আমরা প্রায়ই যেকোনো পাবলিক জায়গায় ওয়াই–ফাই অন রেখে দেই। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে বা এয়ারপোর্টে ফ্রি ইন্টারনেট পেলেই ঝটপট কানেক্ট করে ফেলি। কিন্তু এটাই হতে পারে আপনার সবচেয়ে বড় ডিজিটাল ভুল।
অপরিচিত বা ওপেন ওয়াই–ফাই আপনার ব্যক্তিগত ডেটা, পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য—সবকিছু মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এই ব্লগে আমরা জানব কেন অপরিচিত জায়গায় স্মার্টফোনের ওয়াই–ফাই বন্ধ রাখা এত জরুরি এবং কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন।
ওপেন ওয়াই–ফাই আসলে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
পাবলিক জায়গার ওয়াই–ফাই নেটওয়ার্কগুলো সাধারণত কোনো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই চালু থাকে। হোটেল, ক্যাফে, এয়ারপোর্ট, রেস্টুরেন্টের এসব নেটওয়ার্কে যে কেউ সহজেই প্রবেश করতে পারে। আর এই সুযোগটাই হ্যাকাররা কাজে লাগায়।
একজন দক্ষ হ্যাকার সহজেই “ম্যান-ইন-দ্য-মিডল অ্যাটাক” নামক পদ্ধতি ব্যবহার করে আপনার ফোনের সমস্ত ডেটা দেখতে পারে। আপনি যখন কোনো ওয়েবসাইট ব্রাউজ করছেন, ইমেইল পাঠাচ্ছেন বা মেসেজ করছেন—সবই তারা ইন্টারসেপ্ট করতে পারে।
অপরিচিত জায়গায় ওয়াই–ফাই অন না রাখার ৫টি মূল কারণ
১) আপনার ডেটা সহজেই চুরি হতে পারে
পাবলিক ওয়াই–ফাই নেটওয়ার্কে আপনার স্মার্টফোন থেকে প্রেরিত তথ্যগুলো এনক্রিপ্ট করা থাকে না। এর ফলে হ্যাকাররা সহজেই দেখতে পারে:
- আপনার পাসওয়ার্ড
- ব্যক্তিগত ছবি এবং ভিডিও
- ইমেইল এবং মেসেজের বিষয়বস্তু
- হোয়াটসঅ্যাপ বা এসএমএস
- সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের তথ্য
এই তথ্যগুলো চুরি হলে আপনার পরিচয় চুরি, অ্যাকাউন্ট হ্যাক বা আরও বড় ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হতে পারেন।
২) ফেক ওয়াই–ফাই নেটওয়ার্ক (ইভিল টুইন অ্যাটাক)
হ্যাকাররা প্রায়ই আসল নেটওয়ার্কের নামের সাথে হুবহু মিল রেখে একটি ভুয়া ওয়াই–ফাই নেটওয়ার্ক তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ক্যাফের আসল নেটওয়ার্কের নাম যদি হয় “Cafe_Free_WiFi”, তাহলে হ্যাকার একই নামে বা সামান্য পরিবর্তন করে একটি নেটওয়ার্ক খুলে বসে থাকে।
আপনি যখন ভুল করে সেই ভুয়া নেটওয়ার্কে কানেক্ট করেন, তখন আপনার সমস্ত ডেটা সরাসরি হ্যাকারের হাতে চলে যায়। এটাকে বলা হয় “ইভিল টুইন অ্যাটাক”।
৩) ব্যাংকিং অ্যাপ এবং আর্থিক তথ্য ঝুঁকিতে পড়ে
পাবলিক ওয়াই–ফাইয়ে আপনার মোবাইল ব্যাংকিং, বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো এমএফএস অ্যাপ, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য এবং ওটিপি—সবকিছুই এক্সপোজড হতে পারে।
একবার যদি হ্যাকার আপনার ব্যাংকিং তথ্য হাতে পায়, তাহলে আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা, অনলাইন লেনদেন করা বা আপনার পরিচয় ব্যবহার করে ঋণ নেওয়া—সবই সম্ভব হয়ে যায়।
৪) ফোনে ম্যালওয়্যার বা স্পাইওয়্যার ঢুকে যেতে পারে
