মনে আছে ছোটবেলায় কী হতে চেয়েছিলাম? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট, লেখক—যা-ই হোক না কেন, স্বপ্নটা ছিল বিশাল। চোখ বন্ধ করলে দেখতে পেতাম নিজেকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে, পুরস্কার নিচ্ছি, সবাই হাততালি দিচ্ছে। কোনো সীমা ছিল না, কোনো ভয় ছিল না। শুধু একটা প্রবল বিশ্বাস ছিল—”আমি পারব।”
কিন্তু এখন? এখন শুধু চাই একটা স্থির চাকরি থাক, মাসে মাসে বেতন আসুক, পরিবার চলুক, কোনো ঝামেলা না হয়। বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখি না আর। এমনকি যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, “তোমার স্বপ্ন কী?”—উত্তরটা এখন হয় “চলে গেলেই হলো।”
স্বপ্ন ছোট হয়েছে নাকি সাহস কমেছে? এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যে মাথায় ঘুরপাক খায়। কিন্তু কেন এমন হয়? কেন বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের স্বপ্নগুলো সংকুচিত হতে থাকে?
বয়স বাড়ার সাথে সাথে কী বদলায়
বয়স বাড়ার সাথে সাথে জীবনের সমীকরণটা জটিল হয়ে যায়। দায়িত্ব বাড়ে—বাবা-মায়ের দেখাশোনা, নিজের পরিবার, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়ি ভাড়া, ইএমআই, চিকিৎসা খরচ। তালিকাটা যত লম্বা হয়, স্বপ্নের জায়গাটা তত ছোট হতে থাকে।
ঝুঁকি নেওয়ার জায়গা কমে যায়। কুড়ি বছর বয়সে চাকরি ছেড়ে নতুন কিছু শুরু করা মানে ছিল একটা রোমাঞ্চ। কিন্তু চল্লিশে? তখন এটা মানে হয় পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে জুয়া খেলা। ব্যর্থতার মূল্য বেড়ে যায়। ব্যর্থ হলে শুধু নিজে পড়ি না, সাথে থাকে আরও কয়েকজন যারা আমার ওপর নির্ভরশীল।
আর তাই নিরাপত্তা হয়ে ওঠে অগ্রাধিকার। স্বপ্ন দেখার চেয়ে বেঁচে থাকাটা জরুরি হয়ে পড়ে।
স্বপ্ন ছোট হয় না—ভয় বড় হয়
আসল কথাটা হলো, স্বপ্ন আসলে ছোট হয় না। ভয়টাই বড় হয়ে যায়। পরিবারের কথা ভাবি—তাদের ছেড়ে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটি কীভাবে? অর্থের চিন্তা আসে—এত বয়সে নতুন করে শুরু করে কী হবে? সামাজিক চাপ থাকে—লোকে কী বলবে?
“এখন আর সময় নেই” এই বিশ্বাসটা মনের ভেতর গেঁথে যায়। মনে হতে থাকে, স্বপ্ন পূরণের একটা নির্দিষ্ট বয়স আছে। সেই বয়স পার হয়ে গেলে আর কিছু করার নেই। কিন্তু এটা একটা ভুল ধারণা। দেরি মানেই শেষ নয়। দেরিতে শুরু করা মানে শুধু একটা ভিন্ন পথ।
সমাজ কীভাবে আমাদের স্বপ্ন রিসাইজ করে
আমাদের সমাজে বয়স অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট জীবন “উচিত” বলে মনে করা হয়। পঁচিশে চাকরি, ত্রিশে বিয়ে, পঁয়ত্রিশে সন্তান, চল্লিশে একটা বাড়ি—এই হলো সফলতার টাইমলাইন। এর বাইরে গেলেই মনে হয় পিছিয়ে পড়েছি।
নির্দিষ্ট টাইমলাইনের এই চাপটা আমাদের স্বপ্নকে ছাঁচে ফেলে দেয়। নিজের ইচ্ছার চেয়ে সমাজের প্রত্যাশা বড় হয়ে ওঠে। আর তুলনার সংস্কৃতি তো আছেই। ফেসবুকে বন্ধুর বিদেশ ভ্রমণ, লিংকডইনে সহপাঠীর পদোন্নতি—এসব দেখে মনে হয়, আমিই শুধু পিছিয়ে আছি।
এই তুলনা, এই চাপ, এই অদৃশ্য নিয়মকানুন—সব মিলিয়ে আমাদের স্বপ্নকে রিসাইজ করে ফেলে। যা ছিল বিশাল, তা হয়ে যায় নিরাপদ।
বাস্তববাদ বনাম আত্মসমর্পণ
অনেকে বলে, “বয়স হয়েছে, এখন বাস্তববাদী হতে হবে।” এই কথাটা সত্যি। কিন্তু বাস্তববাদ আর আত্মসমর্পণ এক জিনিস নয়। বাস্তববাদ মানে পরিকল্পনা করা। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে, সম্পদ দেখে, সময় হিসাব করে এগিয়ে যাওয়া। বাস্তববাদী মানুষ জানে কীভাবে ছোট ছোট পদক্ষেপে বড় লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়।
আর আত্মসমর্পণ মানে আগেই হাল ছেড়ে দেওয়া। চেষ্টা না করেই বলে ফেলা, “এটা আমার জন্য নয়।” নিজেকে বোঝানো, “স্বপ্ন দেখার বয়স পার হয়ে গেছে।” এই দুইটার পার্থক্য না বোঝার ক্ষতিটা বিশাল। আমরা ভাবি বাস্তববাদী হচ্ছি, কিন্তু আসলে আত্মসমর্পণ করছি।
যারা স্বপ্ন ধরে রাখে, তারা আলাদা কেন
কিছু মানুষ আছে যারা বয়স বাড়লেও স্বপ্ন ছাড়ে না। তারা আলাদা কেন? কারণ তারা বয়সকে শেষ মনে করে না, শুরু মনে করে। তারা গতি বদলায়, স্বপ্ন বদলায় না। বুঝে যায় যে কুড়ির উন্মাদনায় যা করা যায়, চল্লিশে তা করতে হয় ধীরে, পরিকল্পিতভাবে। কিন্তু থামে না।
তারা বড় স্বপ্নকে ছোট পদক্ষেপে ভাগ করে। একবারে শিখর ছোঁয়ার চেষ্টা না করে, প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা নিজের গল্পকে অন্যের সাথে তুলনা করে না। জানে যে, প্রত্যেকের পথ আলাদা, গতি আলাদা, সময় আলাদা।
স্বপ্ন ছোট হওয়ার লক্ষণ
কীভাবে বুঝব স্বপ্ন ছোট হয়ে যাচ্ছে? কয়েকটা লক্ষণ আছে।
প্রথমত, নিজেকে বারবার বোঝাতে থাকি, “এতেই খুশি থাকা উচিত।” যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকা ভালো, কিন্তু যদি সেটা বলার পেছনে থাকে দমে যাওয়া মনোভাব, তাহলে সেটা স্বপ্ন ছোট হওয়ার লক্ষণ।
দ্বিতীয়ত, নতুন কিছু চাইতে অপরাধবোধ হয়। মনে হয় এত বয়সে নতুন স্বপ্ন দেখাটা লোভ, স্বার্থপরতা। কিন্তু বেড়ে ওঠা, শেখা, এগিয়ে যাওয়া—এগুলো বয়সের ব্যাপার নয়।
