সকাল থেকেই কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ইনবক্স পরিষ্কার করেছেন, ফাইল সাজিয়েছেন, নোটিফিকেশন চেক করেছেন। এমনকি ডেস্কটপের আইকনগুলোও গুছিয়ে রেখেছেন। হ্যাঁ, অনেক কিছুই হয়েছে। কিন্তু যে কাজটা সত্যিই জরুরি ছিল, যেটা আপনার ক্যারিয়ার বা প্রজেক্টে আসলেই পরিবর্তন আনতে পারত—সেই কাজটা শুরুই করা হয়নি।
দিনের শেষে শরীরে ক্লান্তি আছে, কিন্তু মনে অগ্রগতির সেই তৃপ্তি নেই। মনে হয় পুরো দিনটাই যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। এমন কেন হয়? কেন আমরা বারবার ছোট ছোট কাজে নিজেদের আটকে রাখি, আর সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজটা পিছিয়ে দিই?
ছোট কাজ মানসিকভাবে কেন এত আকর্ষণীয়
ছোট কাজের একটা বিশেষ আকর্ষণ আছে। সেগুলো দ্রুত শেষ করা যায়। পাঁচ মিনিটে একটা ইমেইলের উত্তর দিলেন, দশ মিনিটে একটা ফাইল গুছিয়ে ফেললেন—সঙ্গে সঙ্গে “আমি কাজ করেছি” এই অনুভূতি পাওয়া যায়। প্রতিটা ছোট কাজ শেষ করার সাথে সাথে মস্তিষ্ক একটা ডোপামিনের ছোট শট পায়। আর আমাদের মস্তিষ্ক স্বভাবতই সহজ জিনিস পছন্দ করে—যেখানে পরিশ্রম কম, ফলাফল দ্রুত।
এই ছোট ছোট কাজগুলো মনে একধরনের নিরাপত্তা দেয়। এগুলোতে কোনো ঝুঁকি নেই, কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। আপনি জানেন কীভাবে করতে হবে, এবং জানেন যে আপনি পারবেন। এজন্যই এই কাজগুলো এত আরামদায়ক লাগে।
গুরুত্বপূর্ণ কাজ কেন ভয়ের
বিপরীতে, যে কাজগুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো প্রায়ই ভয়ের। বড় কাজ মানেই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা, বিচার হওয়ার ভয়, ব্যর্থতার আশঙ্কা। একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট শুরু করা মানে নিজের সক্ষমতার মুখোমুখি হওয়া। নিজেকে প্রশ্ন করা, “আমি কি সত্যিই এটা পারব?”
এই ভয়টা অনেক গভীর। এটা শুধু কাজ করতে না পারার ভয় নয়, এটা নিজেকে অযোগ্য প্রমাণ হওয়ার ভয়। আর এই ভয় এড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—কাজটা না করা। অথবা “ব্যস্ত” থাকার ভান করা।
ঢিলেমি আসলে অলসতা নয়
অনেকেই মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ কাজ পিছিয়ে দেওয়া মানে অলসতা। কিন্তু সত্যি বলতে, এটা অলসতা নয়—এটা ভয়-চালিত একটা আচরণ।
পারফেকশনিজম এর পেছনে একটা বড় ভূমিকা রাখে। “যতক্ষণ না সবকিছু পারফেক্ট হচ্ছে, ততক্ষণ শুরু করব না”—এই মানসিকতা কাজ শুরু করতেই দেয় না। “এখন ঠিক সময় না,” “আরেকটু প্রস্তুতি নিই,” “কালকে শুরু করব”—এসব অজুহাত আসলে নিজেকে রক্ষা করার অবচেতন চেষ্টা।
আপনি কাজ না করে নিজেকে বলতে পারেন, “আমার সময় ছিল না” বা “পরিস্থিতি ঠিক ছিল না।” কিন্তু যদি কাজ করতেন এবং ব্যর্থ হতেন, তাহলে নিজের সামনেই প্রমাণ হয়ে যেত যে হয়তো আপনি পারেন না। এই ভয় এড়াতেই আমরা কাজ পিছিয়ে দিই।
ব্যস্ত থাকার সংস্কৃতি কীভাবে এই অভ্যাসকে স্বাভাবিক বানিয়েছে
