মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
HomeWellbeingআপনার রক্তে বেঁচে থাকুক কারও পৃথিবী

আপনার রক্তে বেঁচে থাকুক কারও পৃথিবী

রাত তিনটা। হাসপাতালের করিডোরে একজন মা মেঝেতে বসে আছেন। হাতে একটা ছোট্ট চিরকুট, যাতে লেখা “B+ রক্ত লাগবে, জরুরি।” তাঁর মেয়ের বয়স সাত। ডেঙ্গুর প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে। ডাক্তার বলেছেন, সকালের আগে রক্ত না পেলে ঝুঁকি বাড়বে।

মা একে একে ফোন করছেন আত্মীয়দের, প্রতিবেশীদের, পুরনো বন্ধুদের। কেউ ঢাকার বাইরে, কেউ অসুস্থ, কেউ ফোনই ধরছেন না।

ঠিক সেই মুহূর্তে এমন একজন মানুষের কথা ভাবুন, যাঁকে এই মা কোনোদিন দেখেননি, চিনবেনও না। যিনি তিন মাস আগে কোনো এক শুক্রবার দুপুরে এক ঘণ্টা সময় বের করে রক্ত দিয়েছিলেন। হয়তো তিনি তখন জানতেনও না, সেই এক ব্যাগ রক্ত কার ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখবে। আপনিও সেই মানুষটি হতে পারেন।

প্রতি দুই সেকেন্ডে একজন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতি দুই সেকেন্ডে কারও না কারও রক্ত প্রয়োজন হয়। দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ, ক্যান্সারের চিকিৎসা, থ্যালাসেমিয়া, ডেঙ্গু, সবখানেই রক্ত লাগে।

এখানে একটা কঠিন সত্য আছে: রক্ত কোনো কারখানায় তৈরি করা যায় না। ল্যাবে বানানো যায় না, কিনে এনে মজুত করারও সীমা আছে, কারণ রক্ত সংরক্ষণের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। লাল রক্তকণিকা সাধারণত প্রায় ৪২ দিন পর্যন্ত রাখা যায়, আর প্লাটিলেট রাখা যায় মাত্র কয়েক দিন। অর্থাৎ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক ভরা থাকে কেবল তখনই, যখন মানুষ নিয়মিত রক্ত দিতে আসে।

WHO-র সুপারিশ হলো, একটি দেশের উচ্চ আয়ের পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে জনসংখ্যার অন্তত ১ শতাংশ মানুষ নিয়মিত রক্তদাতা হওয়া দরকার। অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশেই এই লক্ষ্যমাত্রা এখনো পূরণ হয়নি।

বাংলাদেশের চেহারাটা কেমন?

বাংলাদেশে রক্তের চাহিদার একটা বড় অংশ পূরণ হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আর রোগীর স্বজনদের মাধ্যমে। এর মধ্যে সন্দানী, বাঁধন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা রাতবিরাতে ছুটে যাচ্ছেন কারও জন্য রক্ত জোগাড় করতে।

কিন্তু সমস্যা হলো, এই ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো “জরুরি অবস্থার ওপর নির্ভরশীল”। রোগী ভর্তি হওয়ার পর পরিবার দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। অথচ নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে সেই আতঙ্কের রাতগুলো অনেক কমে যেত।

(বাংলাদেশের নির্দিষ্ট সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে যাচাই করে নেওয়া ভালো।)

“রক্ত দিলে দুর্বল হয়ে যাব”, সত্যিই কি?

আমাদের সমাজে রক্তদান নিয়ে কিছু ভুল ধারণা এখনো গেঁথে আছে। আসুন একটু বিজ্ঞানের চোখে দেখি।

ভুল ধারণা ১: রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।

একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে গড়ে প্রায় ৫ লিটার রক্ত থাকে। এক ব্যাগে নেওয়া হয় সাধারণত ৩৫০-৪৫০ মিলিলিটার। শরীর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তরলের ঘাটতি পূরণ করে নেয়, আর লোহিত রক্তকণিকা পুরোপুরি ফিরে আসতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে।

ভুল ধারণা ২: রক্ত দিলে রোগ হতে পারে।

প্রতিটি রক্তদানে নতুন, জীবাণুমুক্ত, একবার-ব্যবহারযোগ্য সুচ ও ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। দাতার সংক্রমণের ঝুঁকি নেই বললেই চলে।

ভুল ধারণা ৩: নারীরা রক্ত দিতে পারেন না।

সুস্থ নারীরাও রক্ত দিতে পারেন, তবে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক থাকা জরুরি। নারীদের ক্ষেত্রে রক্তদানের মধ্যবর্তী বিরতি পুরুষদের চেয়ে কিছুটা বেশি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ভুল ধারণা ৪: “আমার একার রক্তে কী-ই বা হবে?”

