back to top
মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
HomeWellbeingMental Healthশরীর ঠিক আছে, কিন্তু মন আর পারছে না—এটাই কি বার্নআউট?

শরীর ঠিক আছে, কিন্তু মন আর পারছে না—এটাই কি বার্নআউট?

আপনি অসুস্থ নন। ঘুমও মোটামুটি হচ্ছে। খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাক। কিন্তু তবু মনে হচ্ছে—আর পারছি না। সকালে উঠতে ইচ্ছে করে না। কাজ করতে বসলে মাথা ভারী লাগে। যেসব জিনিস আগে ভালো লাগত, এখন সেগুলোও অর্থহীন মনে হয়।

এই অদ্ভুত ক্লান্তির নামটাই কি বার্নআউট? হ্যাঁ, সম্ভবত। এবং না, এটা শুধু আপনার একার সমস্যা নয়।

বার্নআউট মানে কী—সহজ ভাষায়

প্রথমেই বলে নিই, বার্নআউট মানে অলসতা নয়। এটা দুর্বলতাও নয়। এটা “খারাপ সময়” বলে চালিয়ে দেওয়ারও কিছু নয়।

বার্নআউট হলো দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের জমে থাকা ক্লান্তি। এটা তখন হয় যখন আপনি নিজেকে অনেকদিন ধরে ঠেলে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যান, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জ্বালানি ফুরিয়ে আসতে থাকে। একসময় দেখবেন—গাড়ি চলছে, কিন্তু ইঞ্জিন প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে।

কেন শরীর ঠিক থাকলেও মন ভেঙে পড়ে

শরীর বিশ্রাম নেয়, কিন্তু মন নেয় না। কাজ শেষ হয়, কিন্তু চাপ শেষ হয় না। অফিস থেকে বাসায় ফিরেও আপনার মাথায় ঘুরতে থাকে—মিটিং, ডেডলাইন, ইমেইল, দায়িত্ব।

আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে সবসময় “অন” থাকার চাপ আছে। নোটিফিকেশন থামে না। প্রত্যাশা থামে না। আর সবচেয়ে বড় কথা—”সব ঠিক আছি” দেখানোর চাপটাও থামে না।

আপনি হয়তো বাইরে হাসছেন, কাজ করছেন, দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু ভেতরে? ভেতরে হয়তো একটা নীরব চিৎকার চলছে যেটা কেউ শুনতে পাচ্ছে না—এমনকি আপনি নিজেও না।

বার্নআউটের নীরব লক্ষণগুলো—যেগুলো আমরা উপেক্ষা করি

বার্নআউট কোনো সাইরেন বাজিয়ে আসে না। এটা ধীরে ধীরে আসে, এমনভাবে যে আপনি বুঝতেই পারেন না কখন সীমা পেরিয়ে গেছেন। কিছু লক্ষণ যেগুলো আমরা প্রায়ই “স্বাভাবিক” বলে চালিয়ে দিই:

আগে যেসব কাজে আনন্দ পেতেন, সেগুলোতে আর আগ্রহ নেই। ছোট ছোট কাজেও বিরক্তি লাগে। সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। নিজের উপর সন্দেহ জাগে—আমি কি আসলেই যোগ্য? কাজ করতে বসলে মাথা ভারী লাগে, মনোযোগ দেওয়া যায় না।

আমরা এগুলোকে “নরমাল স্ট্রেস” বলে ফেলে রাখি। কিন্তু আসলে এগুলো মনের একটা বার্তা—যে সে আর পারছে না।

কাজের চাপ নয়—চাপের ধরনটাই সমস্যা

মনে রাখবেন, কাজ বেশি মানেই বার্নআউট নয়। অনেকে অনেক কাজ করেও সুস্থ থাকেন, কারণ তাদের কাজে অর্থ আছে, নিয়ন্ত্রণ আছে, স্বীকৃতি আছে।

বার্নআউট হয় তখন, যখন:

  • আপনার কাজ মনে হয় অর্থহীন
  • আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই সিদ্ধান্তের উপর
  • আপনার প্রচেষ্টার কোনো স্বীকৃতি নেই

এই তিনটা জিনিস একসাথে থাকলে, সেটা ডেঞ্জার জোন।

“ব্যস্ত” আর “বার্নআউট”—দুটো আলাদা জিনিস। ব্যস্ত থাকলে আপনি ক্লান্ত হবেন, কিন্তু তৃপ্তি পাবেন। বার্নআউটে আপনি শূন্য বোধ করবেন।

কারা বেশি বার্নআউটে পড়েন?

কিছু মানুষ বার্নআউটের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। দেখুন তো নিজেকে চিনতে পারছেন কিনা:

যারা বেশি দায়িত্ব নেন, সবসময় সবাইকে খুশি রাখতে চান, নিজের কাছে নিখুঁত হওয়ার প্রত্যাশা রাখেন, “না” বলতে পারেন না, নিজের অনুভূতি চেপে রাখেন।

এই মানুষগুলো দুর্বল নন—বরং তারা এতটাই শক্তিশালী যে নিজেদের ভেঙে পড়ার কথা স্বীকারই করেন না। কিন্তু মন একসময় হার মানে।

এটা কি ডিপ্রেশন? নাকি শুধুই ক্লান্তি?

অনেকেই প্রশ্ন করেন—বার্নআউট আর ডিপ্রেশন কি একই জিনিস?

না। তবে দুটোর মধ্যে ওভারল্যাপ থাকতে পারে। বার্নআউট সাধারণত কাজ বা দায়িত্বের সাথে সম্পর্কিত। সেখান থেকে সরে গেলে, বিশ্রাম নিলে হয়তো আপনি ভালো বোধ করবেন।

কিন্তু ডিপ্রেশনে পরিস্থিতি বদলালেও মন খারাপ থাকে। সবকিছু ধূসর লাগে। আশা-আনন্দ হারিয়ে যায়।

কখন নিজে সামলানো সম্ভব? যখন আপনি বুঝতে পারছেন কী সমস্যা, এবং ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে পারছেন।

কখন পেশাদার সাহায্য দরকার? যখন আপনি নিজেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন মনে হয়, আত্মহত্যার চিন্তা আসে, বা দৈনন্দিন কাজই করতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে একজন মনোবিদ বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।

বার্নআউট থেকে বেরোতে প্রথম যে ভুলটা আমরা করি

আমরা ভাবি—”আর একটু সহ্য করলেই ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু বাস্তবে, সমস্যা উপেক্ষা করলে শরীর-মন সিগন্যাল আরও বাড়িয়ে দেয়। মাথাব্যথা, পেটের সমস্যা, ঘুমের সমস্যা, রাগ, উদ্বেগ—সব বাড়তে থাকে।

আর শুধু বিশ্রামও যথেষ্ট নয়। কারণ বার্নআউট শুধু ক্লান্তি নয়—এটা গভীর মানসিক, আবেগজনিত এবং কখনো কখনো অস্তিত্বগত সংকট।

তাহলে কী করা যায়?

সব একসাথে বদলানোর দরকার নেই। শুধু শুরু করুন:

কাজের বাইরে নিজের পরিচয় খুঁজে পান। আপনি শুধু একজন কর্মী বা একজন দায়িত্বশীল মানুষ নন। আপনি আরও অনেক কিছু। সেই “আরও” অংশটা খুঁজুন।

ডিজিটাল বাউন্ডারি তৈরি করুন। রাত ৯টার পর কাজের মেসেজ বন্ধ। সপ্তাহান্তে ইমেইল চেক না করা। এগুলো ছোট মনে হলেও, মনকে শ্বাস নিতে দেয়।

সপ্তাহে অন্তত একদিন স্লো লিভিং। একদিন যেখানে তাড়াহুড়ো নেই। শুধু থাকা, অনুভব করা, নিজের সাথে সময় কাটানো।

কথা বলুন। নিজের সাথে বা বিশ্বস্ত কারো সাথে। “আমি ঠিক আছি” না বলে “আমি ক্লান্ত” বলার সৎসাহস দেখান।

নিজের কাছে তিনটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

আজ একটু সময় নিয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন:

১. আমি শেষ কবে সত্যিকারের বিশ্রাম নিয়েছি—যেখানে মাথায় কোনো চাপ ছিল না?

২. আমি কি সবসময় শক্ত থাকার অভিনয় করছি, যেখানে ভেঙে পড়ার অধিকার নেই?

৩. আমি যদি আজ থামি—সবকিছু কি সত্যিই ভেঙে পড়বে? নাকি এটা শুধু আমার ভয়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে হয়তো আপনি নিজেকে একটু চিনতে পারবেন।

বার্নআউট মানে আপনি দুর্বল নন। এর মানে হলো আপনি অনেকদিন ধরে শক্ত ছিলেন। এখন মন আপনাকে একটু থামতে বলছে। আমরা শরীর ভাঙলে বিশ্রাম দিই, ওষুধ খাই, যত্ন নিই। কিন্তু মন ভাঙলে? মন ভাঙলেও বিশ্রাম দরকার—শুধু আমরা সেটা স্বীকার করি না।

আজ স্বীকার করুন। এবং নিজেকে একটু সময় দিন। কারণ আপনি যতটা ভাবছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular