স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ থেমে গেলেন। একটি ছোট্ট বানর। দুটো ছোট হাতে আঁকড়ে ধরে আছে একটি নরম খেলনা। চোখ দুটো কোথাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেই আঁকড়ে ধরার মধ্যে এমন কিছু একটা আছে—যা আপনাকে আটকে দেয়। আর আপনি টের পান, আপনার বুকের ভেতর কোথাও কিছু একটা নড়ে উঠল।
লাখো মানুষ এই ভিডিও দেখেছে। হাজারো মানুষ কমেন্ট করেছে। অনেকে শুধু লিখেছে—”কেন আমি কাঁদছি?” কিন্তু সত্যিকার প্রশ্ন হলো—কেন এই দৃশ্য এতটা গভীরে স্পর্শ করে? একটি প্রাণীর একটি খেলনা আঁকড়ে ধরার দৃশ্যে আমরা কী দেখি, যেটা আমাদের এতটা কাঁদায়?
গল্পটা আসলে কী?
জন্মের পরেই মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সে। বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে বড় সংকট যেটা আসে—সেটা খাবারের না, আশ্রয়ের না। সেটা হলো নিরাপত্তার। সেই উষ্ণতার। সেই পরিচিত গন্ধের। সেই স্পর্শের—যেটা বলে দেয়, “তুমি একা না।”
কিন্তু মা নেই। তখন সে খুঁজে পায় একটি খেলনা। নরম, ছোট, নিরীহ একটি বস্তু। সেটা কথা বলে না। উষ্ণতা দেয় না। কিন্তু সেটা আছে। এবং সেটাকে ধরে থাকলে একটুখানি কম একা লাগে। এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ইন্টারনেটে। মানুষ দেখে। থামে। কাঁদে।
কেন এই দৃশ্য আমাদের নাড়িয়ে দেয়
মনোবিজ্ঞানীরা বহু আগেই বলেছেন—বন্ধনের প্রয়োজন শুধু মানুষের নয়, এটা প্রায় সব স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৌলিক প্রয়োজন।
১৯৫০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী Harry Harlow বানরদের নিয়ে একটি বিখ্যাত গবেষণা করেছিলেন। তিনি দেখান যে শিশু বানর খাবার দেওয়া তারের মায়ের কাছে না গিয়ে নরম কাপড়ে মোড়া নকল মায়ের কাছে বারবার ফিরে যায়। কারণ সে খাবার চায় না—সে স্পর্শ চায়। উষ্ণতা চায়। নিরাপত্তা চায়।
শিশু মনোবিজ্ঞানী Donald Winnicott এই ধারণাটিকে মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা করেছিলেন “transitional object” তত্ত্বের মাধ্যমে। ছোট শিশুরা যখন মায়ের কাছ থেকে একটু দূরে থাকে, তখন একটি নরম পুতুল, একটি কম্বলের টুকরো—এগুলো হয়ে ওঠে মায়ের প্রতিনিধি। সেই বস্তুটি আসলে সম্পর্কের একটি প্রতীক।
সেই ছোট্ট বানরটিও ঠিক এটাই করছে। সে একটি খেলনা আঁকড়ে ধরছে না—সে আসলে নিরাপত্তার ধারণাটাকে আঁকড়ে ধরছে।
আমরা কেন নিজেদের দেখতে পাই এতে
এই ভিডিও দেখে যারা কাঁদেন, তাদের বেশিরভাগই কিন্তু বানরটার জন্য কাঁদেন না। তারা কাঁদেন নিজেদের জন্য। কারণ আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে একটা জায়গা আছে—যেখানে আমরাও কোনো না কোনো সময়ে ঠিক ওই বানরটার মতোই ছিলাম। একা। ভয়ে। কাউকে খুঁজছিলাম যে ধরে রাখবে।
হয়তো ছোটবেলায়, স্কুলে প্রথম দিন। হয়তো কৈশোরে, বন্ধুরা চলে গেলে। হয়তো বড় হয়ে, কোনো সম্পর্ক ভেঙে পড়ার রাতে। হয়তো এখনও, রাতের বেলা ফোনের স্ক্রিনের আলোয়। আমাদের ভেতরে একাকীত্বের ভয় আছে। পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় আছে। এবং সেই ভয় লুকানোর জন্য আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো “খেলনা” খুঁজি—যেটা ধরে রাখলে একটু কম একা লাগে।
ডিজিটাল যুগে বিরল মানবিক মুহূর্ত
