back to top
বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬
HomeWellbeingশীতে অ্যাজমা ও COPD নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবনযাত্রায় যেসব পরিবর্তন জরুরি

শীতে অ্যাজমা ও COPD নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবনযাত্রায় যেসব পরিবর্তন জরুরি

শীত আমাদের অনেকের কাছে আরাম, উৎসব আর উষ্ণতার মৌসুম।

কিন্তু অ্যাজমা বা COPD (Chronic Obstructive Pulmonary Disease) রোগীদের জন্য শীত মানেই এক বিশেষ চ্যালেঞ্জ। কারণ, ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাস—শ্বাসনালিকে সংকুচিত করে, মিউকাস জমার পরিমাণ বাড়ায় এবং হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানির অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশের আবহাওয়া শীতকালে তুলনামূলক শুষ্ক থাকে, পাশাপাশি ধুলা, স্মগ, ইটভাটার ধোঁয়া এবং যানবাহনের দূষণ—সব মিলিয়ে অ্যাজমা ও COPD রোগীরা বেশি ভুগেন।

কিছু সচেতন জীবনযাত্রার পরিবর্তন করলে শীতকাল একেবারেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে হয় না। বরং নিয়ম মেনে চললে পুরো মৌসুমটাই কাটানো যায় অনেকটাই স্বাভাবিকভাবে। আজকে জানবো শীতে অ্যাজমা ও COPD নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী কী করণীয় এবং কীভাবে সহজ অভ্যাসগুলো আপনার শ্বাস নেওয়ার সামর্থ্যকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

১. বাইরে বের হলে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন—ঠান্ডা বাতাস সরাসরি ফুসফুসে ঢুকতে দেবেন না

শীতের হাওয়া ফুসফুসের ভেতরের পথকে সংকুচিত করে। তাই বাইরে বের হলে অবশ্যই—

  • মাস্ক

  • স্কার্ফ

  • বা উলেন কাপড়

দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন।

এতে শ্বাস নেওয়া বাতাস কিছুটা উষ্ণ ও আর্দ্র হয়ে ফুসফুসে ঢোকে, যা অ্যাটাকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

কেন জরুরি!

গবেষণায় দেখা গেছে, ঠান্ডা বাতাস শ্বাসনালির smooth muscle-কে সংকুচিত করে bronchospasm তৈরি করে—যা অ্যাজমা রোগীর হঠাৎ শ্বাসকষ্টের অন্যতম প্রধান কারণ।

২. ঘরের ভেতর আর্দ্রতা বজায় রাখুন—শুষ্ক বাতাসে শ্বাসনালি বেশি উত্তেজিত হয়

শীতে ঘরের বাতাস সাধারণত শুষ্ক হয়ে যায়, বিশেষ করে দরজা-জানালা বন্ধ থাকলে।
এই শুষ্কতা শ্বাসনালীকে উত্তেজিত করে কাশি, হুইজিং ও শ্বাসকষ্ট বাড়ায়।

ঘরে একটি হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন,

পানি ভর্তি একটি বাটি কোণায় রাখতে পারেন,

রোজ ভেজা কাপড় ঘরে রাখলে আর্দ্রতা কিছুটা বাড়ে।

আদর্শ আর্দ্রতা: ৪০–৫০%

৩. ধুলা-ময়লা ও দূষণ কমান—ট্রিগারগুলো নিয়ন্ত্রণ করাই সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধ

বাংলাদেশে শীতকালে ধুলা ও বায়ুদূষণ অনেক বেশি থাকে।
ধুলা হলো অ্যাজমা ও COPD রোগীদের সবচেয়ে বড় ট্রিগার।

কী করবেন?

  • ঘরের কার্পেট পরিষ্কার রাখুন (ধুলা জমে বেশি)

  • বিছানার চাদর সপ্তাহে দু’বার ধুয়ে ফেলুন

  • জানালা খুলে পরিষ্কারের সময় মাস্ক পরুন

  • ঘরে ঝাড়ু না করে মপ ব্যবহার করুন

  • ঘরের মেঝে রোজ পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন

এক্সপার্টরা বলেন—ট্রিগার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অ্যাটাকের ঘটনা ৬০% কমে।

৪. নিয়মিত শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম—ফুসফুসকে আরও শক্তিশালী করে

