আপনার কি কখনো এমন হয়েছে? রাতে শুয়ে ভাবছেন, “কাল থেকে সব বদলে ফেলব। ভোরে উঠব, ব্যায়াম করব, পড়াশোনায় মন দেব।” অথচ সকালে অ্যালার্ম বাজল, আপনি আরেকবার স্নুজ চাপলেন। দিনটা আবার আগের মতোই গেল।
এটা আপনার একার গল্প নয়। আমাদের অনেকেরই গল্প।আমরা ভাবি সফল মানুষেরা হয়তো আলাদা কিছু। তাদের মেধা বেশি, ভাগ্য ভালো, সুযোগ হাতের কাছে। কিন্তু গবেষণা বলছে অন্য কথা। ডিউক ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের দৈনন্দিন কাজের প্রায় ৪০ শতাংশই সচেতন সিদ্ধান্ত নয়, অভ্যাসের ফল। অর্থাৎ আপনার জীবনের প্রায় অর্ধেকটা চলছে অটোপাইলটে। প্রশ্ন হলো, সেই অটোপাইলট আপনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
সুখবর হলো, অভ্যাস বদলানো যায়। আর আজ থেকেই শুরু করা যায়। চলুন, সেই ১০টি অভ্যাসের কথা বলি।
১. সকালটা নিজের দখলে নিন
ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নিলে আপনার দিনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অন্যের হাতে। কারও মেসেজ, কারও পোস্ট, কারও জরুরি অবস্থা। প্রথম ৩০ মিনিট নিজের জন্য রাখুন। একটু হাঁটুন, লিখুন, কিংবা চুপচাপ বসে দিনের পরিকল্পনা করুন। সকালটা আপনার হলে দিনটাও আপনার হবে।
২. লক্ষ্য লিখে রাখুন
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের একটি বহুল আলোচিত তথ্য অনুযায়ী, যারা লক্ষ্য লিখে রাখে তারা না-লেখা মানুষদের তুলনায় অনেক বেশি সফল হয়। (এই গবেষণার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে লিখে রাখলে লক্ষ্যে স্পষ্টতা ও দায়বদ্ধতা বাড়ে, এ কথা একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত।) মাথার ভেতরের স্বপ্ন কাগজে নামলে সেটা পরিকল্পনা হয়ে ওঠে। আজই একটা খাতা নিন। লিখুন, ছয় মাস পর আপনি কোথায় থাকতে চান।
৩. প্রতিদিন কিছু নতুন শিখুন
যারা থেমে যায়, তারা পিছিয়ে পড়ে। দিনে মাত্র ২০ মিনিট বই পড়ুন। ওয়ারেন বাফেটের মতো মানুষও নিজের দিনের একটা বড় অংশ পড়ার পেছনে ব্যয় করেন। আপনার ক্ষেত্র যা-ই হোক, মার্কেটিং, ব্যাংকিং কিংবা প্রযুক্তি, জ্ঞানের সঞ্চয় কখনো বৃথা যায় না। সুদের মতো সেটা সময়ের সাথে বাড়তে থাকে।
৪. সময়ের দাম দিতে শিখুন
টাকা হারালে ফিরে পাওয়া যায়, সময় নয়। দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আগে করুন। আর অপ্রয়োজনীয় স্ক্রল, গসিপ আর “পরে দেখব” মানসিকতাকে না বলতে শিখুন। প্রতিটি “হ্যাঁ”-র পেছনে একটা “না” লুকিয়ে থাকে, আর সেই “না” হতে পারে আপনার লক্ষ্যের প্রতি।
৫. শরীরকে অবহেলা করবেন না
সফলতার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলে শরীরটাই আপনার ভিত্তি। গবেষণা বলছে, নিয়মিত ব্যায়াম শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা, মনোযোগ ও মেজাজও উন্নত করে। পর্যাপ্ত ঘুমও জরুরি। সারা রাত জেগে কাজ করাকে কৃতিত্ব ভাবার দিন শেষ। দিনে ৩০ মিনিট হাঁটাও একটা শুরু।
৬. ছোট ছোট জয় উদযাপন করুন
