেন যে, বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। ২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে আমরা দেখেছি, আমরা কতটা অপ্রস্তুত।
জাপান ও চিলি থেকে আমরা শিখতে পারি:
১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ড্রিল চালু করা:
প্রতি মাসে অন্তত একবার স্কুল-কলেজে ভূমিকম্প ড্রিল হওয়া উচিত। শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকে শিখে নেয়, তাহলে তারা সারা জীবন মনে রাখবে।
২. বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে প্রয়োগ:
ঢাকার অধিকাংশ বিল্ডিং ভূমিকম্প সহ্য করার মতো শক্তিশালী নয়। নতুন দালানের জন্য কড়া নিয়ম আনতে হবে এবং পুরনো দালানও সংস্কার করতে হবে।
৩. সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরি করা:
আমাদের দরকার উন্নত সতর্কতা ব্যবস্থা, যা ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ড আগে মানুষকে সতর্ক করতে পারবে।
৪. জরুরি প্রস্তুতি সংস্কৃতি তৈরি করা:
প্রতিটি পরিবারের জরুরি কিট থাকা উচিত। মানুষকে জানানো উচিত কোথায় এবং কীভাবে আশ্রয় নিতে হবে।
৫. গবেষণা ও বিনিয়োগ:
দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ ব্যয়বহুল মনে হতে পারে, কিন্তু এটা আসলে জীবন বাঁচানোর বিনিয়োগ।
ভূমিকম্প আমরা ঠেকাতে পারব না। প্রকৃতির এই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মানুষের নেই। কিন্তু প্রস্তুতি নিয়ে, শিক্ষা দিয়ে এবং সচেতনতা তৈরি করে আমরা মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারি।
জাপান ও চিলির মানুষেরা দেখিয়ে দিয়েছে যে, ভূমিকম্প-সহ বসবাস করা সম্ভব। তাদের সংস্কৃতিতে দুর্যোগ প্রস্তুতি এখন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধ মানুষ, সবাই জানে কী করতে হবে যখন মাটি কাঁপবে।
আমাদের এখন সময় এসেছে আতঙ্ক ছেড়ে, প্রস্তুতি ও উদ্ভাবনকে আলিঙ্গন করার। জীবনরক্ষাকারী জ্ঞান অর্জন করুন, আপনার অবকাঠামোকে শক্তিশালী করুন এবং একটি স্থিতিস্থাপক ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুন। প্রস্তুতিই হলো ভয়কে অতিক্রম করার একমাত্র ইতিবাচক শক্তি।

