রাত ১১টা। ল্যাপটপের স্ক্রিনে সাতটা ট্যাব খোলা, ফোনে অফিস গ্রুপের নোটিফিকেশন, আর মাথার ভেতরে একটাই প্রশ্ন: “এত খাটছি, তবু কেন কিছু বদলাচ্ছে না?”
এই প্রশ্ন আপনার একার নয়। তরুণ পেশাজীবীদের বড় অংশ পরিশ্রমে কমতি রাখে না। সমস্যা হলো, তারা এমন কিছু অভ্যাস বয়ে বেড়ায় যা নীরবে ক্যারিয়ারের গতি কমিয়ে দেয়। নতুন কিছু শেখার আগে বরং কিছু জিনিস ছাড়ার সময় এসেছে।
১. “সব কাজ একসাথে” করা বন্ধ করুন
মাল্টিটাস্কিংকে আমরা দক্ষতা ভাবি। গবেষণা অন্য কথা বলে। স্ট্যানফোর্ডের গবেষকদের একটি পরিচিত গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ঘন ঘন একসাথে একাধিক কাজ করে, তারা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য এড়াতে এবং কাজ বদলাতে তুলনামূলকভাবে খারাপ। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষক গ্লোরিয়া মার্কের কাজ বলছে, একবার মনোযোগ ছুটে গেলে আগের একাগ্রতায় ফিরতে গড়ে প্রায় ২৩ মিনিট লাগে। মানে প্রতিটি “একটু ফোন দেখে নিই” আসলে আধঘণ্টার ক্ষতি। একটি কাজ শেষ করুন, তারপর পরেরটায় যান।
২. সাহায্য চাইতে লজ্জা পাওয়া বন্ধ করুন
আমরা ভাবি, প্রশ্ন করলে সবাই ভাববে “ও কিছুই জানে না।” হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সাধারণত অনুমান করে তার চেয়ে অনেক বেশি সহজে অন্যরা সাহায্য করতে রাজি হয়। আমরা অন্যের সদিচ্ছাকে অবমূল্যায়ন করি।
তিন ঘণ্টা একা আটকে থাকার চেয়ে তিন মিনিটের একটা প্রশ্ন বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। প্রশ্ন করা দুর্বলতা নয়, এটা শেখার গতি বাড়ানোর কৌশল।
৩. নিজেকে অন্যের সাথে মাপা বন্ধ করুন
লিংকডইনে বন্ধুর প্রমোশনের পোস্ট দেখলেন, আর হঠাৎ নিজের জীবনটা “পিছিয়ে” মনে হলো। কিন্তু আপনি তার ক্যারিয়ারের হাইলাইট রিল দেখছেন, আর নিজেরটা দেখছেন পুরো সিনেমা, বিজ্ঞাপন বিরতিসহ।
সামাজিক তুলনা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঙ্গার এ নিয়ে কাজ করেছেন সেই ১৯৫০-এর দশকে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া এই তুলনাকে চব্বিশ ঘণ্টার অভ্যাসে পরিণত করেছে। নিজের কাল আর আজকের মধ্যে তুলনা করুন। প্রশ্ন হোক: “আমি কি গত বছরের চেয়ে ভালো?”
৪. ঘুম বিসর্জন দিয়ে “হাস্টল” করা বন্ধ করুন
“ঘুমাব পরে, আগে ক্যারিয়ার।” এই গর্বটা বিপজ্জনক। অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, টানা ১৭-১৯ ঘণ্টা জেগে থাকার পর মানুষের কর্মক্ষমতা এমন হয়ে যায়, যেন সে অ্যালকোহলের নির্দিষ্ট মাত্রার প্রভাবে আছে (রক্তে প্রায় ০.০৫%)।
ক্লান্ত মস্তিষ্ক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, রেগে যায়, সৃজনশীলতা হারায়। ঘুম বিলাসিতা নয়, এটা আপনার সবচেয়ে বড় পারফরম্যান্স টুল।
৫. “আমি এটা পারি না” বলা বন্ধ করুন
একটা ছোট শব্দ যোগ করুন: “এখনও।” “আমি এটা পারি না” আর “আমি এটা এখনও পারি না” এই দুটো বাক্যের পার্থক্য বিশাল।
স্ট্যানফোর্ডের মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডুয়েকের “গ্রোথ মাইন্ডসেট” গবেষণা দেখিয়েছে, যারা বিশ্বাস করে দক্ষতা চেষ্টায় বাড়ানো যায়, তারা ব্যর্থতার পর হাল ছাড়ে কম, শেখে বেশি। প্রথম প্রেজেন্টেশনে কাঁপবেন, প্রথম ক্লায়েন্ট কলে হোঁচট খাবেন। এটাই প্রক্রিয়ার অংশ।
৬. সম্পর্কে বিনিয়োগ না করা বন্ধ করুন
“আমি তো কাজ দিয়ে কথা বলব, নেটওয়ার্কিং আমার জন্য না।” অনেকেই এ কথা বলে। কিন্তু হার্ভার্ডের ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা Study of Adult Development-এর মূল শিক্ষা হলো, ভালো সম্পর্কই মানুষের সুখ ও সুস্থতার সবচেয়ে শক্তিশালী নির্ধারক।
ক্যারিয়ারেও সত্যিটা একই। সুযোগ প্রায়ই আসে মানুষের মাধ্যমে। একজন মেন্টরকে মেসেজ দিন। সহকর্মীর সাফল্যে অভিনন্দন জানান। কিছু না চেয়েই সম্পর্ক তৈরি করুন আপনি যা যা শিখতে চান, তার তালিকা আগেই লম্বা হয়ে আছে। কিন্তু অনেক সময় এগিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন কিছু যোগ করতে হয় না, পুরোনো বোঝাটা নামিয়ে রাখলেই হয়।
আজ রাতে ল্যাপটপ বন্ধ করার আগে নিজেকে একটাই প্রশ্ন করুন: “কোন অভ্যাসটা আমাকে আটকে রাখছে, আর আমি সেটা কবে ছাড়ব?”
উত্তরটা “কাল” হলে আসলে সেটা “কখনও না”। শুরুটা আজই হোক, ছোট করে হলেও। কারণ পাঁচ বছর পর আপনি সেই মানুষটাই হবেন, যার অভ্যাসগুলো আপনি আজ বেছে নিচ্ছেন।

