“আমার তো কিছু হয়নি, পরীক্ষা করাব কেন?” এই কথাটা আমরা কতবার বলি, কতবার শুনি। শরীর ভালো লাগছে, কোথাও ব্যথা নেই, জ্বর নেই—তাহলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কী দরকার? এই আত্মবিশ্বাসটাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
সত্যি বলতে, বেশিরভাগ মারাত্মক রোগ শুরু হয় একেবারে নীরবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, হৃদরোগ—এসব রোগ বছরের পর বছর কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। আর যখন উপসর্গ দেখা দেয়, ততক্ষণে অনেক সময় অনেক দেরি হয়ে গেছে। চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়, খরচ বাড়ে, আর কিছু ক্ষতি আর ফেরানো যায় না।
সুস্থ থাকা মানেই ঝুঁকিমুক্ত থাকা নয়
আপনি হয়তো প্রতিদিন অফিসে যাচ্ছেন, বাসায় সব কাজ সামলাচ্ছেন, কোনো সমস্যা অনুভব করছেন না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ভেতরে সবকিছু ঠিক আছে।
উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় “নীরব ঘাতক”। কারণ এটা বছরের পর বছর কোনো লক্ষণ দেয় না। কিন্তু নীরবে ক্ষতি করতে থাকে হৃদযন্ত্র, কিডনি, চোখ—সবকিছুর। ডায়াবেটিসও তেমনি। শরীর ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়, মানিয়ে নেয়। কিন্তু ভেতরে চলে ক্ষয়।
কোলেস্টেরল বাড়ছে, রক্তনালীতে জমছে চর্বি—কিন্তু আপনি টের পাবেন না। যতদিন না হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়। তাই মনে রাখবেন, সুস্থ অনুভব করা আর ভেতরে সুস্থ থাকা—এই দুটো এক জিনিস নয়।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার আসল উদ্দেশ্য
অনেকেই মনে করেন, পরীক্ষা মানে রোগ খোঁজা। কিন্তু আসলে পরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকি চিহ্নিত করা। রোগ হওয়ার আগেই বুঝে নেওয়া—কোথায় সমস্যা হতে পারে। আর এই আগাম সতর্কতাই জীবন বদলে দিতে পারে।
একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, নিয়মিত পরীক্ষায় জানা গেল আপনার রক্তে সুগার একটু বেশি—প্রি-ডায়াবেটিস পর্যায়ে। এখনই যদি খাদ্যাভ্যাস বদলান, একটু হাঁটাহাঁটি শুরু করেন, ওজন কমান—তাহলে হয়তো ডায়াবেটিস হবেই না। কিন্তু যদি অপেক্ষা করেন লক্ষণ দেখা দেওয়া পর্যন্ত, তখন সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
Early detection মানে সহজ চিকিৎসা। খরচ কম, ভয় কম, জটিলতা কম।
কোন বয়সে কেন পরীক্ষা জরুরি
২০–৩০ বছর: বেসলাইন জানা
এই বয়সে হয়তো মনে হয় পরীক্ষার কোনো দরকার নেই। কিন্তু এই সময়টা গুরুত্বপূর্ণ নিজের শরীরের “স্বাভাবিক অবস্থা” জানার জন্য। আপনার রক্তচাপ, সুগার, কোলেস্টেরলের মাত্রা কেমন থাকে সুস্থ অবস্থায়—এটা জানা থাকলে পরে তুলনা করা সহজ হয়। আর এই বয়সেই অনেক সময় পারিবারিক রোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
৩০–৪০ বছর: লাইফস্টাইল–জনিত ঝুঁকি
এই বয়সে জীবনযাত্রার চাপ বাড়ে। চাকরির চাপ, পরিবারের দায়িত্ব, অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া, ঘুমের অভাব, স্ট্রেস—এসব শরীরে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এই সময়েই হাই প্রেশার, ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যা মাথা চাড়া দেয়। তাই বছরে অন্তত একবার পরীক্ষা জরুরি।
৪০+ বছর: নিয়মিত মনিটরিং
চল্লিশের পর শরীরের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা কমতে থাকে। হরমোনের পরিবর্তন হয়। হৃদরোগ, ক্যান্সার, অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। এই বয়সে পরীক্ষা শুধু প্রয়োজন নয়, অপরিহার্য। প্রতি ছয় মাস বা বছরে একবার চেকআপ করা উচিত।
যেসব পরীক্ষা সুস্থ থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ
নিয়মিত কিছু সাধারণ পরীক্ষা করালে শরীরের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়:
রক্তচাপ পরীক্ষা: উচ্চ রক্তচাপ কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। নিয়মিত মাপলে তা ধরা পড়ে। এটা খুবই সহজ এবং কোনো খরচ ছাড়াই অনেক জায়গায় করা যায়।
রক্তে সুগার পরীক্ষা: বিশেষত যাদের পরিবারে ডায়াবেটিস আছে, বা যারা মোটা, তাদের জন্য এটা জরুরি। ফাস্টিং সুগার বা HbA1c টেস্ট করা যায়।
কোলেস্টেরল প্রোফাইল: রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) বেড়ে গেলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। সময়মতো জানা থাকলে খাবার ও ব্যায়ামের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
লিভার ও কিডনি ফাংশন টেস্ট: এই দুটো অঙ্গ শরীরের ফিল্টার। সমস্যা হলে বুঝতে দেরি হয়। নিয়মিত পরীক্ষায় আগাম ধরা পড়ে।
বডি মাস ইনডেক্স (BMI) ও কোমরের মাপ: ওজন ও পেটের চর্বি অনেক রোগের সূচক। এটা নিজেই মাপা যায়, কিন্তু গুরুত্ব কম দেওয়া হয়।
মনে রাখবেন, এগুলো বিস্তারিত চিকিৎসা নির্দেশনা নয়—শুধু সচেতনতার জন্য। কোন পরীক্ষা করাবেন, তা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঠিক করবেন।
কেন আমরা পরীক্ষা এড়িয়ে চলি
সত্যি কথা বলতে, পরীক্ষা না করানোর পেছনে মূল কারণ মনের ভয়।
ভয়: “যদি কিছু বের হয়ে যায়?” এই ভয়ে অনেকে পরীক্ষাই করান না। কিন্তু না জানলে সমস্যা চলে যাবে না, বরং বাড়বে। জানা মানে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পাওয়া।
সময়ের অজুহাত: “এত ব্যস্ত, সময় কোথায়?” কিন্তু একবার অসুস্থ হলে যে সময় নষ্ট হয়, তার তুলনায় বছরে একদিন সময় দেওয়া কিছুই না।
খরচের ধারণা: অনেকে মনে করেন পরীক্ষা খুব দামি। কিন্তু সাধারণ পরীক্ষাগুলো আসলে খুব ব্যয়বহুল নয়। আর চিকিৎসার খরচের তুলনায় এটা কিছুই না।
“আমার তো কিছু হয়নি” মানসিকতা: এটাই সবচেয়ে বড় বাধা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক রোগ হয় নীরবে। লক্ষণের অপেক্ষা করা মানে বিপদকে আমন্ত্রণ জানানো।
নিয়মিত পরীক্ষা কীভাবে মানসিক শান্তি দেয়
পরীক্ষার রিপোর্ট ভালো এলে যে স্বস্তি আসে, সেটা অমূল্য। আপনি জানেন, আপনার শরীর ঠিক আছে। এই নিশ্চয়তা জীবনযাপনে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
অনিশ্চয়তা মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। “আমার তো হয়তো কিছু আছে, কিন্তু জানি না”—এই ভাবনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় পরীক্ষার মাধ্যমে।
আর যখন নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন থাকবেন, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়। কী খাবেন, কতটা ব্যায়াম করবেন, কতটা ঘুমাতে হবে—এসব ঠিক করতে পারবেন রিপোর্টের ভিত্তিতে। অনুমানের ওপর নয়, তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জীবন সাজাতে পারবেন।
পরীক্ষার রিপোর্ট মানে আতঙ্ক নয়
অনেকে রিপোর্ট দেখে ভয় পেয়ে যান। কিন্তু মনে রাখবেন, রিপোর্ট মানে আতঙ্ক নয়—নিয়ন্ত্রণের সুযোগ। হয়তো দেখা গেল কোলেস্টেরল একটু বেশি। এর মানে এই নয় যে আপনি অসুস্থ। এর মানে হলো, এখনই সময় পদক্ষেপ নেওয়ার। তেল-মসলা কমান, হাঁটা বাড়ান—হয়তো কয়েক মাসেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কোনো ওষুধও লাগবে না।
সব সমস্যাই রোগ নয়। অনেক সময় শুধু সতর্ক সংকেত। আর ছোট ছোট পরিবর্তনেই বড় ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। তাছাড়া, একা একা রিপোর্ট নিয়ে চিন্তা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। তিনিই বলে দেবেন কী করণীয়। জানা সবসময় না জানার চেয়ে ভালো।
বছরে একদিন—জীবনের জন্য বিনিয়োগ
একটু ভেবে দেখুন। বছরে ৩৬৫ দিন। এর মধ্যে মাত্র একদিন নিজের স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ করা কি খুব বেশি চাওয়া? আমরা গাড়ির সার্ভিসিং করি। ফোনের আপডেট দিই। বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করি। কিন্তু যে শরীর নিয়ে সব করছি, তার খোঁজ নিই না। এটা কি ঠিক?
নিয়মিত পরীক্ষা মানে ভবিষ্যতের নিজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা। আজকের একটু সময় ও সচেতনতা আগামীর অনেক কষ্ট বাঁচাতে পারে। মনে রাখবেন, পরিবার, কাজ, স্বপ্ন—সবকিছুর ভিত্তি হলো সুস্থতা। সুস্থ না থাকলে কিছুই উপভোগ করতে পারবেন না। তাই নিজেকে সময় দিন, গুরুত্ব দিন।
অসুখের অপেক্ষা করবেন না
শেষ কথা হলো, অসুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার কোনো মানে নেই। সুস্থ থাকাটাই সবচেয়ে ভালো সময় পরীক্ষা করানোর। তখনই শরীরকে চিনতে পারবেন, বুঝতে পারবেন। আর প্রয়োজনে পদক্ষেপ নিতে পারবেন সহজভাবে।
শরীর আমাদের সঙ্গে কথা বলে। ছোট ছোট সংকেত দেয়। কিন্তু আমরা শুনতে শিখিনি। পরীক্ষা সেই শোনার একটা মাধ্যম। শরীর আগেই জানাতে পারে কোথায় সমস্যা হতে পারে—শুনতে শিখুন।
“পরীক্ষা অসুস্থতার জন্য নয়, পরীক্ষা সুস্থতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য।”
তাই আর দেরি নয়। আজই ঠিক করুন, এই বছর আপনার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাবেন। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য—এই একটা পদক্ষেপ নিন। কারণ সুস্থ থাকা শুধু একটা অবস্থা নয়, এটা একটা সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