সোশ্যাল মিডিয়া সাধারণত আমাদের বিভক্ত করে। মতামতে, রাজনীতিতে, রুচিতে। প্রতিটি পোস্ট একটি বিভাজন রেখা টেনে দেয়। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু আসে—যেটা সেই রেখাগুলো মুছে দেয়। একটি ছোট বানরের ভিডিও, বয়স-লিঙ্গ-দেশ-ভাষা নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কারণ vulnerability—দুর্বলতার অনুভূতি—একটি সার্বজনীন ভাষা। এই ভাষায় অনুবাদের দরকার হয় না।
এই মুহূর্তগুলো দুর্লভ। কিন্তু যখন আসে, তখন আমরা বুঝতে পারি—মানুষ হিসেবে আমরা আসলে কতটা একই রকম।
ইন্টারনেট কেন কাঁদে
অনেকে ভাবতে পারেন—এটা তো শুধু cute বলে ভাইরাল হয়েছে। না। এর চেয়ে অনেক গভীর কিছু এখানে কাজ করছে। Cute জিনিস আমাদের হাসায়। কিন্তু এই ভিডিও মানুষকে কাঁদায়। পার্থক্যটা বিশাল।
এই ভিডিওতে যা আছে তা হলো emotional authenticity—আবেগের এমন একটি বিশুদ্ধ রূপ, যা কোনো পারফরম্যান্স না। বানরটি দেখাচ্ছে না যে সে কষ্টে আছে। সে সত্যিই কষ্টে আছে। আর সেই সত্যিটুকুই আমাদের ভেদ করে যায়।
এটা survival instinct-এর একটি নগ্ন প্রকাশ—বেঁচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য, সংযোগের জন্য আঁকড়ে ধরা। এবং সেটা দেখে আমাদের ভেতরে একটি collective empathy জেগে ওঠে—যা বলে, “আমিও এটা চিনি। আমিও এটা অনুভব করেছি।”
এই ট্রেন্ড আমাদের কী শেখায়
আমরা এমন একটি সমাজে বাস করি যেখানে দুর্বলতাকে দুর্বলতা হিসেবেই দেখা হয়—নেতিবাচক অর্থে। “কাঁদলে চলবে না।” “এত সেন্টিমেন্টাল হওয়া যাবে না।” “নিজেকে গুছিয়ে নাও।”
কিন্তু এই ভিডিও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—comfort খোঁজা দুর্বলতা না। এটা জীবনের একটি স্বাভাবিক, প্রয়োজনীয় অংশ। মানুষ হোক বা বানর—প্রত্যেকেরই এমন কিছু দরকার যেটা ধরে থাকা যায় যখন পৃথিবীটা বেশি ভারী লাগে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—সংযোগই আসল শক্তি। একা শক্তিশালী হওয়া নয়, বরং কারো সাথে যুক্ত থেকে এগিয়ে যাওয়া।
বৃহত্তর প্রশ্ন: আমরাও কি কোনো “খেলনা” আঁকড়ে আছি?
এই ভিডিও দেখার পর একটু থামুন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন— আপনার “খেলনা”টা কী?
হয়তো কাজ। কাজে ডুবে থাকলে ভাবতে হয় না। হয়তো কোনো সম্পর্ক, যেটা হয়তো ততটা সুস্থ না, কিন্তু একাকীত্বের চেয়ে ভালো মনে হয়। হয়তো পুরনো স্মৃতি, যেগুলো আঁকড়ে থেকে বর্তমান থেকে দূরে থাকা যায়। হয়তো ফোনের স্ক্রিন—রাত তিনটায়, ঘুম আসছে না, স্ক্রল করতে করতে।
আমরা সবাই কোনো না কোনো transitional object-এর সাথে বাঁচি। কিছু স্বাস্থ্যকর, কিছু নয়। কিন্তু সবগুলোর পেছনে একই প্রশ্ন—আমি কি নিরাপদ? আমি কি একা?
এই প্রশ্নগুলো জানা, স্বীকার করা—এটাই শুরু।
শেষ কথা
একটি ছোট বানর একটি খেলনা আঁকড়ে ধরেছে। আর আমরা—আমরা আমাদের অদৃশ্য নিরাপত্তাগুলো আঁকড়ে বেঁচে আছি। হয়তো এটাই মানুষ হওয়ার সবচেয়ে সৎ সংজ্ঞা। আমরা ভয় পাই। আমরা একা থাকতে ভয় পাই। আমরা কিছু না কিছু ধরে থাকি। এবং মাঝে মাঝে, লাখো মানুষের মাঝে, একটি ছোট্ট বানরের দৃশ্যে আমরা নিজেদের খুঁজে পাই—আর বুঝতে পারি, আমরা আসলে একা না।
এই লেখাটি যদি আপনাকে ভাবিয়েছে, শেয়ার করুন। কারণ কিছু কথা শুধু পড়ার না—কিছু কথা ছড়িয়ে দেওয়ার।

