একটা সময় ছিল। সেই সময়ে একটা কিছু ছিল আপনার চোখে — একটা স্বপ্ন। ছোট্ট হোক বা বড়, সেই স্বপ্নের জন্য আপনি লড়াই করেছিলেন। রাত জেগেছিলেন। নিজেকে ছোট করেছিলেন। সবকিছু সামলিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন। আর আজ?
আজ সেই একই জিনিস আপনার কাঁধে চাপের মতো বসে আছে। যেটা একসময় আনন্দ দিয়েছিল, সেটাই এখন দায় মনে হয়। যেটার জন্য এত কষ্ট করেছিলেন, সেটা এখন বোঝা মনে হয়। এই অনুভূতি কি আপনার একার নয়?
তখন একটা প্রশ্ন মাথায় আসে — মানুষ বদলেছে, নাকি প্রয়োজন বদলেছে? আসলে দুটোই হয়েছে। এবং এটা কোনো দোষের কথা নয়। এটা জীবনের একটা সত্যি কথা, যেটা আমরা বেশিরভাগ সময় বুঝতে পারি না।
জীবনের ধাপ বদলালে, প্রয়োজনও বদলায়
আমরা যখন তরুণ থাকি, তখন চাই উচ্চাকাঙ্ক্ষা। চাই প্রমাণ করার সুযোগ। নিজেকে জাহিয়ে দেওয়া, সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা — এসব ছিল আমাদের জ্বালানি। কিন্তু বয়স যখন বাড়তে থাকে, দায়িত্ব যখন কাঁধে চাপতে থাকে, অভিজ্ঞতা যখন চোখ খুলে দেয় — তখন চাহিদাটা একটু বদলে যায়।
যেটা একসময় ছিল নিজেকে বাড়ানোর পথ, সেটা এখন হয়ে উঠেছে শুধু টিকিয়ে রাখার কাজ। যেটা ছিল গ্রোথ, সেটা এখন মেইনটেন্যান্স। এবং মেইনটেন্যান্স কখনো সেই পুরোনো আনন্দ দেয় না। এটা কোনো অস্বাভাবিক কথা নয়। জীবনের প্রত্যাশা বদলানো মানে আপনি থেমে গেছেন না — বরং আপনি এগিয়ে গেছেন। এমনভাবে এগিয়ে গেছেন যে পুরোনো রাস্তাটা এখন আর আপনার পথ নয়।
স্বপ্ন পূরণ মানেই শান্তি নয়
আমরা সবসময় ভাবি — যদি এই স্বপ্নটা পূরণ হয়, তাহলে শান্তি আসবে। অনেক কষ্টের পর, অনেক সংগ্রামের পর, সেই দিনটা আসে। স্বপ্নটা পূরণ হয়। কিন্তু সেই শান্তি? সেটা আসে না সেভাবে যেভাবে আমরা ভেবেছিলাম।
কারণ স্বপ্ন পূরণের সাথে সাথে আসে দায়িত্ব। আসে প্রত্যাশা। আসে মানুষের নজর। যেটা একসময় ছিল শুধু আপনার, এখন সেটা সবার। আর যখন সবার হয়, তখন স্বাধীনতাটা কমে যায়। এই “পাওয়ার পরের বাস্তবতা” আমরা কখনো আগে থেকে কল্পনা করি না। আমরা শুধু পেতে চাই। পাওয়ার পর কী হবে — সেটা নিয়ে কেউ ভাবে না। আর এই না ভাবা থেকেই শুরু হয় সেই অন্দর অন্দর ক্লান্তি।
অভ্যাস কীভাবে বোঝা হয়ে ওঠে
একসময় একটা অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ে সেটা ছিল দরকারি। হয়তো সেটা আপনাকে এগিয়ে নিয়েছিল, হয়তো আপনাকে বাঁচিয়েছিল। কিন্তু সময় বদলায়। প্রয়োজন বদলায়। আর সেই অভ্যাসটা বদলায় না।
এটা একই রুটিনে আটকে থাকে। প্রতিদিন একই কাজ, একই চিন্তা, একই ধরনের জীবন। আর একটা সময় বুঝতে পারেন যে এই অভ্যাসটা আর আপনার কোনো কাজ দিচ্ছে না। বরং সময় নিচ্ছে। শক্তি নিচ্ছে। আনন্দ দেয় না। কিন্তু ছাড়তে পারেন না। কারণ এটা এত পরিচিত। এত পরিচিত যে, এটা ছাড়া নিজেকে চেনা কঠিন মনে হয়। এই পরিচিতির ভয়ই বলে দেয় — এই অভ্যাসটা কতটা গভীরে বসে গেছে।
সমাজের চাপ ও পরিচয়ের বোঝা
আপনি যখন একটা কিছু শুরু করেন, মানুষ তখন আপনাকে সেটা দিয়ে চেনে। আপনার চারপাশের মানুষ একটা পরিচয় তৈরি করে আপনার চারদিকে। এবং সেই পরিচয়টা সময়ের সাথে এত শক্তিশালী হয় যে, আপনি নিজেও তার মধ্যে হারিয়ে যান।
এখন যদি আপনি সেই পরিচয় থেকে বের হতে চান — মানুষ বুঝতে পারে না। হয়তো বলে, “এত বছর করেছিলে, এখন কেন ছাড়তে চাইছ?” হয়তো মনে হয় অপরাধী। এই অপরাধবোধ আসে ভেতর থেকে। কারণ আমরা ভাবি — মানুষ যে চায়, সেটাই করা উচিত। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো — আপনার ভেতরের মানুষটা কী চায়? সেই চাওয়া আর বাইরের প্রত্যাশা যখন মেলে না, তখনই শুরু হয় এই তিক্ত অনুভূতি।
কেন আমরা পরিবর্তন মানতে চাই না
পরিবর্তনের কথা ভাবলে মনের ভেতরে একটা ভয় জাগে। কারণ পরিবর্তন মানে — পুরোনো সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল, এটা মানা। আর এটা মানা কঠিন। বিশেষ করে যখন সেই সিদ্ধান্তের জন্য আপনি অনেক কিছু দিয়েছেন।
“এত বছর দিয়েছি এই পথে। এত সময় দিয়েছি। এখন বদলালে মানে সব বেকার হয়ে যাবে।” — এই চিন্তাটা ভেতরে ঘুরতে থাকে। কিন্তু এটা একটা ফাঁদ। এই চিন্তাটা আপনাকে সেই জায়গায় আটকিয়ে রাখে যেখানে আপনি আর সুখী নন। কারণ সত্যি হলো — পুরোনো সময়ে সেই সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। কিন্তু আজকের আপনার জন্য সেটা ঠিক কিনা, এটা আলাদা প্রশ্ন।
আর স্থিতিশীলতাও ধীরে ধীরে একটা মিথ্যা নিরাপত্তা দেয়। মনে হয় — “এখানে তো আমি চিনি সব কিছু। অন্য কোথাও গেলে অজানা।” কিন্তু এই “চেনা” জায়গাটাই যখন শান্তি দেয় না, তখন সেই নিরাপত্তা আসলে কতটুকু আসল?
বোঝা লাগার লক্ষণগুলো
কিছু লক্ষণ আছে, যেগুলো বলে দেয় — এই জিনিসটা এখন আর আপনার জন্য নয়।
প্রথমত, আগ্রহ কমে যায়। যেটা একসময় করতে ইচ্ছে করতো, সেটা এখন শুধু করার জন্য করেন। কোনো উৎসাহ নেই। কোনো আনন্দ নেই। শুধু দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, এই দায়িত্ব থেকে ভাগ হয়ে যেতে মনে চায়। প্রতিদিন ভেতরে একটা কণ্ঠস্বর বলে — “আর পারছি না।” আপনি থামিয়ে রাখেন। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর থামায় না।
তৃতীয়ত, নিজের থেকে নিজে দূরত্ব তৈরি হয়। আপনি নিজেকে চেনেন না যেন। যেটা আপনার মনে চায়, সেটা করতে পারেন না। আর যেটা করেন, সেটা মনের চাওয়া নয়। এই দূরত্ব — এই অস্বস্তি — এটাই বলে দেয় যে কিছু একটা বদলানোর সময় হয়েছে।
ছেড়ে দেওয়া মানেই ব্যর্থতা নয়
এখানে একটা কথা বলা দরকার। একটা বিশ্বাস আছে আমাদের মধ্যে — যদি কিছু ছেড়ে দিই, তাহলে আমি বেইমানী। আমি দুর্বল। আমি হেরে গেছি। কিন্তু এটা সত্যি নয়।
যেটা আপনি আগে চেয়েছিলেন, সেটা চেয়েছিলেন কারণ তখনকার আপনার সেটাই দরকার ছিল। আর এখন যেটা বদলে যাচ্ছে, সেটা বদলছে কারণ আপনি বেড়ে উঠেছেন। এটা বাড়ানো, হেরে যাওয়া নয়। প্রয়োজন বদলানো মানে দুর্বলতা নয় — এটা সচেতনতা। এটা নিজেকে চেনার সাহস। জীবনের নতুন ধাপে নতুন ভারসাম্য খোঁজা — এটাই পরিপক্বতা।
কীভাবে বুঝবেন — সময় এসেছে বদলানোর
তিনটা কথা মনে রাখুন।
শরীর মানছে না। শরীর সবার আগে সত্যি বলে। যখন প্রতিদিন ক্লান্তি, ঘুম ভালো নেই, শরীর ভেতর থেকে বলছে “থামাও” — তখন শুনুন।
মন আগ্রহ পাচ্ছে না। যেটা করেন, সেটা শুধু দায়ের কারণে করেন। ভেতরে আর কোনো স্পার্ক নেই। কোনো কৌতূহল নেই। শুধু একটা অবসন্ন অনুভূতি।
মূল্যবোধের সাথে মিল নেই। আপনি যা বিশ্বাস করেন, যা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ — সেটার সাথে যেটা করছেন তার মিল নেই। এই অমিল — এই ভেতরের টান — এটাই সবচেয়ে বড় লক্ষণ।
সবকিছু আজীবন বহন করার জন্য নয়
জীবন মানে পরিবর্তন। এটা থামার গল্প নয়, বদলানোর গল্প। একসময় যা দরকার ছিল — তা হয়তো আজ দরকার নেই। আর এটা স্বীকার করা কোনো পাপ নয়। বরং এটা সবচেয়ে সৎ কাজ।
নিজেকে হালকা করা — এই সাহসটাই আসল পরিণত সিদ্ধান্ত। কারণ যা আপনাকে আটকে রাখছে, তা বহন করে যাওয়া সহজ। কিন্তু সেটা ছেড়ে দেওয়া, এবং নতুন কিছুর দিকে এগিয়ে যাওয়া — এটা সাহসের কাজ। আপনি যেটা ছেড়ে দেবেন, সেটা আপনার জীবনের অংশ ছিল। সেটা আপনাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন। কিন্তু এখন আপনার হাত খুলে দেওয়ার সময়। কারণ আপনার হাত যদি ভরা থাকে, নতুন কিছু তুলে নেওয়ার জায়গা থাকে না।
যা একসময় আপনাকে গড়ে তুলেছিল, তা আজ আপনাকে আটকে রাখতেই পারে — এটাই জীবন।

