ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা, এসবের মধ্যেই একটা ব্যবসার আইডিয়া মাথায় ঘুরছে। মনে হচ্ছে এখনই শুরু করা দরকার, কিন্তু সাথে সাথে প্রশ্নও উঠছে, পড়াশোনার পাশাপাশি এটা আদৌ সম্ভব কিনা। বাস্তবতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়টাই ব্যবসা শুরু করার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ সময়গুলোর একটা, ঠিক ব্যস্ততার কারণে না, বরং এই সময়ে থাকা সুরক্ষা আর সুযোগের কারণে।
মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ডের ডর্ম রুম থেকে Facebook শুরু করেছিলেন, মাইকেল ডেল টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় Dell শুরু করেছিলেন, এমন একটা ছোট শুরু পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৭৩.৫৪ বিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের একটা কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই গল্পগুলো ব্যতিক্রম মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনের নীতিগুলো যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই প্রযোজ্য। চলো দেখি, পড়াশোনার পাশাপাশি কীভাবে একটা ব্যবসা গড়ে তোলা যায়।
ছোট শুরু করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ
একটা পণ্য, একটা সার্ভিস, একধরনের ক্লায়েন্ট, এভাবেই শুরু করা উচিত। এমন কিছু যেটা বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বড় করা সহজ, বরং শুরুতেই অনেক বেশি ছড়িয়ে ফেলা একটা ব্যবসা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে ক্লাসের চাপের সাথে। Shopify-র একটা জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩৮ শতাংশ ব্যবসা শুরু হয় প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা আগে থেকে থাকা দক্ষতা থেকে। নিজের পড়াশোনার বিষয়, শখ, বা এমন কোনো সমস্যা যেটা নিজে সম্মুখীন হয়েছ, সেখান থেকেই সবচেয়ে টেকসই আইডিয়া আসে।
ক্যাম্পাসই একটা ফ্রি রিসোর্স সেন্টার
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে একটা ফ্রি কো-ওয়ার্কিং স্পেস, মার্কেট রিসার্চ ল্যাব, আর নেটওয়ার্কিং চ্যানেল হিসেবে দেখা যায়। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন entrepreneurship center বা ইনকিউবেটর প্রোগ্রাম আছে, যেখানে মেন্টরশিপ, পিচ কম্পিটিশন, এমনকি সিড ফান্ডিংও পাওয়া যায়। RUMARC-এর মতো মার্কেটিং বা বিজনেস ক্লাব, ক্যারিয়ার সেন্টার, আর অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক, এই সবকিছুই সম্ভাব্য মেন্টর, পার্টনার, আর প্রথম কয়েকজন গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ তৈরি করে দিতে পারে। এর পাশাপাশি স্টুডেন্ট ইমেইল দিয়ে Adobe Creative Cloud, Notion, GitHub Student Developer Pack-এর মতো টুল বিনামূল্যে বা ছাড়ে ব্যবহার করা যায়, যা শুরুর খরচ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
থাকার খরচ আগে থেকেই মেটানো, এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা
শিক্ষার্থী হিসেবে থাকার খরচ, বাসাভাড়া, খাবার, এসব ইতিমধ্যে পরিবার বা বৃত্তির মাধ্যমে মেটানো থাকে। এর মানে ব্যবসাকে “লাভজনক” বলার জন্য যে আয়ের সীমা দরকার, সেটা একজন চাকরিজীবীর তুলনায় অনেক কম। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্সাস ডেটা অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ শতাংশ ছোট ব্যবসা ২৫ হাজার ডলারেরও কম পুঁজি দিয়ে শুরু হয়। কম খরচে, কম ঝুঁকিতে শেখার এই সুযোগটাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে বড় সুবিধা।
পিচ কম্পিটিশন আর প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া
টাকা খরচ করার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের entrepreneurship center বা ইনকিউবেটরে খোঁজ নেওয়া উচিত। পিচ কম্পিটিশনে অংশ নিলে বিনামূল্যে মূলধন পাওয়ার সুযোগ থাকে, অনেক প্রতিযোগিতায় ১ হাজার থেকে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হয়। Global Student Entrepreneur Awards-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও ২০২৬ সালে ৩৭টা দেশ থেকে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে, এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম শুধু ফান্ডিং না, নেটওয়ার্ক আর অভিজ্ঞতাও তৈরি করে দেয়।
দ্রুত একটা MVP লঞ্চ করা
নিখুঁত হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে একটা নির্দিষ্ট লঞ্চ ডেডলাইন ঠিক করে ফেলা উচিত। একটামাত্র পণ্য বা একটামাত্র মূল সার্ভিস দিয়ে শুরু করা, প্রথম পাঁচজন পেয়িং কাস্টমার জোগাড় করা, আর তাদের কাছ থেকে টেস্টিমোনিয়াল নেওয়া, এটাই একটা বাস্তবসম্মত প্রথম লক্ষ্য হতে পারে। এরপর বিনামূল্যের চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়া, ক্যাম্পাস ইভেন্ট, স্টুডেন্ট গ্রুপ, ব্যবহার করে ধীরে ধীরে মার্কেটিং প্ল্যান তৈরি করা যায়।
সময় ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
পড়াশোনা আর ব্যবসা একসাথে সামলানোর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কোনো একটাতে অতিরিক্ত সময় দিয়ে অন্যটাকে অবহেলা করা। শুরুতে অল্প কমিটমেন্ট আর কম খরচ নিয়ে কাজ করাটাই নিরাপদ, যাতে ক্লাসের সময়সূচির সাথে সহজেই মানিয়ে নেওয়া যায়। সপ্তাহে নির্দিষ্ট কিছু ঘণ্টা ব্যবসার জন্য আলাদা করে রাখা, আর পরীক্ষার সময় সেই সময়টা কমিয়ে আনার নমনীয়তা রাখা, এই ভারসাম্যটাই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় ব্যবসা শুরু করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ব্যর্থ হলেও হারানোর তেমন কিছু থাকে না, কিন্তু শেখার সুযোগটা থেকে যায় সারাজীবনের জন্য। ছোট শুরু, ক্যাম্পাসের রিসোর্স কাজে লাগানো, আর বাস্তবসম্মত সময় ব্যবস্থাপনা, এই তিনটা মিলিয়েই তৈরি হয় একটা টেকসই শুরু। পড়াশোনা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে, এখনই শুরু করাটাই আসলে সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ সময়।