অনিরাপদ পাবলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হ্যাকাররা আপনার স্মার্টফোনে ম্যালওয়্যার, স্পাইওয়্যার বা অন্যান্য ক্ষতিকর সফটওয়্যার ইনস্টল করে দিতে পারে। এসব সফটওয়্যার আপনার অজান্তেই:
- আপনার কলের রেকর্ড নিতে পারে
- ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন অন করে আপনাকে নজরদারি করতে পারে
- আপনার টাইপ করা প্রতিটি শব্দ রেকর্ড করতে পারে (কীলগিং)
- গোপনে আপনার তথ্য অন্য সার্ভারে পাঠাতে পারে
৫) লোকেশন ট্র্যাকিং এবং ডিভাইস ক্লোনিং
আপনার ওয়াই–ফাই অন থাকলে হ্যাকার আপনার ডিভাইসের অবস্থান সনাক্ত করতে পারে। এছাড়াও তারা আপনার ডিভাইসের তথ্য সংগ্রহ করে অন্য একটি ডিভাইসে “ক্লোন” করতে পারে।
ডিভাইস ক্লোনিং হলে আপনার সব মেসেজ, কল হিস্ট্রি, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যকলাপ তারা দেখতে পাবে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তাহলে করবেন কী? নিরাপদ থাকার কার্যকর উপায়
১) অপরিচিত জায়গায় ওয়াই–ফাই বন্ধ রাখুন
এটাই সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায়। যখন কোনো অপরিচিত বা পাবলিক জায়গায় যাবেন, তখন আপনার স্মার্টফোনের ওয়াই–ফাই সেটিংস থেকে সরাসরি বন্ধ করে দিন। এতে আপনার ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হবে না।
২) পাবলিক ওয়াই–ফাই ব্যবহার করতে হলে ভিপিএন ব্যবহার করুন
যদি একান্তই পাবলিক ওয়াই–ফাই ব্যবহার করতে হয়, তাহলে অবশ্যই একটি নির্ভরযোগ্য ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) সফটওয়্যার ব্যবহার করুন। ভিপিএন আপনার ডেটাকে এনক্রিপ্ট করে দেয়, ফলে হ্যাকাররা আপনার তথ্য দেখতে পারে না।
৩) অটো-কানেক্ট ফিচার বন্ধ করুন
বেশিরভাগ স্মার্টফোনে “অটো-কানেক্ট টু ওয়াই–ফাই” নামে একটি সেটিংস থাকে। এটি চালু থাকলে আপনার ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে যেকোনো উপলব্ধ নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়। এই ফিচারটি বন্ধ করে রাখুন।
৪) ব্যাংকিং বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে লগইন করবেন না
পাবলিক ওয়াই–ফাইয়ে থাকাকালীন কখনোই ব্যাংকিং অ্যাপ, ইমেইল, সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনো সংবেদনশীল অ্যাকাউন্টে লগইন করবেন না। জরুরি প্রয়োজন হলে মোবাইল ডেটা ব্যবহার করুন।
৫) মোবাইল হটস্পট ব্যবহার করুন
যদি আপনার সাথে অন্য কেউ থাকে বা আপনার নিজের মোবাইল ডেটা থাকে, তাহলে মোবাইল হটস্পট ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ। এটি আপনার নিজস্ব নেটওয়ার্ক, তাই হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি নেই।
আপনার মোবাইল ফোন এখন আপনার দ্বিতীয় মস্তিষ্ক। এখানে আপনার সব ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ব্যাংকিং ডিটেইলস, অফিসের কাজ—সবকিছুই সংরক্ষিত থাকে। তাই যেকোনো অপরিচিত জায়গায় ওয়াই–ফাই অন রেখে দেওয়া মানে হলো আপনার ঘরের দরজা খুলে রেখে চোর ডাকা।
ডিজিটাল যুগে সাইবার নিরাপত্তা আমাদের সবার দায়িত্ব। একটুু সচেতন হলেই আমরা অনেক বড় ঝুঁকি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি। মনে রাখবেন—প্রতিরোধই সর্বোত্তম প্রতিকার।
সচেতন থাকুন—নিরাপদ থাকুন।

