রাত একটা। ফোনের স্ক্রিনে একটা নাম বারবার জ্বলে উঠছে। সারাদিন কথা হয়েছে, মিম শেয়ার হয়েছে, “খেয়েছিস?” জিজ্ঞেসও করা হয়েছে। অথচ কেউ জানে না, এই সম্পর্কটার নাম কী। বন্ধুরা জানতে চাইলে উত্তর একটাই: “জানি না রে… মনে হয় কিছু একটা চলছে।”
এই “কিছু একটা”-এর একটা নামও এখন আছে: মেবিলেশনশিপ (Maybe + Relationship)।
মেবিলেশনশিপ আসলে কী?
এটা প্রেমও না, আবার নিছক বন্ধুত্বও না। দুজন মানুষ প্রেমিক-প্রেমিকার মতোই সময় কাটায়, আবেগ ভাগ করে, একে অন্যের দিনের খোঁজ রাখে। কিন্তু “আমরা রিলেশনশিপে আছি” কথাটা কেউ মুখে আনে না। কোনো দায়বদ্ধতা নেই, কোনো লেবেল নেই, আর ভবিষ্যতের কোনো প্রতিশ্রুতিও নেই।
আরও কয়েকটা চেনা লক্ষণ:
– ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হয়, কিন্তু “আমরা কী?” প্রশ্নটা এলে প্রসঙ্গ বদলে যায়
– একে অন্যের পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হয় না
– ঈদ, জন্মদিন বা বিশেষ দিনে দেখা হবে কি না, নিশ্চিত থাকে না
– দুজনেই মনে মনে জানে, কেউ একজন আরও বেশি জড়িয়ে পড়েছে
এটা কি শুধু আমাদের গল্প?
না। শব্দটা বিদেশি হলেও অভিজ্ঞতাটা এখন বিশ্বজুড়ে জেন-জির।
গবেষকেরা এই ধরনের সম্পর্ককে বলছেন “সিচুয়েশনশিপ” বা “অ্যামবিগুয়াস রিলেশনশিপ”। সম্পর্কবিষয়ক মনোবিজ্ঞানে “রিলেশনশিপ অ্যামবিগুইটি” নিয়ে গবেষণা করেছেন অনেকেই, বিশেষ করে মার্কিন যোগাযোগ-গবেষক লেসলি বাক্সটার ও আরও কয়েকজন। তাঁদের কাজের সারকথা হলো, সম্পর্কের অবস্থা অস্পষ্ট থাকলে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ আর মানসিক চাপ বাড়ে। কারণ মস্তিষ্ক অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না। সে বারবার উত্তর খোঁজে: “ও কি আমাকে সত্যিই পছন্দ করে?”
আরেকটি ধারণাও এখানে প্রাসঙ্গিক: “হুকআপ কালচার” নিয়ে গবেষণা, যেখানে দেখা গেছে, তরুণদের একটা বড় অংশ আনুষ্ঠানিক প্রেমের চেয়ে “ফ্লেক্সিবল” সম্পর্কে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। যদিও গবেষণাগুলোর বেশিরভাগই পশ্চিমা সমাজে হয়েছে, তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যাগুলো সরাসরি মেলানো যায় না। তবে ঢাকা, রাজশাহী বা চট্টগ্রামের ক্যাম্পাসে কান পাতলেই বোঝা যায়, অভিজ্ঞতাটা এখানেও অচেনা নয়।
কেন এই ট্রেন্ড?
