back to top
সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬
HomeProductivityCareer Developmentক্যারিয়ারে "ভালো কর্মী" হয়েও কেন অনেকে এগোতে পারে না

ক্যারিয়ারে “ভালো কর্মী” হয়েও কেন অনেকে এগোতে পারে না

আপনি প্রতিদিন সময়মতো অফিসে আসেন। কাজ শেষ করেন নির্ধারিত সময়ের আগেই। বসের কোনো অভিযোগ নেই। সহকর্মীরা আপনাকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন। অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করেন নিঃশব্দে। তবু প্রতিবার প্রমোশনের সময় দেখেন, সুযোগটা চলে যাচ্ছে অন্য কারো হাতে। হয়তো সেই ব্যক্তি আপনার চেয়ে কম পরিশ্রম করেন, কম দায়িত্ব নেন। কিন্তু কেন তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন?

এই প্রশ্নটা মনের ভেতরে জমতে থাকে—”আমার ঘাটতি কোথায়? আমি কি যথেষ্ট ভালো নই?”

‘ভালো কর্মী’ মানে কী—এবং কী নয়

আমরা অনেকেই মনে করি, ভালো কর্মী মানেই সফল ক্যারিয়ার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কাজ ঠিকমতো করা আর ক্যারিয়ারে এগোনো—এই দুটো এক জিনিস নয়। আপনি হয়তো প্রতিটি নির্দেশনা মেনে চলেন নিখুঁতভাবে, কিন্তু নির্দেশনা মানা মানে নেতৃত্ব নয়। আপনি হয়তো দিনরাত পরিশ্রম করেন, কিন্তু পরিশ্রম মানেই দৃশ্যমান প্রভাব নয়।

ভালো কর্মী হওয়া একটা ভিত্তি, একটা শুরু। কিন্তু শুধুমাত্র ভালো হওয়াটাই ক্যারিয়ারের পরবর্তী ধাপে নিয়ে যায় না। প্রয়োজন হয় আরও কিছু—যা অনেকেই বুঝতে পারেন না।

কাজ বনাম প্রভাব: যে ব্যবধানটা দেখা যায় না

অনেকে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন, অসংখ্য কাজ শেষ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই কাজগুলো কি সঠিক কাজ? নাকি শুধুই কাজের জন্য কাজ? আপনার কাজের তালিকা হয়তো লম্বা, কিন্তু সেই কাজগুলো কি কোম্পানির আসল লক্ষ্যের সাথে সংযুক্ত? আপনি হয়তো প্রতিদিন একশোটা ইমেইলের জবাব দিচ্ছেন, বিশটা মিটিংয়ে যোগ দিচ্ছেন, কিন্তু এর শেষে কী ফলাফল আসছে?

ক্যারিয়ারে এগিয়ে যারা, তারা শুধু কাজ করেন না—তারা প্রভাব তৈরি করেন। তারা জানেন কোন কাজটা করলে কোম্পানির লাভ বাড়বে, খরচ কমবে, গ্রাহক সন্তুষ্ট হবেন। আর তারা সেই কাজগুলোতেই মনোযোগ দেন। ফলাফল না দেখালে, শুধু কাজ করলেই কেউ খেয়াল করে না। আপনার পরিশ্রম হারিয়ে যায় অন্ধকারে।

দৃশ্যমানতার সমস্যা: কাজ আছে, পরিচিতি নেই

বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে আমরা শিখেছি—”নিজের বাহাদুরি নিজে বলা ভালো নয়।” কাজ করে যাও চুপচাপ, লোকে ঠিকই বুঝবে। কিন্তু বাস্তবে? কেউ বোঝে না।

আপনি হয়তো রাত জেগে একটা প্রজেক্ট শেষ করেছেন, কিন্তু বসের কাছে সেটা পৌঁছেছে অন্য কারো নাম দিয়ে। আপনি হয়তো একটা বড় সমস্যার সমাধান করেছেন, কিন্তু মিটিংয়ে সেটা উল্লেখই করেননি। আপনি হয়তো টিমকে সাহায্য করেছেন অসংখ্যবার, কিন্তু কেউ জানে না। এই নিরবতা আপনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শত্রু।

অন্যরা যারা এগোচ্ছেন, তারা হয়তো আপনার চেয়ে কম কাজ করছেন, কিন্তু তাদের কাজটা সবাই দেখছে। তারা মিটিংয়ে নিজের অবদান তুলে ধরেন, বসের সাথে নিয়মিত আপডেট শেয়ার করেন, ইমেইলে সঠিক মানুষদের রাখেন। নিজের কাজের কথা না বললে, অন্য কেউ আপনার হয়ে বলবে না।

দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা না থাকলে বৃদ্ধি থেমে যায়

দায়িত্ব পালন আর দায়িত্ব নেওয়া—এই দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনাকে যে কাজ দেওয়া হয়েছে, সেটা করছেন ঠিকমতো। এটা দায়িত্ব পালন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়া মানে হলো, কাউকে না বললেও নিজে থেকে সমস্যা খুঁজে বের করা এবং সমাধান করা।

অনেক ভালো কর্মী সমস্যা দেখেন, কিন্তু চুপ থাকেন। ভাবেন, “এটা আমার কাজ না।” বা “বলে লাভ নেই, কেউ শুনবে না।” এই মনোভাব ক্যারিয়ারকে আটকে রাখে। যারা এগিয়ে যান, তারা সিদ্ধান্তে অংশ নেন। তারা প্রশ্ন করেন, মতামত দেন, নতুন আইডিয়া নিয়ে আসেন। তারা নিজেদের কাজের গণ্ডি পেরিয়ে ভাবেন—পুরো টিম, পুরো কোম্পানি কীভাবে ভালো করবে।

দায়িত্ব নেওয়ার এই মানসিকতাই আলাদা করে দেয় একজন সাধারণ কর্মী আর একজন ভবিষ্যত নেতার মধ্যে।

যেসব দক্ষতা উপেক্ষিত থাকে

আমরা মনে করি, কাজ ভালো করলেই হলো। কিন্তু বাস্তবে ক্যারিয়ারে এগোতে আরও অনেক কিছু লাগে।

যোগাযোগ দক্ষতা: আপনার আইডিয়া যত ভালোই হোক, সেটা যদি সঠিকভাবে বলতে না পারেন, তাহলে কাজে আসবে না। স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত এবং কার্যকর যোগাযোগ শিখতে হয়।

আলোচনার ক্ষমতা: বেতন বাড়ানো, নতুন প্রজেক্ট পাওয়া, টিমের সাথে সমন্বয়—সবকিছুতে দরকষাকষির দক্ষতা লাগে। যারা দাবি করতে জানেন না, তারা পিছিয়ে থাকেন।

স্টেকহোল্ডার ম্যানেজমেন্ট: বস, সহকর্মী, অন্য বিভাগের মানুষ—সবার সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। কাজ শুধু একা করে হয় না, সবাইকে সাথে নিয়ে এগোতে হয়।

সীমারেখা তৈরি: না বলা শেখা জরুরি। সবসময় সবার কাজ করতে গেলে নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ পড়ে যায়।

নিজের পক্ষে কথা বলা: নিজের অধিকার, নিজের কৃতিত্ব, নিজের প্রয়োজন—এগুলো সম্পর্কে খোলাখুলি কথা বলতে হয়।

এই দক্ষতাগুলো না থাকলে, শুধু কাজের দক্ষতা দিয়ে ক্যারিয়ার গড়া কঠিন।

কেন ভালো কর্মীরা ঝুঁকি নিতে ভয় পান

ভালো কর্মীদের একটা বড় সমস্যা—তারা নিরাপদ থাকতে পছন্দ করেন। নতুন কিছু করতে গেলে ঝুঁকি থাকে। ভুল হতে পারে। আর ভুল হলে সুনাম নষ্ট হতে পারে—এই ভয়ে অনেকে কখনো নতুন কিছু চেষ্টাই করেন না।

যেই কাজগুলো জানেন, সেগুলোই করতে থাকেন। নতুন দায়িত্ব এড়িয়ে যান। বড় প্রজেক্টে হাত দিতে সাহস পান না। কিন্তু এই নিরাপদ থাকার চেষ্টাই হয়ে ওঠে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ বৃদ্ধি ঘটে ঝুঁকির মধ্য দিয়েই।

যারা এগিয়ে যান, তারা ভুল করেন, শেখেন, আবার চেষ্টা করেন। তারা জানেন, ব্যর্থতা মানে শেষ নয়, শুরু। আরামের জায়গায় থাকলে, সেটাই হয়ে ওঠে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সীমা।

বসের দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবতা

প্রমোশন দেওয়ার সময় বস কী দেখেন? শুধু কাজ ভালো করা নয়। বস দেখেন, এই ব্যক্তি কি পরবর্তী পর্যায়ের দায়িত্ব সামলাতে পারবেন? কি আরও বেশি চাপ নিতে পারবেন? কি টিমকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন?

শুধু নির্ভরযোগ্য হওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নেতৃত্বের সংকেত। যেমন: আপনি কি নিজে থেকে উদ্যোগ নেন? কি সমস্যা সমাধান করেন না শুধু রিপোর্ট করেন? কি অন্যদের প্রভাবিত করতে পারেন? কি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

বস মূলত খোঁজেন, কে ভবিষ্যতে তার জায়গায় দাঁড়াতে পারবে। যদি আপনি শুধু একজন ভালো কর্মীর ভূমিকায় থাকেন, নেতার ভূমিকা না নেন, তাহলে প্রমোশন পাওয়া কঠিন।

ভালো কর্মী থেকে পেশাদার হতে কী লাগবে

এখন প্রশ্ন হলো, কী করবেন?

নিজের কাজের ফলাফল মাপুন: শুধু বলবেন না “আমি কাজ করেছি।” বলুন, “আমার কাজে বিক্রয় দশ শতাংশ বেড়েছে” বা “আমার পরিকল্পনায় খরচ কমেছে পাঁচ লাখ টাকা।” সংখ্যা দিয়ে ফলাফল দেখান।

নিয়মিত মতামত চান: বসকে জিজ্ঞেস করুন, “আমার কাজে কী উন্নতি করা যায়?” সহকর্মীদের কাছে জানতে চান, “আমি কীভাবে আরও ভালো সহযোগিতা করতে পারি?” প্রতিক্রিয়া নিয়ে নিজেকে উন্নত করুন।

সমস্যা নয়, সমাধান নিয়ে আসুন: শুধু বলবেন না “এই কাজ হচ্ছে না।” বলুন, “এই কাজে সমস্যা হচ্ছে, আমি এভাবে সমাধান করতে পারি।” যে সমাধান দেয়, তাকে মূল্য দেওয়া হয়।

নিজের গল্প নিজেই বলুন: লজ্জা ভেঙে ফেলুন। আপনার কৃতিত্ব সবাইকে জানান। মিটিংয়ে বলুন, ইমেইলে লিখুন, বসের সাথে শেয়ার করুন। নিজের কাজের দৃশ্যমানতা বাড়ান।

নেতৃত্বের মতো ভাবুন: শুধু নিজের কাজ নিয়ে ভাববেন না। পুরো টিম, পুরো কোম্পানির কথা ভাবুন। বড় চিত্র দেখুন, বড় সিদ্ধান্তে অংশ নিন।

ঝুঁকি নিন: নতুন প্রজেক্ট, নতুন দায়িত্ব, নতুন আইডিয়া—এগুলোতে হাত দিন। ভুল হবে, শিখবেন, এগিয়ে যাবেন।

ভালো হওয়া শুরু, যথেষ্ট নয়

ভালো কর্মী হওয়া একটা শক্ত ভিত্তি। কিন্তু ক্যারিয়ার এগোয় কৌশল দিয়ে, পরিকল্পনা দিয়ে, নিজেকে দৃশ্যমান করার মাধ্যমে। আপনি যদি মনে করেন শুধু ভালো কাজ করলেই হবে, বাকিটা এমনিতেই হবে—তাহলে আপনি হতাশ হবেন। কারণ যারা শুধু ভালো কাজ করেন, তারা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন। আর যারা সঠিক কাজ করেন এবং সেটা দৃশ্যমান করেন, তারা এগিয়ে যান।

আপনার জায়গা নিজেকেই তৈরি করতে হবে। কেউ এসে হাত ধরে তুলে দেবে না। নিজের অধিকার নিজেকেই আদায় করতে হবে।

মনে রাখবেন— ক্যারিয়ারে এগোয় তারা না যারা শুধু ভালো কাজ করে, বরং যারা সঠিক কাজটাকে দৃশ্যমান করে।

আজ থেকেই শুরু করুন। নিজের কাজের হিসাব রাখুন। নিজের সাফল্য তুলে ধরুন। নতুন দায়িত্ব নিন। ঝুঁকি নিতে শিখুন। কারণ ভালো হওয়া শুধু শুরু—এগিয়ে যাওয়ার জন্য আরও অনেক কিছু করতে হয়।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular