ধরুন, রাফি। বয়স ২৬। নতুন বছরের শপথ নিয়ে সে জিমে ভর্তি হলো। প্রথম মাসে সকাল-বিকেল দুবেলা ব্যায়াম, রেস্ট ডে বাদ। ভাবল, “যত বেশি কষ্ট, তত বেশি ফল।” কিন্তু তিন মাস পর ফল উল্টো। ঘুম হয় না, সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে, মেজাজ খিটখিটে, আর হাঁটুর ব্যথা যাওয়ার নাম নেই। যে শরীরকে সে গড়তে চেয়েছিল, সেই শরীরই যেন বিদ্রোহ করে বসেছে।
রাফির গল্প আপনার চেনা কারও হতে পারে। হয়তো আপনার নিজেরই।
ব্যায়াম ওষুধ, আর ওষুধের ডোজ থাকে
ব্যায়াম যে দারুণ উপকারী, এ নিয়ে কোনো তর্ক নেই। নিয়মিত শরীরচর্চা হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, বিষণ্নতা ও কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম এবং সপ্তাহে অন্তত দুদিন মাংসপেশির ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, এর চেয়ে বেশি করলে কি আরও ভালো?
গবেষণা কী বলছে
১. শুরুটাই সবচেয়ে মূল্যবান।
২০২৩ সালে British Journal of Sports Medicine-এ প্রকাশিত একটি বড় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সপ্তাহে মাত্র ৭৫ মিনিট মাঝারি ব্যায়ামও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। অর্থাৎ প্রতিদিন ১০-১১ মিনিটের দ্রুত হাঁটাও ফেলনা নয়। কিছুই না করা থেকে একটু করা, এই লাফটাই সবচেয়ে বড়।
২. বেশি করলে উপকার বাড়ে, তবে ধীরে ধীরে।
২০১৫ সালে JAMA Internal Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা জানায়, যাঁরা সুপারিশকৃত মাত্রার তিন-পাঁচ গুণ ব্যায়াম করেন, তাঁদের সুবিধা সবচেয়ে বেশি। এর পর উপকারের বক্ররেখা প্রায় সমতল হয়ে যায়।
৩. অতিরিক্ত পরিশ্রমের মূল্য দিতে হয়।
দীর্ঘদিন অতি-কঠোর সহনশীলতার ব্যায়াম (যেমন বছরের পর বছর ম্যারাথন প্রশিক্ষণ) করা কিছু মানুষের মধ্যে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে। কোপেনহেগেনের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় আবার ইঙ্গিত মিলেছে, হালকা গতির জগাররা সবচেয়ে ভালো ফল পান, আর খুব কঠোর জগারদের ফল অনেক সময় নিষ্ক্রিয়দের কাছাকাছি চলে আসে। তবে এসব ফলাফল নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক আছে, তাই একে চূড়ান্ত রায় ভাবা ঠিক হবে না।
৪. ওভারট্রেনিং সিনড্রোম বাস্তব।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া একটানা চাপ দিলে দেখা দিতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, পারফরম্যান্স কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, মেজাজের ওঠানামা, ঘন ঘন অসুস্থতা ও ইনজুরি। খেলোয়াড়দের মধ্যে খাবার থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি না পেয়ে অতিরিক্ত ব্যায়াম করলে যে অবস্থা তৈরি হয়, তাকে বলে RED-S। এতে হাড়, হরমোন, এমনকি হৃদযন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শরীর উন্নতি করে বিশ্রামের সময়
ব্যায়ামের সময় আসলে আপনি শরীরকে ছোট ছোট আঘাত দেন। পেশি ছেঁড়ে, শক্তি ফুরোয়, চাপ জমে। উন্নতি ঘটে তার পরে, যখন ঘুম, খাবার আর বিশ্রামের মধ্য দিয়ে শরীর নিজেকে আরও শক্ত করে গড়ে নেয়। বিশ্রাম বাদ দিলে আপনি শুধু ভাঙছেন, গড়ছেন না।
তাহলে কীভাবে বুঝবেন “আর নয়”?
এই লক্ষণগুলো দেখলে থামুন:
– বিশ্রামের পরও ক্লান্তি কাটছে না
– ঘুম খারাপ হচ্ছে, অথচ শরীর অবসন্ন
– আগের ওজন বা গতি আর তুলতে পারছেন না
– ব্যায়ামে আনন্দ নেই, শুধু অপরাধবোধ
– ছোটখাটো ব্যথা বারবার ফিরে আসছে
– বুকে ব্যথা, অস্বাভাবিক ধড়ফড় বা মাথা ঘোরা (এগুলো হলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যান)
রাফি শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। সপ্তাহে চারদিন ব্যায়াম, দুদিন হালকা হাঁটা, আর একদিন পুরো বিশ্রাম। ধীরে ধীরে ঘুম ফিরল, ব্যথা কমল, আর সবচেয়ে বড় কথা, ব্যায়ামটা আবার ভালো লাগতে শুরু করল। স্বাস্থ্য কোনো প্রতিযোগিতা নয়। কে বেশি ঘামল, কে বেশি কষ্ট করল, তার হিসাব শরীর রাখে না। শরীর রাখে ধারাবাহিকতার হিসাব।
তাই আজ নিজেকে একটা প্রশ্ন করুন: “আমি কি শরীরকে শাস্তি দিচ্ছি, নাকি যত্ন করছি?” কারণ সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম সেটাই, যেটা আপনি দশ বছর পরেও করতে পারবেন।