অ্যাজমা ও COPD রোগীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর জীবনযাত্রার পরিবর্তন হলো ব্রিদিং এক্সারসাইজ

জনপ্রিয় ৩টি কার্যকর ব্যায়াম:

১. Pursed Lip Breathing

নাক দিয়ে ধীর শ্বাস নিন, ঠোঁট সঙ্কুচিত করে ধীরে ছাড়ুন।

শ্বাসনালির চাপ কমিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়।

২. Diaphragmatic Breathing (Belly Breathing)

শ্বাস নেওয়ার সময় পেট ফুলিয়ে নিতে হবে, বুক নয়।

ফুসফুসের নিচের অংশ সক্রিয় হয়।

৩. Box Breathing

৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন → ৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন → ৪ সেকেন্ড শ্বাস ছাড়ুন → ৪ সেকেন্ড বিরতি
এটি শ্বাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং উদ্বেগ কমায়।

রোজ ১০ মিনিট অনুশীলন করলে শ্বাস নেওয়া আরও স্বচ্ছন্দ হয় এবং ফুসফুসের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ে।

৫. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার বা ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করুন

অনেকেই শীতে একটু ভালো অনুভব করলে ইনহেলার ব্যবহার কমিয়ে দেন।
এটা ভুল।

অ্যাজমা এবং COPD দুই রোগই লং-টার্ম ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন।
নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার না করলে শীতের অল্প পরিবর্তনেও অ্যাটাক হতে পারে।

মনে রাখুন:

Rescue inhaler (যা সাথে রাখবেন)

Controller inhaler (যা নিয়মিত ব্যবহার করতে হবে)

দুটোরই ভূমিকা আলাদা।

৬. ইমিউনিটি শক্ত রাখুন—কারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শ্বাসকষ্ট ৪ গুণ বাড়ে

শীতে সর্দি-কাশি বেশি হয়, আর যেকোনো ভাইরাস অ্যাজমা বা COPD-কে দ্রুত খারাপ করে দিতে পারে। তাই আপনাকে সিজনের মধ্যে ইমিউনিটি শক্ত রাখতে হবে।

কীভাবে করবেন?

  • প্রতিদিন উষ্ণ পানি পান

  • পর্যাপ্ত ঘুম (৭–৮ ঘণ্টা)

  • ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল (কাগজি লেবু, কমলা, পেয়ারা)

  • প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার

  • ধূমপান পুরোপুরি বন্ধ

ধূমপান COPD রোগীদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ট্রিগার—এটি ফুসফুসের কোষ দ্রুত নষ্ট করে।

৭. সকালের কুয়াশা, ধোঁয়া ও ধুলাবালির সময় বাইরে যাওয়া কমান

শীতের ভোরবেলা পরিবেশ থাকে বেশি দূষিত, বিশেষত ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের মতো শহরে।

সকাল ৯টার আগে ভারী হাঁটাহাঁটি বা দৌড়ানো এড়িয়ে চলুন,

রাস্তার পাশে ব্যায়াম করবেন না,

ট্রাফিক ঘন এলাকায় হাঁটার বদলে ঘরের ভেতর হালকা স্ট্রেচিং করুন।

এতে ট্রিগারের মাত্রা অনেকটাই কমে।

সচেতন জীবনযাপনই অ্যাজমা ও COPD নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র

অ্যাজমা বা COPD আপনার জীবনের গতি থামিয়ে দিতে পারে—যদি আপনি সতর্ক না হন।
কিন্তু সুখবর হলো—রোগের প্রকৃতি বদলানো না গেলেও, জীবনযাপনের পরিবর্তন করে রোগকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

সঠিকভাবে ইনহেলার ব্যবহার,

ধুলা ও ঠান্ডা থেকে সুরক্ষা,

নিয়মিত শ্বাস ব্যায়াম,

পরিবেশগত ট্রিগার এড়িয়ে চলা,

শক্তিশালী ইমিউনিটি বজায় রাখা।

এই অভ্যাসগুলো মেনে চললে শীতকাল আর আতঙ্কের সময় নয়—বরং পুরো মৌসুমটাই কাটবে অনেক স্বাভাবিকভাবে, স্বচ্ছন্দে।

মনে রাখবেন—আপনার ফুসফুস আপনার জীবনকে চালায়। ওকে যত্ন নিন, ও আপনাকে জীবনটা সহজ করে দেবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular