২০২৪ সালের অক্টোবরে রতন টাটা মারা গেলে মুম্বাইয়ের রাস্তায় নেমেছিল হাজার হাজার মানুষ। তাঁদের বেশিরভাগই টাটা গ্রুপের শেয়ারহোল্ডার ছিলেন না। অনেকে তাঁকে কখনো সামনে থেকে দেখেনওনি। তবু কাঁদছিলেন, যেন নিজের পরিবারের কেউ চলে গেছেন।
একজন ব্যবসায়ীর জন্য এই ভালোবাসা কীভাবে তৈরি হয়? উদ্যোক্তাদের জন্য এই প্রশ্নের উত্তরেই আছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
১. বড় স্বপ্ন দেখুন, কিন্তু মানুষকে ভুলবেন না
১৯৯১ সালে রতন টাটা যখন গ্রুপের দায়িত্ব নেন, তখন অনেকে ভাবতেন টাটা একটি পুরোনো, ধীরগতির প্রতিষ্ঠান। দুই দশকের বেশি নেতৃত্বে তিনি গ্রুপটিকে বৈশ্বিক রূপ দিলেন। টেটলি টি, কোরাস স্টিল আর জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কেনা হলো। গ্রুপের রাজস্ব কয়েকগুণ বেড়ে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেল।
কিন্তু তাঁর গল্প শুধু সম্প্রসারণের নয়। টাটা সন্সের বড় অংশের মালিকানা টাটা ট্রাস্টের হাতে, তাই গ্রুপের মুনাফার একটা বড় অংশ যায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর গবেষণায়। প্রবৃদ্ধি আর মূল্যবোধ যে একসঙ্গে চলতে পারে, তিনি তা দেখিয়েছেন।
২. অপমানকে জ্বালানি বানান
গল্পটি বহুল প্রচলিত। ১৯৯৯ সালে টাটা মোটরসের যাত্রীবাহী গাড়ির ব্যবসা তেমন চলছিল না। বলা হয়, প্রস্তাব নিয়ে ফোর্ডের কাছে গেলে তাঁকে এমন আচরণ সহ্য করতে হয়েছিল, যেন ফোর্ড কিনে তাঁদের উপকার করছে। তিনি রাগ করে বসে থাকেননি। ২০০৮ সালে সেই ফোর্ডের কাছ থেকেই কিনে নিলেন জাগুয়ার ও ল্যান্ড রোভার।
৩. ব্যর্থতা স্বীকার করাও নেতৃত্ব
টাটা নানো ছিল তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প, মধ্যবিত্তের হাতে এক লাখ রুপির গাড়ি। কিন্তু গাড়িটা বাজারে “সবচেয়ে সস্তা গাড়ি” তকমা পেয়ে গেল, আর মানুষ সস্তা গাড়ি চালাতে চায় না, চায় আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। নানো ব্যর্থ হলো। তিনি দায় এড়াননি, নিজের ভুল প্রকাশ্যেই মেনে নিয়েছেন।
এখান থেকে বোঝা যায়, পণ্যের দাম যতটা গুরুত্বপূর্ণ, মানুষ সেটাকে কীভাবে দেখে তা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
৪. সংকটে কর্মীর পাশে দাঁড়ান
২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে তাজমহল প্যালেসে সন্ত্রাসী হামলার পর টাটা গ্রুপ শুধু হোটেল পুনর্নির্মাণেই থেমে থাকেনি। নিহত ও আহত কর্মীদের পরিবারের দায়িত্বও নিয়েছিল, এমনকি আশপাশের সাধারণ মানুষের পাশেও দাঁড়িয়েছিল। এই ঘটনাই বলে দেয়, কর্মীরা কেন তাঁকে শুধু বস নয়, অভিভাবক ভাবতেন।
৫. তরুণদের ওপর বিশ্বাস রাখুন
জীবনের শেষ দিকে বয়স্ক এই শিল্পপতি নিজের অর্থ ও সময় ঢেলেছেন তরুণ স্টার্টআপগুলোতে। সফল হোক বা না হোক, নতুন প্রজন্মের ঝুঁকি নেওয়ার সাহসকে তিনি সম্মান করতেন।
রতন টাটার সম্পদ ছিল বিশাল, কিন্তু মুম্বাইয়ের মানুষ তাঁর জন্য কেঁদেছিল সেই কারণে নয়। কেঁদেছিল কারণ তিনি দেখিয়েছিলেন, ব্যবসা শুধু লাভ-ক্ষতির খাতা নয়। ব্যবসা মানুষের আস্থা অর্জনের একটা মাধ্যম।
আপনি যখন নিজের উদ্যোগ শুরু করবেন, একদিন এই প্রশ্নটা নিজেকে করবেন: আমি কত টাকা আয় করেছি, শুধু সেটাই কি আমার পরিচয় হবে? নাকি এমন কিছু রেখে যাব, যা আমার অনুপস্থিতিতেও মানুষ মনে রাখবে?

