আপনি কি কখনো ভেবেছেন—কেন একটা সাধারণ মেসেজের রিপ্লাই না পেলে আপনার মাথায় ৫০টা নেগেটিভ চিন্তা ঘুরপাক খায়? কেন আপনি সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবেন? কেন মনে হয় সবাই আপনাকে judge করছে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে আপনার শৈশবে। হ্যাঁ, সেই ছোট্ট বয়সের কিছু ঘটনা, যা আপনি হয়তো ভুলেই গেছেন—কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক ভোলেনি।
শৈশবের আঘাত: যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সারা জীবন থেকে যায়
আমরা যখন “childhood trauma” শুনি, তখন মনে করি এর মানে হয়তো কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনা। কিন্তু না। Trauma মানে শুধু বড় দুর্ঘটনা নয়।
এটা হতে পারে:
- বাবা-মায়ের ঘন ঘন ঝগড়া
- “তুমি কিছুই পারো না” ধরনের কথা শোনা
- ভালোবাসা পেতে “ভালো রেজাল্ট” বা “ভালো আচরণ” করতে হতো
- পরিবারে নিরাপত্তাহীনতা
- মানসিক বা শারীরিক শাস্তি
- অবহেলা বা emotional distance
এই সব কিছুই একটা শিশুর মস্তিষ্কে “বিপদ” হিসেবে সংরক্ষিত হয়। আর সেই বিপদের স্মৃতি থেকেই জন্ম নেয় পরবর্তী জীবনের overthinking.
মস্তিষ্ক কীভাবে ভয়কে মনে রাখে?
আমাদের মস্তিষ্কের একটি অংশ আছে যার নাম Amygdala—এটা আমাদের “alarm system”. যখন কোনো শিশু ভয়, অবহেলা বা অনিরাপত্তার মধ্যে বড় হয়, তখন এই alarm system সবসময় চালু থাকে।
আরেকটি অংশ Hippocampus, যা স্মৃতি ধরে রাখে। ফলে, শৈশবের সেই ভয়ের অনুভূতি বারবার মনে পড়তে থাকে—সচেতনভাবে না হলেও, অবচেতনে।
বড় হতে হতে এটাই আপনার “default thinking pattern” হয়ে যায়। মানে, আপনি স্বাভাবিকভাবেই সবসময় worst-case scenario চিন্তা করেন। এটাই overthinking.
শৈশবের ক্ষত বড় হয়ে যেভাবে Overthinking হয়
১. “সবকিছু ভুল হয়ে যাবে” মানসিকতা
ছোটবেলায় যদি নিরাপত্তা না পান, তাহলে মস্তিষ্ক শিখে যায়—”খারাপ কিছু সবসময় ঘটে”। ফলে, বড় হয়ে আপনি প্রতিটি পরিস্থিতিতে খারাপ কিছু ঘটার অপেক্ষায় থাকেন। একটা সাধারণ ফোন কল মিস করলেও মনে হয়—”নিশ্চয়ই কেউ রাগ করেছে।”
২. অন্যের মতামতের উপর নির্ভরশীলতা
শৈশবে যদি শর্তসাপেক্ষ ভালোবাসা পান (“তুমি ভালো রেজাল্ট করলেই ভালোবাসবো”), তাহলে বড় হয়ে আপনি নিজের সিদ্ধান্তে বিশ্বাস করতে পারেন না। প্রতিটা কাজে আপনি অন্যের approval খোঁজেন। আর তা না পেলে? শুরু হয় overthinking—”আমি কি ভুল করলাম?”
৩. People-pleasing এবং নিজেকে হারিয়ে ফেলা
ছোটবেলায় যদি সমালোচনা বেশি শুনেন, তাহলে বড় হয়ে আপনি সবাইকে খুশি রাখতে চান। নিজের মতামত চাপা দেন। প্রতিটা কথা বলার আগে দশবার ভাবেন—”এটা বললে কেউ খারাপ লাগবে কি না?” এই constant self-monitoring-ই overthinking.
৪. Perfectionism এবং ভুল করার ভয়
“ভুল করলে শাস্তি পাবো”—এই conditioning থেকে জন্ম নেয় perfectionistic overthinking. আপনি কোনো কাজেই satisfied হতে পারেন না। বারবার ভাবেন—”এটা কি যথেষ্ট ভালো?”
৫. সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ
অস্থির পারিবারিক পরিবেশে বড় হলে, বড় হয়ে আপনার মনে তৈরি হয় abandonment fear—”সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।” ফলে, একটা text এর রিপ্লাই늦게এলেই শুরু হয়—”সে কি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে? আমি কি কিছু ভুল বলেছি?”
→ আরও পড়ুনঃ ওভারথিঙ্কিং: অন্যরা যা ভাবে বনাম আসলে কেমন লাগে
→ আরও পড়ুনঃ বাচ্চাদের ট্রমা কাটিয়ে ওঠার পথ – ডাক্তারদের পরামর্শে অভিভাবকের করণীয়
Overthinking আপনাকে কীভাবে ক্ষতি করে?
- আত্মবিশ্বাস কমে যায়
- সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়
- সম্পর্কে trust issue তৈরি হয়
- মানসিক শান্তি হারিয়ে যায়
- Anxiety এবং depression বাড়ে
একটা ছোট্ট ঘটনাও আপনার মাথায় ঘুরতেই থাকে। এটা আপনার দোষ নয়—এটা আপনার মস্তিষ্কের সেই পুরোনো survival mechanism.
তাহলে কি করবেন? কীভাবে মুক্তি পাবেন?
১. নিজের প্যাটার্ন চিনুন
প্রতিবার যখন overthinking শুরু হয়, নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: “আমি কি এই মুহূর্তের পরিস্থিতিতে react করছি, নাকি অতীতের কোনো ভয়ে?”
২. Inner child healing
নিজের ছোট্ট version-কে কল্পনা করুন। তাকে বলুন—”তুমি নিরাপদ। তুমি ভালোবাসার যোগ্য। তোমার কোনো দোষ নেই।” এটা শুনতে সহজ মনে হলেও, এর প্রভাব অসাধারণ।
৩. Trigger বুঝুন
কোন কথা, কোন পরিস্থিতি, কোন মানুষের আচরণে আপনার overthinking trigger হয়? সেটা লিখে রাখুন। একবার trigger চিনতে পারলে, সেটা সামলানো সহজ হয়।
৪. Boundary তৈরি করুন
নিজের জন্য মানসিক সীমারেখা তৈরি করুন। সবকিছুতে “হ্যাঁ” বলার দরকার নেই। নিজের শান্তি রক্ষা করা আপনার অধিকার।
৫. Professional সাহায্য নিন
Trauma-informed therapist-এর কাছে যান। তারা আপনাকে সঠিক পথ দেখাতে পারবেন। Therapy কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়—এটা নিজের প্রতি দায়িত্ব।
Healing সম্ভব
শৈশবের আঘাত আপনার দোষ নয়। কিন্তু healing আপনার দায়িত্ব। Overthinking আপনার শত্রু নয়—এটা আপনার মস্তিষ্কের একটা defence mechanism, যা আপনাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এখন আপনি বড় হয়েছেন। এখন আপনি নিজেকে নিরাপত্তা দিতে পারেন।
যখন আপনি বুঝবেন আপনার চিন্তার উৎস কোথায়, তখনই শুরু হবে সত্যিকারের মুক্তি।
Awareness → Healing → Freedom.
আপনার journey শুরু হোক আজ থেকেই।