এটাই সবচেয়ে বড় ভুল। এক ব্যাগ রক্ত আলাদা করে লাল রক্তকণিকা, প্লাটিলেট ও প্লাজমায় ভাগ করা যায়। অর্থাৎ একজন দাতার একবারের দানে একাধিক রোগীর প্রাণ বাঁচতে পারে।

কে দিতে পারবেন?

সাধারণ নিয়মে, যিনি দিতে পারেন:

– বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে

– ওজন কমপক্ষে ৫০ কেজি

– হিমোগ্লোবিনের মাত্রা পর্যাপ্ত

– সম্পূর্ণ সুস্থ, জ্বর বা সংক্রমণ নেই

পুরুষেরা সাধারণত ৩-৪ মাস পর পর রক্ত দিতে পারেন। নারীদের ক্ষেত্রে বিরতি আরেকটু বেশি। তবে নির্দিষ্ট শর্ত ও বিরতি সংস্থাভেদে সামান্য আলাদা হতে পারে, তাই রক্তদানের আগে সংশ্লিষ্ট ব্লাড ব্যাংকের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

যে উপহার ফেরত চাওয়া যায় না

রক্তদান অদ্ভুত একটা কাজ। এখানে আপনি জানেন না কাকে দিচ্ছেন। গ্রহীতাও জানেন না কার কাছে ঋণী। কোনো ধন্যবাদ-বার্তা আসে না, কোনো ছবি তোলার মঞ্চ থাকে না।

তবু এই নামহীন, মুখহীন দানের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় সবচেয়ে গভীর মানবিক বন্ধন। কোনো এক সন্তান মায়ের কোলে ফিরে যায়। কোনো এক বাবা অস্ত্রোপচারের টেবিল থেকে উঠে আবার পরিবারের পাশে দাঁড়ান। কোনো এক থ্যালাসেমিয়া শিশু আরও একটা মাস স্কুলে যেতে পারে।

আর এর পেছনে থাকে এমন একজন মানুষ, যিনি শুধু একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, “আজ আমি যাব।”

আজ থেকেই শুরু করুন

– নিজের রক্তের গ্রুপ জেনে নিন। জরুরি মুহূর্তে এই তথ্য অমূল্য।

– প্রথমবার যেতে ভয় লাগলে বন্ধুকে সঙ্গে নিন। একসঙ্গে গেলে সাহস বাড়ে।

– কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যুক্ত হোন। ক্যাম্পাসে, পাড়ায়, অফিসে ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প আয়োজন করুন।

– ভুল ধারণা ছড়াতে দেবেন না। পরিবারের কেউ ভয় পেলে ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে বলুন।

– পরের তারিখটা ফোনে লিখে রাখুন, যেন নিয়মিত দাতা হয়ে উঠতে পারেন।

আমরা প্রায়ই ভাবি, পৃথিবী বদলাতে বড় কিছু করতে হয়। বড় পদ, বড় অর্থ, বড় মঞ্চ। কিন্তু কখনো কখনো পৃথিবী বদলে যায় একটা ছোট্ট ব্যাগে। যার ভেতরে থাকে আপনার শরীরের কয়েকশো মিলিলিটার লাল তরল, আর অন্য কারও জন্য আরেকটা সকাল।

সেই রাতে হাসপাতালের করিডোরে বসে থাকা মায়ের ফোনটা হয়তো কখনোই আপনার কাছে আসবে না। কিন্তু আপনার দেওয়া রক্ত ঠিকই পৌঁছে যাবে তাঁর মেয়ের শিরায়। আপনার রক্তে বেঁচে থাকুক কারও পৃথিবী। কারণ কারও কাছে, আপনি সেই অচেনা মানুষটিই, যাঁর জন্য সে আজও বেঁচে আছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular