back to top
মঙ্গলবার, আগস্ট ১১, ২০২৬
HomeWellbeingMental Healthসামাজিক তুলনা কেন করি? কীভাবে বের হবেন তুলনার ফাঁদ থেকে

সামাজিক তুলনা কেন করি? কীভাবে বের হবেন তুলনার ফাঁদ থেকে

ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটা পোস্ট চোখে পড়ল, কারো নতুন চাকরি, কারো বিদেশ ভ্রমণ, কারো নিখুঁত সংসার। মুহূর্তের মধ্যে মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেল। নিজের জীবনটা হঠাৎ কম মনে হতে শুরু করল, যদিও পাঁচ মিনিট আগেও সবকিছু ঠিকঠাক লাগছিল। এই অনুভূতিটা তোমার একার না, এর পেছনে আছে মানুষের মনের একটা খুব পুরনো আর গভীর প্রবৃত্তি।

মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিংগার ১৯৫৪ সালে একটা তত্ত্ব দিয়েছিলেন, social comparison theory। তার মতে, মানুষ নিজের সামর্থ্য আর মূল্য যাচাই করে অন্যের সাথে তুলনা করে, কারণ নিজেকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার কোনো নিরপেক্ষ মাপকাঠি সাধারণত হাতের কাছে থাকে না। চলো দেখি, এই তুলনা করার প্রবণতাটা আসলে কীভাবে কাজ করে, আর কেন এটা মাঝে মাঝে এত কষ্ট দেয়।

তিন ধরনের তুলনা

গবেষকরা তুলনাকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করেন। Upward comparison, যেখানে নিজের চেয়ে বেশি সফল মনে হওয়া কারো সাথে তুলনা করা হয়। Downward comparison, যেখানে নিজের চেয়ে কম সফল মনে হওয়া কারো সাথে তুলনা করে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়। আর Lateral comparison, যেখানে নিজের মতো একই অবস্থানের মানুষের সাথে তুলনা করা হয়।

Upward comparison কখনো কখনো অনুপ্রেরণা দেয়, নিজেকে আরও ভালো করার তাগিদ তৈরি করে। কিন্তু একই সাথে এটা হীনম্মন্যতা আর আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেওয়ার একটা বড় কারণও হতে পারে। অন্যদিকে downward comparison সাময়িকভাবে ভালো লাগা তৈরি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে সেটা আত্মতুষ্টিতে আটকে দিতে পারে, নিজের প্রকৃত উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সোশ্যাল মিডিয়া কেন এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তোলে

২০২৫ সালের একটা গবেষণায় দেখা গেছে, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের সাথে self-esteem কমে যাওয়ার একটা স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া গেছে, আর সেই সম্পর্কের মাঝখানে কাজ করে upward social comparison। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ যা পোস্ট করে, সেটা সাধারণত জীবনের সবচেয়ে ভালো মুহূর্তগুলোর কিউরেটেড সংস্করণ। ফলে আমরা যখন নিজের সাধারণ, কাঁচা দিনগুলোকে অন্যের সাজানো হাইলাইট রিলের সাথে তুলনা করি, তুলনাটা প্রথম থেকেই অসম হয়ে যায়।

মনোবিজ্ঞানী গিলবার্টের ranking theory অনুযায়ী, তুলনা করাটা আসলে একটা বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া, যেটা মানুষকে সামাজিক অবস্থান বুঝতে সাহায্য করত। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই একই প্রক্রিয়া এখন প্রতিদিন হাজারো মানুষের সাথে তুলনা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যেটা মানুষের মস্তিষ্ক আসলে সামলানোর জন্য তৈরি হয়নি।

সবসময় কি এটা খারাপ

পুরো গল্পটা কিন্তু নেতিবাচক না। Psychology Today-তে প্রকাশিত একটা লেখায় বলা হয়েছে, তুলনা যখন নিজের উন্নতি মাপার বা নিজেকে অনুপ্রাণিত করার একটা উপায় হিসেবে কাজে লাগে, তখন সেটা আসলে একটা ইতিবাচক আত্মচিত্র তৈরিতেও সাহায্য করতে পারে। সমস্যাটা তুলনায় না, তুলনার ধরনে আর ফ্রিকোয়েন্সিতে। নিয়মিত, অসচেতনভাবে অন্যের সাথে তুলনা করতে থাকলে গভীর অসন্তুষ্টি, অপরাধবোধ, এমনকি মিথ্যা বলা বা disordered eating-এর মতো ক্ষতিকর আচরণও তৈরি হতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

নিজেকে তুলনার ফাঁদ থেকে বের করার উপায় 

– তুলনা করার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করা, এটা কি আমাকে অনুপ্রাণিত করছে, নাকি শুধু কষ্ট দিচ্ছে
– মনে রাখা, সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখা যাচ্ছে তা কারো জীবনের পুরো গল্প না, বাছাই করা কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র
– lateral comparison-এর বদলে নিজের গতকালের সাথে আজকের তুলনা করার অভ্যাস তৈরি করা
– যেসব অ্যাকাউন্ট বা মানুষ নিয়মিত হীনম্মন্যতা তৈরি করে, তাদের থেকে সচেতনভাবে দূরত্ব রাখা

তুলনা করাটা মানুষের মস্তিষ্কের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা, এটা সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভবও না, দরকারও নেই। কিন্তু কখন সেই তুলনাটা তোমাকে এগিয়ে নিচ্ছে, আর কখন সেটা শুধু তোমাকে ছোট করে দিচ্ছে, এই পার্থক্যটা বুঝতে পারাই আসল কাজ। নিজের জীবনের গল্পটা তুলনার আয়নায় না দেখে, নিজের চোখেই দেখার অভ্যাসটাই সবচেয়ে বড় মুক্তি।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular