“ছুটি মানেই কক্সবাজার!” — এই বাক্যটা যেন বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রতিষ্ঠিত। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, কিংবা নবদম্পতি—সমুদ্রের ডাকে সাড়া দেয় সবাই। কিন্তু সেই আনন্দভ্রমণ কখনো কখনো রূপ নেয় ভয়ংকর এক অধ্যায়ে—কোনো প্রাণ হারিয়ে ফেলে গভীর সমুদ্রের ঢেউয়ে।
গত কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কক্সবাজারে পর্যটকদের মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। ডুবে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, ঝুঁকিপূর্ণ সেলফি, কিংবা বেপরোয়া অ্যাডভেঞ্চারের কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন বহু মানুষ।
প্রশ্ন হলো—এই মৃত্যুদের পেছনে কারণ কী? আর আমরা কিভাবে আমাদের এবং আমাদের প্রিয়জনদের নিরাপদ রাখতে পারি?
চলুন, আমরা জানি বাস্তব উদাহরণ আর তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
আনন্দ থেকে আতঙ্ক
তানভীর ও ফারিয়া, নবদম্পতি। বিয়ের কয়েকদিন পরই চলে যান কক্সবাজারে হানিমুনে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তাঁরা হিমছড়িতে যান, সেলফি তুলতে তুলতে পাহাড়ি ঢালে অনেক উপরে উঠে যান। একসময় ফারিয়া পিছলে পড়েন। চারপাশে কেউ ছিল না, হেল্প আসতে সময় লেগে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনা শুধু ফারিয়ার পরিবারের না, বরং আমাদের সবার জন্য এক অশ্রুত আহ্বান।
মৃত্যুর মূল কারণগুলো কী?
১. লাইফগার্ড বা নিরাপত্তাকর্মীর ঘাটতি
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দৈর্ঘ্যে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইফগার্ড নেই। ঢেউয়ের শক্তি বা জোয়ার-ভাটার সময় সম্পর্কে অনেকেই অজ্ঞ।
২. ‘ডেঞ্জার জোনে’ গোসল
অনেকেই আনন্দের বশে বা ছবির মোহে ঢেউয়ের গভীরে চলে যান। অথচ লাল পতাকা বা সাইনবোর্ড উপেক্ষা করেন।
৩. ফিটনেস বা শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করা
দীর্ঘ বাস জার্নি, হঠাৎ ঠাণ্ডা পানিতে নেমে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে—বিশেষ করে বয়স্ক বা উচ্চ রক্তচাপ/ডায়াবেটিস আক্রান্তদের ক্ষেত্রে।
৪. ঝুঁকিপূর্ণ ছবি বা ভিডিও তোলার প্রবণতা
ছবির জন্য পাহাড়ের কিনারে দাঁড়ানো, নৌকার প্রান্তে উঠে দাঁড়ানো, বা ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ানো—এসবই হয়ে উঠছে বিপদজনক।
তাহলে আমরা কী করবো?
১. নিরাপত্তা চিহ্ন বুঝুন এবং মেনে চলুন
- সৈকতে গেলে দেখুন কোথায় লাল পতাকা উঠানো আছে। এই জায়গাগুলো বিপজ্জনক।
- হিমছড়ি বা ইনানির মতো পাহাড়ি জায়গায় গেলে সাবধানতা অবলম্বন করুন—সেলফির জন্য জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন না।
২. জলে নামার আগে শরীরের অবস্থা বিবেচনা করুন
- যদি শরীরে ক্লান্তি, বুক ধড়ফড়ানি, শ্বাসকষ্ট থাকে—জলে নামা থেকে বিরত থাকুন।
- বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য সমুদ্র গোসল একেবারে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৩. দলবদ্ধভাবে ঘোরাঘুরি করুন
- পাহাড়, সাগর, বা নৌকায় গেলে অন্তত একজন যেন সবসময় পাশে থাকেন।
- প্রয়োজনে ‘ট্যুর গাইড’ বা স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিন।
৪. লাইফগার্ড বা প্রশাসনের হেল্পলাইন জেনে রাখুন
- কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত হেল্প ডেস্ক বা সিকিউরিটি নম্বরগুলো মোবাইলে সংরক্ষণ করুন।
৫. সেলফির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ জীবন
- একটা সুন্দর ছবি মুহূর্তের জন্য ট্রেন্ডিং হতে পারে, কিন্তু জীবন একবার গেলে তা ফিরে আসে না।
একটু সচেতনতা = অনেকগুলো প্রাণ বাঁচানো
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসন একাধিক বার নিরাপত্তা নিশ্চিতে উদ্যোগ নিলেও আমাদের সচেতনতা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
“সমুদ্রের ঢেউ কখন বিপদ ডেকে আনবে, তা আপনি আগে থেকে বুঝতে পারবেন না। নিরাপত্তা চিহ্ন মানা, সময়জ্ঞান রাখা আর সতর্ক থাকা—এই তিনটি বিষয়ই জীবনরক্ষার চাবিকাঠি।”
আপনার পরিবার ও বন্ধুদের জানান
এই লেখাটা পড়ার পর আপনার দায়িত্ব—সেটা শুধু নিজের জন্য না, বরং প্রিয়জনদের জন্যও। কক্সবাজারে বা যে কোনো পর্যটন স্পটে যাওয়ার আগে এই বিষয়গুলো একবার মনে করিয়ে দিন।
আপনার একটি শেয়ার, একটি সচেতন বাক্য—হয়তো কারো জীবন বাঁচাতে পারে।
ভ্রমণ মানে আনন্দ, স্বস্তি, মুক্তি। কিন্তু সেই আনন্দ যদি অসতর্কতার কারণে কষ্টে পরিণত হয়—তাহলে সেটাই সবচেয়ে বড় দুঃখ।
পরের বার যখন কক্সবাজার যাবেন, সমুদ্রের কাছে যাবেন—একবার ভাবুন, “আমার নিরাপত্তা আমারই দায়িত্ব।” কারণ আপনি নিরাপদ থাকলেই, আপনার সঙ্গে থাকা মানুষগুলোও স্বস্তিতে থাকবে।
জীবনের জন্য নিরাপত্তা হোক আপনার ট্র্যাভেল প্ল্যানের প্রথম বিষয়।