তৃতীয়ত, আগ্রহ কমে যায়। নতুন কিছু শিখতে, করতে, দেখতে আর ভালো লাগে না। মনে হয়, “যা হবার হয়ে গেছে।” এটাই সবচেয়ে বড় লক্ষণ।
বয়স অনুযায়ী স্বপ্নের রূপ বদলানো যায়
এটা মেনে নিতে হবে যে বিশের স্বপ্ন আর চল্লিশের স্বপ্ন এক হবে না। বিশে হয়তো চেয়েছিলাম পুরো পৃথিবী ঘুরব, চল্লিশে হয়তো চাই বছরে একটা শান্ত জায়গায় যেতে। দুটোই স্বপ্ন, রূপ আলাদা।
কিন্তু অর্থটা এক থাকে। অর্থাৎ, স্বপ্নের ভেতরের সেই আকাঙ্ক্ষা, সেই চাওয়া, সেই উদ্দেশ্য—সেটা ঠিক থাকে। বয়স বাড়লে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, সমন্বয় দরকার। নিজের সাথে, পরিস্থিতির সাথে, জীবনের সাথে মিলিয়ে স্বপ্নকে সাজাতে হয়।
উচ্চাভিলাষী হতে হবে না, কিন্তু জীবন্ত থাকতে হবে। এটাই আসল কথা।
আবার বড় করে ভাবার পাঁচটি বাস্তব উপায়
যদি মনে হয় স্বপ্ন ছোট হয়ে গেছে, আবার বড় করে ভাবার কিছু উপায় আছে।
এক. স্বপ্ন নয়, অনুভূতি লিখুন। স্বপ্নের তালিকা না বানিয়ে লিখুন কেমন অনুভব করতে চান। শান্তি? উত্তেজনা? গর্ব? তারপর সেই অনুভূতির দিকে এগোনোর ছোট ছোট পথ খুঁজুন।
দুই. “যদি না ভয় পেতাম” প্রশ্ন করুন। যদি ব্যর্থতার ভয় না থাকত, অর্থের চিন্তা না থাকত, লোকের কথার ভয় না থাকত—তাহলে কী করতে চাইতেন? এই প্রশ্নটা নিজেকে করুন। উত্তরটা জানালা খুলে দেবে।
তিন. ছোট, ঝুঁকিমুক্ত পরীক্ষা করুন। চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করার স্বপ্ন আছে? প্রথমে সপ্তাহান্তে একটা ছোট প্রজেক্ট শুরু করুন। লেখক হতে চান? প্রতিদিন দশ মিনিট লিখুন। বড় লাফ না দিয়ে ছোট ছোট পা ফেলুন।
চার. বয়স নয়, শক্তি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন। বয়স একটা সংখ্যা মাত্র। আসল প্রশ্ন হলো—আপনার কি এখনও শক্তি আছে? সময় আছে? ইচ্ছা আছে? থাকলে বয়স বাধা নয়।
পাঁচ. নিজের গতিতে চলুন। অন্যের সাথে তুলনা বন্ধ করুন। কেউ দ্রুত এগিয়েছে তো কী হয়েছে? আপনার পথ, আপনার গতি। মাপকাঠি হোক নিজের অগ্রগতি, অন্যের সাফল্য নয়।
স্বপ্ন বয়স দেখে ছোট হয় না
শেষ কথা হলো, স্বপ্ন বয়স দেখে ছোট হয় না। স্বপ্ন ছোট হয় যখন আমরা নিজেকে ছোট ভাবি। যখন মনে করি, “এই বয়সে আর কী হবে?” যখন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি নিজের ওপর। বয়স আসলে অভিজ্ঞতা দেয়। দেয় পরিপক্বতা, ধৈর্য, বোঝার ক্ষমতা। যদি এর সাথে যোগ হয় সাহস, তাহলে বয়সই শক্তি হয়ে যায়। তরুণদের আছে উদ্যম, আর আমাদের আছে প্রজ্ঞা। দুটো মিলিয়ে যে যাত্রা, তা অনেক বেশি টেকসই।
তাই মনে রাখবেন—
“স্বপ্ন ছোট হয় না বয়সে, ছোট হয় যখন আমরা নিজেকে থামিয়ে দিই।”
আপনার স্বপ্ন এখনও জীবিত। শুধু একটু ধুলো ঝেড়ে ফেলুন। আবার দেখুন। আবার বিশ্বাস করুন। এখনও দেরি হয়নি।

