সকাল থেকে রাত, একটা মিটিং শেষ হতে না হতেই আরেকটা শুরু। ইনবক্স ভর্তি, টু-ডু লিস্ট শেষই হয় না, দিনশেষে শরীরটা ক্লান্ত, মাথাটা ভারী। তবুও রাতে শুয়ে মনে হয়, আজ আসলে কী করলাম? দিনটা ব্যস্ত ছিল, কিন্তু অর্থবহ কিছু কি হলো?
এই প্রশ্নটা অনেকেই এড়িয়ে যায়, কারণ ব্যস্ততাকেই আমরা সাফল্যের প্রমাণ মনে করি। ক্যালেন্ডার ভর্তি থাকলে মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ কেউ হয়ে গেছি। কিন্তু ব্যস্ততা আর মূল্য, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। একজন মানুষ সারাদিন কাজ করেও শূন্য হাতে থাকতে পারে, আবার অন্য একজন মাত্র কয়েক ঘণ্টার কাজেই বড় কিছু তৈরি করে ফেলতে পারে। পার্থক্যটা সময়ে না, পার্থক্যটা মনোযোগের জায়গায়।
Management thinker Peter Drucker তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে বলেছিলেন, দক্ষতা মানে কাজটা সঠিকভাবে করা, আর কার্যকারিতা মানে সঠিক কাজটা করা। বেশিরভাগ মানুষ প্রথমটায় আটকে থাকে, দ্বিতীয়টা নিয়ে ভাবেই না। চলো দেখি, ব্যস্ততা আর মূল্যবান হওয়ার মধ্যে আসল পার্থক্যটা কোথায়।
Motion বনাম Progress
গাড়ির চাকা ঘুরলেই গাড়ি এগোয় না, যদি চাকাটা কাদায় আটকে থাকে। ঠিক তেমনি, কাজ করে যাওয়া মানেই এগিয়ে যাওয়া না। “Atomic Habits”-এর লেখক James Clear একে বলেছেন motion বনাম action। মিটিং করা, প্ল্যান বানানো, রিসার্চ করা, এগুলো motion, প্রস্তুতির মতো লাগে। কিন্তু আসল কাজটা, যেটা ফলাফল আনে, সেটাই action।
সব কাজের মূল্য সমান না
দিনে হয়তো ৩০টা কাজ করা যায়, কিন্তু তার মধ্যে হয়তো মাত্র ২-৩টা কাজ আসল পার্থক্য গড়ে দেয়। এটাকেই বলা হয় Pareto Principle, যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ ফলাফল আসে মাত্র ২০ শতাংশ কাজ থেকে। ব্যস্ত মানুষ সব কাজকে সমান গুরুত্ব দেয়, মূল্যবান মানুষ জানে কোনটা আসলে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যস্ততা মাঝে মাঝে পালানোর জায়গা
গবেষক Tim Kreider তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, অনেক সময় মানুষ ব্যস্ত থাকে গভীর, কঠিন চিন্তা এড়ানোর জন্য। ছোট ছোট কাজে ডুবে থাকলে বড় প্রশ্নগুলো মুখোমুখি হতে হয় না, কী চাই, কোথায় যাচ্ছি, এই কাজটার আসলেই দরকার আছে কিনা। ব্যস্ততা তখন হয়ে ওঠে আরামদায়ক পালানোর রাস্তা।
মূল্য মাপা হয় impact দিয়ে, effort দিয়ে না
কেউ ১০ ঘণ্টা খরচ করে একটা ছোট সমস্যার সমাধান করল, আরেকজন ১ ঘণ্টায় একটা বড় সমস্যা সমাধান করে ফেলল। কে বেশি মূল্যবান? উত্তরটা স্পষ্ট। কিন্তু আমরা প্রায়ই effort-কেই সাফল্যের মাপকাঠি বানিয়ে ফেলি, অথচ আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই কাজটা আসলে কতটা পরিবর্তন আনল।
“না” বলা একটা দক্ষতা
Warren Buffett-এর একটা বিখ্যাত ধারণা আছে, সফল মানুষ আর সত্যিকারের সফল মানুষের পার্থক্য হলো, দ্বিতীয়জন প্রায় সবকিছুতেই “না” বলে। ক্যালেন্ডার খালি রাখা ভয়ের মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটা “হ্যাঁ” আসলে অন্য কিছুর জন্য “না” বলা। যে যত বেশি অপ্রয়োজনীয় জিনিসে “না” বলতে পারে, সে তত বেশি জায়গা রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য।
গভীর মনোযোগেই আসল কাজ হয়
Computer scientist Cal Newport তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, বড় বড় সৃজনশীল আর গুরুত্বপূর্ণ কাজ তৈরি হয় গভীর, বিভ্রান্তিহীন মনোযোগ থেকে, যাকে তিনি বলেন “deep work”। খণ্ড খণ্ড সময়ে, নোটিফিকেশনের ফাঁকে ফাঁকে করা কাজ কখনোই সেই মানে পৌঁছাতে পারে না।
আজ রাতে যদি নিজেকে জিজ্ঞেস করো, দিনটা কেমন গেল, ব্যস্ততার হিসাব না দিয়ে দেখো মূল্যের হিসাব। কতগুলো মিটিং করলে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, কতটা পরিবর্তন আনলে সেটাই আসল। কারণ জীবনের শেষে কেউ মনে রাখে না তুমি কতটা ব্যস্ত ছিলে, মনে রাখে তুমি কী রেখে গেলে।

