ভোর ৪টা। ঢাকার আকাশে তখনো আলো ফোটেনি। আপনি গভীর ঘুমে, আর রাস্তার মোড়ে ঝাড়ু হাতে একজন মানুষ কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তাঁর নাম আমরা জানি না। হয়তো জানতেও চাই না। কিন্তু তিনি না থাকলে সকালে অফিসে যাওয়ার পথটা আজ ময়লার স্তূপে আটকে থাকত।
আমরা শহর দেখি, শহরের শরীর দেখি না
আমরা শহর বলতে বুঝি উঁচু ভবন, ঝলমলে শপিং মল, আর ফ্লাইওভার। কিন্তু একটা শহর আসলে একটা জীবন্ত শরীর। তার শিরায় বয়ে চলে পানি, বিদ্যুৎ আর মানুষ। এই শরীরকে সুস্থ রাখেন যাঁরা, তাঁদের আমরা প্রায় কখনোই চোখ তুলে দেখি না।
পরিসংখ্যান তাঁদের কাজের ভার বোঝায়। বিশ্বব্যাংকের What a Waste 2.0 প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২০১ কোটি টন পৌর বর্জ্য তৈরি হয়। ২০৫০ সালের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ৩৪০ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্রতিদিন কয়েক হাজার টন বর্জ্য জমে। সেই বর্জ্য সরানোর দায়িত্ব কার? কয়েক হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মীর, যাঁদের অনেকেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করেন।
যাঁরা শহরকে চালু রাখেন
পরিচ্ছন্নতাকর্মী। আইএলও, ডব্লিউএইচও ও বিশ্বব্যাংকসহ একাধিক সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে স্যানিটেশন কর্মীরা স্বাস্থ্যঝুঁকি, নিরাপত্তাহীনতা আর সামাজিক অবহেলার মধ্যে কাজ করেন। যে কাজ ছাড়া শহর এক সপ্তাহও টিকবে না, সমাজ সেই কাজকে সবচেয়ে ছোট চোখে দেখে।
রিকশাচালক। বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, ঢাকায় চলে প্রায় ১০ লাখ রিকশা। কোটি মানুষের গলিপথের যাতায়াত এই মানুষগুলোর পায়ের জোরেই চলে। গরমে, বৃষ্টিতে, জ্যামে, সব সময়। ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষির সময় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, ওই বিশ-ত্রিশ টাকায় একটা পুরো পরিবারের রান্না চড়ে।
রাতের শহরের প্রহরীরা। বিদ্যুতের লাইনম্যান, পানির পাম্প অপারেটর, রাতের শিফটের পুলিশ, হাসপাতালের নার্স আর ওয়ার্ডবয়, ভোরের রুটি-কারিগর। আমরা যখন ঘুমাই, তখন তাঁদের কাজই ঠিক করে দেয় সকালে আমাদের জন্য সব কিছু তৈরি থাকবে কি না।
একটা ছোট পরীক্ষা
কল্পনা করুন, আগামীকাল সকালে এঁরা সবাই একদিনের জন্য কাজ বন্ধ রাখলেন। রাস্তায় ময়লা, বন্ধ ড্রেন, বিদ্যুৎহীন এলাকা, থেমে থাকা গণপরিবহন। একদিনেই শহরটা অচল হয়ে যাবে। তখন আমরা বুঝব, শহরের আসল “অবকাঠামো” কংক্রিট নয়, মানুষ।
আমরা কী করতে পারি
বড় পরিবর্তনের জন্য নীতি লাগে, ন্যায্য মজুরি লাগে, নিরাপদ কর্মপরিবেশ লাগে। কিন্তু শুরুটা হতে পারে খুব ছোট জায়গা থেকে। একটা “ধন্যবাদ”। রিকশাভাড়া নিয়ে অকারণ দর-কষাকষি না করা। ময়লা ঠিক জায়গায় ফেলে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ একটু হালকা করা। সম্মান দেওয়ার জন্য কারও পদবি দেখার দরকার হয় না।
আগামীকাল ভোরে যখন আপনার জানালার বাইরে ঝাড়ুর শব্দ শুনবেন, একবার ভাববেন, ওই শব্দটাই আপনার শহরের হৃদস্পন্দন। যাঁরা শহরকে সাজান, তাঁদের আমরা মনে রাখি। কিন্তু যাঁরা শহরকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাঁদের মনে রাখার দায়িত্বটা আমাদের সবার। শহরের গল্প শুধু স্থপতিদের নয়, ঝাড়ুদারেরও। ওই গল্পে তাঁদের নামটাও লেখা থাকা উচিত।