আমরা প্রায়ই বড় লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে নিজের এগিয়ে যাওয়াটা দেখতেই ভুলে যাই। হার্ভার্ডের গবেষক টেরেসা আমাবিলের গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের ক্ষেত্রে ছোট অগ্রগতির অনুভূতিই মানুষের প্রেরণার সবচেয়ে বড় উৎস। আজ একটা কাজ শেষ করলে নিজের পিঠ চাপড়ে দিন। এই ছোট জয়গুলোই আপনাকে পরের দিন আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে।
৭. সম্পর্কে বিনিয়োগ করুন
আপনি যাদের সাথে সময় কাটান, আপনি ধীরে ধীরে তাদের মতোই হয়ে ওঠেন। হার্ভার্ডের দীর্ঘতম গবেষণাগুলোর একটি, যা ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে, দেখিয়েছে ভালো সম্পর্কই মানুষকে সবচেয়ে সুখী ও স্বাস্থ্যবান রাখে। এমন মানুষদের পাশে থাকুন যারা আপনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়, আপনার স্বপ্নে বিশ্বাস রাখে, আর প্রয়োজনে সত্যি কথাটা বলতেও দ্বিধা করে না।
৮. ব্যর্থতাকে শিক্ষক বানান
কেউ প্রথমবারেই সফল হয় না। টমাস এডিসন হাজারবার ব্যর্থ হয়ে বাল্ব আবিষ্কার করেছিলেন, এই গল্প আমরা সবাই জানি। কিন্তু মূল কথাটা হলো তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। ব্যর্থতাকে তিনি শেষ ভাবেননি, ভেবেছিলেন তথ্য। ক্যারল ড্যুয়েকের “গ্রোথ মাইন্ডসেট” তত্ত্বও এ কথাই বলে। যারা বিশ্বাস করে যে চেষ্টায় উন্নতি সম্ভব, তারা ব্যর্থতার পরেও এগিয়ে যায়। পড়ে গেলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, “এ থেকে আমি কী শিখলাম?”
৯. ধারাবাহিকতাকেই শক্তি বানান
একদিনের তীব্র চেষ্টার চেয়ে প্রতিদিনের ছোট চেষ্টা অনেক বেশি শক্তিশালী। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের একটি গবেষণা অনুযায়ী, একটি নতুন অভ্যাস স্বয়ংক্রিয় হতে গড়ে প্রায় ৬৬ দিন লাগে, যদিও ১৮ থেকে ২৫৪ দিন পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি হতে পারে। তাই হাল ছাড়বেন না। একদিন বাদ গেলে থেমে যাবেন না, পরের দিন আবার শুরু করুন। মূল মন্ত্র হলো: কখনো টানা দুইদিন বাদ দেবেন না।
১০. কৃতজ্ঞ থাকুন, সৎ থাকুন
শেষ অভ্যাসটা সবচেয়ে সহজ, অথচ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে তিনটি জিনিসের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃতজ্ঞতার চর্চা মানসিক স্বাস্থ্য ও ইতিবাচকতা বাড়ায়। আর সততা? সেটাই আপনার সবচেয়ে বড় পুঁজি। সাফল্য দিয়ে হয়তো অনেক কিছু কেনা যায়, কিন্তু সুনাম একবার হারালে ফিরিয়ে আনা কঠিন। সৎভাবে অর্জিত ছোট সাফল্যও অসৎ পথে পাওয়া বড় সাফল্যের চেয়ে অনেক বেশি শান্তি দেয়।
এই দশটি অভ্যাস পড়ে হয়তো মনে হচ্ছে, “এত কিছু একসাথে কীভাবে সম্ভব?” উত্তর হলো, একসাথে করতে হবে না। একটা বেছে নিন। শুধু একটা। আজ রাতেই ঠিক করুন, কাল সকাল থেকে কোনটা দিয়ে শুরু করবেন। এক সপ্তাহ পর আরেকটা যোগ করুন।
মনে রাখবেন, সফলতা কোনো একদিনের নাটকীয় মুহূর্ত নয়। এটা হাজারটা সাধারণ দিনের নীরব সমষ্টি। যে দিনগুলোতে কেউ আপনার হাততালি দেয়নি, কেউ দেখেনি আপনি কতটা লড়েছেন, সেই দিনগুলোই আপনাকে গড়ে তোলে।
আজ থেকে পাঁচ বছর পর আপনি যে মানুষটা হবেন, সে আজকের আপনার সিদ্ধান্তের ফল। তাই অপেক্ষা করবেন না। সোমবার, নতুন মাস বা নতুন বছরের জন্য বসে থাকবেন না। শুরুটা আজই। এই মুহূর্তেই। কারণ আপনার ভবিষ্যৎ আপনার কাছ থেকে শুধু একটা জিনিস চায়, আপনি যেন শুরু করেন।