আমাদের সমাজে একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে—ব্যস্ত থাকা মানেই উৎপাদনশীল হওয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই দেখাচ্ছে তারা কত ব্যস্ত, কত কাজ করছে। “সবসময় কাজে থাকা” একটা গৌরবের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু সত্যি হলো, কাজের সংখ্যা আর কাজের প্রভাব এক জিনিস নয়। আপনি দিনে পঞ্চাশটা ছোট কাজ করে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারেন, কিন্তু যদি সেই একটা মাত্র বড় কাজ না করেন যেটা আপনার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তাহলে সেই পঞ্চাশটা কাজ কোনো মূল্য রাখে না।
এই ব্যস্ত থাকার সংস্কৃতি আমাদের একটা মিথ্যা নিরাপত্তা দেয়। আমরা নিজেদের বলতে পারি, “আমি তো সারাদিন কাজ করলাম,” অথচ ভেতরে ভেতরে জানি যে আসল কাজটা করা হয়নি।
যাদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়
মজার ব্যাপার হলো, যারা সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল, তাদের মধ্যেই এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। যারা পারফেকশনিস্ট, যাদের মধ্যে নিজের সম্পর্কে সন্দেহ বেশি, যারা নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেয়—তারাই সবচেয়ে বেশি এই চক্রে আটকে যান।
এটা শোনার পর হয়তো অনেকেই নিজেকে চিনতে পারছেন। হয়তো ভাবছেন, “এটা তো আমার কথাই বলছে।” এবং এতে লজ্জার কিছু নেই। এই সমস্যা অত্যন্ত সাধারণ, বিশেষত যারা সত্যিই কিছু করতে চান, কিছু অর্জন করতে চান—তাদের মধ্যে।
ছোট কাজে আটকে থাকার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি
এই অভ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি মারাত্মক। প্রথমত, আপনার বড় লক্ষ্যগুলো ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে থাকে। যে বই লিখবেন ভেবেছিলেন, যে দক্ষতা শিখবেন চেয়েছিলেন, যে প্রজেক্ট শুরু করবেন স্বপ্ন দেখেছিলেন—সবকিছু শুধু স্বপ্নই থেকে যায়।
দ্বিতীয়ত, আপনার আত্মবিশ্বাস কমতে থাকে। প্রতিবার যখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এড়িয়ে যান, নিজের কাছেই নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। নিজের ওপর বিরক্তি তৈরি হয়। মনে মনে জানেন যে আপনি যা করা উচিত ছিল তা করছেন না, এবং এই অনুভূতি মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর।
তৃতীয়ত, ক্যারিয়ার ও জীবনে স্থবিরতা তৈরি হয়। আপনি একই জায়গায় আটকে থাকেন। অন্যরা এগিয়ে যায়, আর আপনি “ব্যস্ত” থাকা সত্ত্বেও কোথাও পৌঁছাতে পারেন না।
গুরুত্বপূর্ণ কাজ এড়িয়ে যাচ্ছেন—এটা কীভাবে বুঝবেন
কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো দিয়ে বুঝতে পারবেন আপনি এই সমস্যায় ভুগছেন কিনা। প্রথমত, আপনার করণীয় কাজের তালিকা সবসময় লম্বা থাকে। কত কাজই না করতে হবে, কিন্তু কখনো শেষ হয় না।
দ্বিতীয়ত, দিনের শেষে একটা “ব্যস্ত কিন্তু ফাঁকা” অনুভূতি থাকে। মনে হয় পুরো দিন কাজ করলেন, কিন্তু আসলে কিছুই হলো না।
তৃতীয়ত, বড় কাজগুলো বারবার কালকের জন্য রাখা হয়। “আজকে না, কাল করব”—এই কথা নিজেকে বলতে বলতে সপ্তাহ কেটে যায়, মাস কেটে যায়।
চতুর্থত, ছোট কাজ শেষ করেই নিজেকে পুরস্কৃত করার প্রবণতা। একটা সাধারণ কাজ শেষ করে মনে হয় বিরাট কিছু অর্জন করেছেন, অথচ ভেতরে জানেন যে এটা কোনো বড় কাজ ছিল না।
এই চক্র ভাঙার পাঁচটি বাস্তব উপায়
তাহলে এই চক্র থেকে বেরোনোর উপায় কী? এখানে পাঁচটি বাস্তব কৌশল দেওয়া হলো:
এক. কাজের গুরুত্ব নয়, ভয় অনুযায়ী তালিকা চিনুন
আপনার করণীয় কাজের তালিকা দেখুন এবং নিজেকে সৎভাবে জিজ্ঞাসা করুন—কোন কাজটা সবচেয়ে ভয়ের? কোনটা করতে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি লাগছে? সেই কাজটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুই. বড় কাজকে হাস্যকর রকমের ছোট ধাপে ভাঙুন
বড় কাজ ভয়ের কারণ হলো সেটা অনেক বড় মনে হয়। তাই সেটাকে এত ছোট ছোট ধাপে ভাগ করুন যে প্রথম ধাপটা করতে মাত্র দুই মিনিট লাগে। উদাহরণস্বরূপ, “বই লেখা” এর বদলে “একটা ডকুমেন্ট খোলা এবং একটা শিরোনাম লেখা।” এত ছোট যে করতে ভয় লাগে না।
তিন. দিনে একটাই “সবচেয়ে অস্বস্তিকর কাজ” বাছুন
প্রতিদিন সকালে একটা মাত্র কাজ চিহ্নিত করুন—যে কাজটা করতে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি লাগছে। সেই একটা কাজই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাকি সব কাজের আগে এটা করার চেষ্টা করুন।
চার. সময় নয়, শক্তি অনুযায়ী কাজ শুরু করুন
আপনার দিনের কোন সময়ে সবচেয়ে বেশি মানসিক শক্তি থাকে? অনেকের জন্য এটা সকাল, কারও জন্য বিকেল বা রাত। যখনই হোক, সেই সময়টা বড় কাজের জন্য রাখুন। ক্লান্ত সময়ে ছোট কাজগুলো করুন।
পাঁচ. কাজের শুরুটাই লক্ষ্য করুন, শেষ নয়
বড় কাজের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখুন শুধু শুরু করা, শেষ করা নয়। নিজেকে বলুন, “আমি শুধু পাঁচ মিনিট কাজ করব।” একবার শুরু করলে অনেক সময় দেখবেন আপনি এগিয়ে যেতেই থাকছেন। কিন্তু যদি পাঁচ মিনিট পরেও থামতে চান, থামুন। শুরু করাটাই জয়।
ব্যস্ত থাকা আর অগ্রগতি এক জিনিস নয়
শেষ কথা হলো, ব্যস্ত থাকা আর সত্যিকারের অগ্রগতি এক জিনিস নয়। ছোট কাজ মনে শান্তি দেয়, একধরনের নিরাপত্তা দেয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজ—সেই কাজগুলো যা করতে ভয় লাগে, যেগুলো অস্বস্তিকর—সেগুলোই জীবন বদলে দেয়।
আপনি অলস নন। আপনি অক্ষম নন। আপনি শুধু ভয় এড়িয়ে চলছেন। এবং এটা একদম স্বাভাবিক। কিন্তু এখন যেহেতু জানেন কী হচ্ছে, এখন সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
মনে রাখবেন—
“যে কাজটা সবচেয়ে জরুরি,
সেটাই সাধারণত সবচেয়ে ভয়ের।”
আর সেই ভয়ের দিকেই হাঁটতে হয় যদি সত্যিই কিছু পরিবর্তন করতে চান।