১. ক্যারিয়ার আগে, সম্পর্ক পরে।
আজকের তরুণ অনিশ্চিত চাকরির বাজারে লড়ছে। বিবিএ শেষ করে চাকরি পাবে কি না, কোন শহরে থাকবে, বিদেশে যাবে কি না, কিছুই নিশ্চিত নয়। যে জীবনের নিজেরই ঠিকানা নেই, সেখানে অন্যের কাছে “চিরদিনের” কথা দেওয়াটা ভারী ঠেকে।
২. ভেঙে যাওয়ার ভয়।
অনেকে বাবা-মায়ের ঝগড়া, বন্ধুদের ব্রেকআপ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা ভাঙা সম্পর্কের গল্প দেখে বড় হয়েছে। তাদের কাছে লেবেল মানেই ঝুঁকি। লেবেল না থাকলে ব্যথা পেলেও বলা যায়, “আমরা তো আসলে কিছুই ছিলাম না।”
৩. অপশনের জঙ্গল।
ডেটিং অ্যাপ আর সোশ্যাল মিডিয়া তৈরি করেছে “আরও ভালো কেউ হয়তো আছে” ধারণা। একজনকে বেছে নিলে বাকি সবাইকে হারানোর ভয়, যাকে বলে FOMO, সম্পর্কের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেয়।
৪. সমাজের চোখ।
আমাদের সমাজে প্রেম নিয়ে এখনো অনেক বাধা আছে। পরিবার, লোকলজ্জা, ধর্ম, আর্থিক অবস্থা, সবকিছু মিলিয়ে “প্রেম করছি” কথাটা মুখে আনাই অনেক সময় কঠিন। মেবিলেশনশিপ তখন এক ধরনের নিরাপদ আড়াল।
আসল দামটা কে দেয়?
এখানেই গল্পটা মিষ্টি থেকে তেতো হতে শুরু করে মেবিলেশনশিপে প্রায় সবসময়ই একজন একটু বেশি অনুভব করে, আর অন্যজন সেই সুযোগটা নেয়, কখনো ইচ্ছে করে, কখনো না বুঝেই। যে বেশি ভাবে, সে অপেক্ষা করে। মেসেজের রিপ্লাইয়ের সময় গোনে, “লাস্ট সিন” দেখে অর্থ খোঁজে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন অ্যাংজাইটি-অ্যাটাচমেন্ট প্যাটার্ন — অনিশ্চয়তা যতো বাড়ে, আঁকড়ে ধরার প্রবণতাও ততো বাড়ে।
সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হলো, এখানে ব্রেকআপের সুযোগও নেই। কারণ ভাঙার জন্য আগে জোড়া লাগতে হয়। তাই কষ্টটার কোনো নাম থাকে না, কান্নার কোনো বৈধতা থাকে না। আপনি কাউকে বলতেও পারেন না, “আমার মন ভেঙেছে,” কারণ কেউ জিজ্ঞেসই করবে, “কার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তোমার?”
সবটাই কি খারাপ?
না, সৎ থাকলে নয়। যদি দুজনেই জানে, বোঝে এবং মেনে নেয় যে এটা একটা অনির্দিষ্ট পর্ব, তাহলে এটা কারও জন্য ঠিক-ঠাক। নিজেকে বোঝার সময় পাওয়া, চাপ ছাড়া কাউকে জানা, এসবের মূল্য আছে। সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন একজনের “দেখা যাক” অন্যজনের কাছে “আশা” হয়ে দাঁড়ায়।
নিজেকে কয়েকটা প্রশ্ন করুন
– এই সম্পর্কে আমি কি শান্তি পাচ্ছি, নাকি শুধু অপেক্ষা?
– “আমরা কী?” প্রশ্নটা কি আমি করতে ভয় পাচ্ছি? কেন?
– আমি যা চাই, ও কি তা জানে?
– ছয় মাস পরেও যদি কিছু না বদলায়, আমি কি তাতে ঠিক থাকব?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলে, সেটাই আপনার উত্তর।
আমরা এমন এক প্রজন্ম, যারা সবকিছু বেছে নিতে পারে, শুধু নিশ্চয়তাটুকু ছাড়া। অথচ ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অংশটাই হলো সাহস: একজন মানুষের চোখে চোখ রেখে বলতে পারা, “আমি তোমাকে চাই, এবং আমি এখানেই আছি।”
“মে বি” দিয়ে কেউ কখনো ঘর বাঁধেনি।
তাই যদি কাউকে সত্যিই ভালোবেসে থাকেন, তাহলে অন্তত একবার সাহস করে জিজ্ঞেস করুন। আর যদি কেউ আপনাকে “দেখা যাক” বলে ঝুলিয়ে রাখে, তবে মনে রাখবেন, আপনি এমন কারও যোগ্য, যার কাছে আপনি “হয়তো” নন। আপনি “নিশ্চিত”। কারণ যে আপনাকে সত্যিই চায়, তাকে আপনার অনুমান করতে হয় না।

