আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি—সম্পর্ক মানেই সহ্য করা, মানিয়ে নেওয়া, ছাড় দেওয়া। পরিবারের সাথে, বন্ধুদের সাথে, প্রেমের সম্পর্কে—সব জায়গায় একই চাপ। “এত বছরের সম্পর্ক তুমি এভাবে শেষ করে দেবে?” এই প্রশ্নের ভার আমরা কাঁধে বহন করি। কিন্তু একটা প্রশ্ন কি আমরা কখনো নিজেকে করি—নিজের ক্ষতির বিনিময়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কি আসলেই ঠিক?
কতবার আমরা ভেঙে পড়ি, কিন্তু তবুও ধরে রাখি? কতবার নিজেকে বলি, “আমাকেই তো মানিয়ে নিতে হবে”? কিন্তু কেউ কি একবারও জিজ্ঞেস করে—তুমি ঠিক আছ তো?
আমরা কেন সব সম্পর্ক ধরে রাখতে চাই
সম্পর্ক ছাড়া—এই কথাটাই আমাদের ভয় পাইয়ে দেয়। আমরা ভাবি, একা হয়ে যাব। আশেপাশের মানুষ কী বলবে—এই চাপ আমাদের গলা টিপে ধরে। “তুমি কেন ওর সাথে আর কথা বল না?” “পরিবারের সাথে এভাবে দূরত্ব করা ঠিক না।” এই সব কথা শুনতে শুনতে আমরা নিজের কষ্টকে অস্বীকার করতে শিখি।
তার ওপর আছে আবেগের বিনিয়োগ। যে সম্পর্কে আমরা বছরের পর বছর সময় দিয়েছি, অনুভূতি দিয়েছি, সেটা ছেড়ে দেওয়া মানে যেন সব হারিয়ে ফেলা। আমরা সম্পর্ক ছাড়াকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখি। কিন্তু সত্যি কি তাই?
সব সম্পর্কের lifespan একরকম নয়
জীবনে সব সম্পর্ক সারাজীবনের জন্য আসে না। কিছু সম্পর্ক আসে আমাদের কিছু শেখাতে—কীভাবে বিশ্বাস করতে হয়, কীভাবে ভালোবাসতে হয়, বা কখনো কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। শেখানো শেষ হলে সেই সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়, এবং সেটাই স্বাভাবিক।
কিছু সম্পর্ক শুধু সময় পার করার জন্য। স্কুল-কলেজের বন্ধুত্ব, অফিসের সহকর্মী—এগুলো একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রয়োজন। সময় পাল্টালে এই সম্পর্কগুলোও পাল্টে যায়। আবার কিছু সম্পর্ক শুধু অভ্যাস হয়ে যায়। আমরা ধরে রাখি কারণ ছেড়ে দিতে ভয় লাগে, নতুন কিছু শুরু করতে কষ্ট লাগে। কিন্তু অভ্যাস মানেই কি ভালোবাসা? সম্পর্ক শেষ হওয়া মানেই কি ভুল হয়ে গেল?
সুস্থ সম্পর্ক বনাম ক্ষতিকর সম্পর্ক
একটা সুস্থ সম্পর্কে সম্মান থাকে—দুজনের ভিন্ন মতামতের, দুজনের সীমানার। কথা বলা যায় খোলাখুলি, ভয় ছাড়া। নিজেকে ছোট করতে হয় না, নিজের চাহিদা লুকিয়ে রাখতে হয় না। এই সম্পর্কে আপনি বড় হন, শক্তি পান।
কিন্তু ক্ষতিকর সম্পর্কে থাকে অপরাধবোধ। “আমিই বোধহয় ভুল করছি,” “আমিই বেশি আশা করছি”—এই চিন্তাগুলো নিয়মিত আসে। থাকে ভয়—কথা বললে রাগ হবে, দূরে সরে যাবে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর হলো নিজেকে হারিয়ে ফেলা। আপনি আর বুঝতে পারেন না আপনি কী চান, কী ভালো লাগে, কারণ সম্পর্কের চাপে নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেছে।
“আমাকেই মানিয়ে নিতে হবে”—এই মানসিকতার সমস্যা
এই কথা বলার মধ্যে লুকিয়ে আছে একতরফা ছাড়ের গল্প। শুধু আপনিই মানিয়ে নিচ্ছেন, ওপাশের মানুষটা কি কিছু বদলাচ্ছে? নিজের চাহিদা, নিজের কষ্ট অগ্রাহ্য করতে করতে একসময় সেগুলো আর অনুভবই হয় না। মনে হয়, চাওয়াটাই বোধহয় ভুল।
এভাবে চলতে থাকলে ভেতরে নীরব ক্ষোভ জমতে থাকে। একদিন সেই ক্ষোভ বিস্ফোরণ হয়, অথবা আরও খারাপ—আপনি একদম নিঃশেষ হয়ে যান।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার নামে আমরা কী হারাই
প্রথমে হারাই আত্মসম্মান। যখন বারবার অসম্মান সহ্য করি, তখন নিজের চোখেই নিজের মূল্য কমে যায়। মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলি। ঘুম হয় না, মন ভালো থাকে না, সব সময় একটা অস্বস্তি লেগে থাকে।
নিজের সময় আর শক্তি ব্যয় হয় এমন একটা সম্পর্কে যেটা আসলে আপনাকে কিছু দিচ্ছে না। আর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, অন্য সুস্থ সম্পর্কের সুযোগ হারিয়ে ফেলি। ক্ষতিকর সম্পর্কে আটকে থাকায় যারা আপনাকে সত্যিই ভালোবাসতে পারত, তাদের সাথে সংযোগ তৈরি হয় না।
কখন সম্পর্ক ছাড়ার কথা ভাবা উচিত
যখন আপনি কথা বলেছেন, সমস্যা তুলে ধরেছেন, কিন্তু কোনো পরিবর্তন আসেনি। একবার দুবার নয়, বারবার চেষ্টার পরও যদি একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকেন। যখন বারবার অসম্মান হয়। আপনার কথার মূল্য নেই, আপনার অনুভূতির দাম নেই—এটা যদি নিয়মিত ঘটনা হয়, তবে সেটা সম্পর্ক নয়, অত্যাচার।
যখন সম্পর্কের পর নিজেকে ফাঁকা লাগে। একসাথে সময় কাটানোর পর যদি ক্লান্ত আর শূন্য অনুভব করেন, তবে বুঝবেন এই সম্পর্ক আপনাকে শুষে নিচ্ছে। যখন ভয় আর ক্লান্তি আপনার নিয়মিত সঙ্গী হয়ে যায়। প্রতিটা মেসেজ দেখে, প্রতিটা ফোন কল দেখে যদি বুক দুরুদুরু করে, তবে বুঝবেন এটা ভালোবাসা নয়।
ছাড়ার মানে ঘৃণা নয়
অনেকে ভাবে, সম্পর্ক শেষ করা মানে রাগ করে চলে যাওয়া। কিন্তু না। দূরে যাওয়া মানে ঘৃণা নয়। আপনি কাউকে ভালোবাসতে পারেন, কিন্তু সেই সাথে এটাও বুঝতে পারেন যে তার সাথে আপনার আর থাকা উচিত নয়।
সম্পর্ক শেষ করা মানেই শত্রুতা নয়। কখনো কখনো নীরবে দূরে সরে যাওয়াই সবচেয়ে সম্মানজনক সিদ্ধান্ত। কারণ আপনি জানেন, একসাথে থাকলে দুজনেরই ক্ষতি হবে।
সম্পর্ক বাঁচানো আর নিজেকে বাঁচানোর ভারসাম্য
মনে রাখতে হবে, সম্পর্ক জীবনের একটা অংশ, সম্পূর্ণ জীবন নয়। যখন আপনি নিজেকে ঠিক রাখেন, মানসিকভাবে সুস্থ থাকেন, তখন আপনার সম্পর্কগুলোও ভালো হয়। কারণ আপনি তখন একটা পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্পর্কে আসেন, একজন ভাঙা, শূন্য মানুষ হিসেবে নয়।
আর সব সম্পর্ক ধরে রাখার দায়িত্ব আপনার একার নয়। সম্পর্ক মানে দুজনের প্রচেষ্টা, দুজনের সমান অবদান। যদি আপনি একাই সব বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন, তবে সেটা সম্পর্ক নয়, দায়িত্ব।
সব সম্পর্ক নয়—কিছু সম্পর্কই যথেষ্ট
সম্পর্কের মান সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। একশোটা মানুষের সাথে ভেঙে থাকার চেয়ে দুজন সত্যিকারের মানুষের সাথে ভালো থাকা অনেক বেশি মূল্যবান। যেখানে শান্তি নেই, সেখানে থাকাটা সাহস নয়—সেখান থেকে বেরিয়ে আসাটাই আসল সাহস।
কারণ নিজের যত্ন নেওয়া কোনো স্বার্থপরতা নয়। নিজেকে রক্ষা করা আপনার প্রথম দায়িত্ব। আর কখনো কখনো সেই রক্ষা পেতে হলে কিছু সম্পর্ক ছেড়ে দিতে হয়।
সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মতো হয় না— কিছু সম্পর্ক ছেড়ে দেওয়াই নিজের যত্ন।

