back to top
বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৭, ২০২৬
HomeBusinessInsights৫ বছরে ১ কোটি চাকরি, বাংলাদেশে এত কাজ আসবে কোথা থেকে?

৫ বছরে ১ কোটি চাকরি, বাংলাদেশে এত কাজ আসবে কোথা থেকে?

সরকার একটা বড় লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হবে। সংখ্যাটা শুনতে আশাব্যঞ্জক, কিন্তু প্রশ্নটা হলো, এই চাকরিগুলো আসবে কোথা থেকে, আর সেগুলো আদৌ মানসম্মত হবে কিনা। The Daily Star-এর একটা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই লক্ষ্যের পেছনের হিসেবটা যতটা না শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করছে একটা আশাবাদী অনুমানের ওপর।

লক্ষ্যটা আসলে কী

সরকারের Five-Year Strategic Framework for Reform and Development অনুযায়ী, দেশীয় কর্মসংস্থান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৬.৯১ কোটি থেকে বেড়ে ২০৩০-৩১ সালে ৭.৮৮ কোটিতে পৌঁছানোর কথা, অর্থাৎ প্রায় ৯৭.৮ লাখ নতুন দেশীয় চাকরি। এর সাথে বিদেশে কর্মসংস্থান যোগ করলে মোট বৃদ্ধি দাঁড়ায় প্রায় ১.০২ কোটিতে। এই লক্ষ্যের মধ্যে সার্ভিস খাত থেকে আসবে ৫৮ লাখ চাকরি, শিল্প খাত থেকে ৩৩ লাখ, বাকিটা কৃষি আর বিদেশি কর্মসংস্থান থেকে।

সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, মোট লক্ষ্যের প্রায় ৬০ শতাংশই আসতে হবে সার্ভিস খাত থেকে, যেখানে বর্তমানে মোট কর্মসংস্থানের ৩৭.৯৬ শতাংশ এই খাতে, কৃষিতে ৪৪.৬৭ শতাংশ, আর শিল্পে মাত্র ১৭.৩৭ শতাংশ।

সার্ভিস খাতের ওপর এত নির্ভরতা কেন

সরকারের যুক্তি হলো, সার্ভিস খাতের employment elasticity সবচেয়ে বেশি, ০.৫৫, যেখানে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে এটা ০.৪৫, নির্মাণ ও খনিজ খাতে ০.৫০, আর কৃষিতে মাত্র ০.১০। সহজ কথায়, অর্থনীতি বাড়লে সার্ভিস খাতেই সবচেয়ে বেশি নতুন চাকরি তৈরি হয়, ঐতিহাসিকভাবে এটাই দেখা গেছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক প্রবণতা ততটা আশাব্যঞ্জক না। ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সার্ভিস খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার বছরে ২.৬ শতাংশ থেকে কমে ২.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে শিল্প খাতে উৎপাদন বছরে প্রায় ৯ শতাংশ হারে বেড়েছে, অথচ কর্মসংস্থান কমেছে, কারণ অটোমেশন আর মূলধন-নিবিড় সম্প্রসারণের কারণে শিল্প এখন কম মানুষ নিয়োগ দিয়েই বাড়তে পারছে।

অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দ্বিমত

শ্রম অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলছেন, বর্তমানে কর্মসংস্থান মূলত কৃষি আর কম-দক্ষতার সার্ভিসে কেন্দ্রীভূত, তাই এই পূর্বাভাস মূলত বিদ্যমান প্রবণতাকেই অনুসরণ করছে। তার মতে, স্বল্পমেয়াদে সার্ভিস খাত জীবিকা জোগাতে পারে, কিন্তু টেকসই কর্মসংস্থান আসা উচিত মধ্যম ও উচ্চ-দক্ষতার ম্যানুফ্যাকচারিং আর উচ্চ-মূল্যের সার্ভিস থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক নিয়াজ আসাদউল্লাহ মনে করেন, সার্ভিসের ওপর নির্ভরতা নিজে থেকে খারাপ কিছু না, কারণ ICT, ফিন্যান্স, লজিস্টিক্স, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পর্যটনের মতো আধুনিক সার্ভিস সত্যিকারের উৎপাদনশীল চাকরি তৈরি করতে পারে। কিন্তু তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “সার্ভিস” শব্দটার আওতায় অনেক ধরনের কাজ পড়ে, যার বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক, কম বেতনের, আর কম উৎপাদনশীল। তার আশঙ্কা, এই পূর্বাভাস আসলে শুধু ছোট ব্যবসা, পরিবহন, আর অনিশ্চিত কাজের সম্প্রসারণকেই প্রতিফলিত করতে পারে।

অর্থনীতিবিদ বিরুপাক্ষ পল আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, শক্তিশালী ম্যানুফ্যাকচারিং ভিত্তি তৈরি হওয়ার আগেই সার্ভিস খাতের ওপর এত জোর দেওয়াটা অকাল উন্নয়নের একটা লক্ষণ। তার মতে, সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও সার্ভিস খাত বড়, কিন্তু সেটা তৈরি হয়েছে শক্তিশালী শিল্প ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। তার ভাষায়, তরুণরা এখন যা আছে তা দিয়ে মোবাইল ফোনের দোকান খুলছে, এটাও সার্ভিস খাত ঠিকই, কিন্তু এই ধরনের সম্প্রসারণ প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তৈরি করে না।

সরকারের পাল্টা যুক্তি

জেনারেল ইকোনমিক্স ডিভিশনের সদস্য-সচিব মনজুর হোসেন বলছেন, সার্ভিস খাতের এই পূর্বাভাস অতীতের কর্মসংস্থান প্যাটার্ন আর খাতটার তুলনামূলক বেশি elasticity-র ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তিনি স্বীকার করেছেন এগুলো নিশ্চয়তা না, শুধু পূর্বাভাস, আর ডিজিটালাইজেশনের কারণে কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কর্মসংস্থান কমতে পারে। তার মতে, বাংলাদেশে পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসন, আর উদীয়মান খাতগুলোতে সার্ভিস সম্প্রসারণের সুযোগ এখনো যথেষ্ট আছে, যেখানে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের প্রবৃদ্ধি ইতিমধ্যে হিসেবে নেওয়া হয়ে গেছে।

পদ্ধতিগত প্রশ্ন

CPD-র গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান পুরো পূর্বাভাসের পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, এই হিসেব একটা পুরনো কর্মসংস্থান কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে, আর ২০১৭ সাল পর্যন্ত ডেটা ব্যবহার করে employment elasticity হিসেব করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়াই ঘটেছে, কোথাও কোথাও কর্মসংস্থান বরং কমেছে। তার আশঙ্কা, পুরনো ডেটা ব্যবহার করার কারণে এই পূর্বাভাসটা বাস্তবের চেয়ে বেশি আশাবাদী হয়ে গেছে।

সংখ্যাটার ভেতরের আরেকটা সমস্যা

১ কোটির হিসেবের মধ্যে বিদেশে কর্মসংস্থানও ধরা আছে, বার্ষিক ১১.২ লাখ থেকে বেড়ে ১৫.৮ লাখে পৌঁছানোর কথা, পাঁচ বছরে মোট ৬৫.৩ লাখ কর্মী। কিন্তু এটা গ্রস ডেপ্লয়মেন্ট, ফেরত আসা কর্মীদের হিসেবে ধরা হয়নি। সরকারের ফ্রেমওয়ার্ক নিজেই স্বীকার করেছে, বিদেশে বর্তমানে কতজন বাংলাদেশি কর্মরত আছে তার নির্ভরযোগ্য কোনো ডেটা নেই। ফলে ৬৫.৩ লাখ সংখ্যাটাকে সরাসরি ৬৫.৩ লাখ নতুন চাকরি হিসেবে ধরাটা বিভ্রান্তিকর।

দেশের ৮৪ শতাংশ কর্মী এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে

দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে, নারী আর তরুণদের মধ্যে এই হার ৯২ শতাংশেরও বেশি। সরকারের ফ্রেমওয়ার্কে আনুষ্ঠানিকীকরণের প্রণোদনা, শিক্ষানবিশি প্রোগ্রাম, আর নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য ভর্তুকির প্রস্তাব থাকলেও, কর্মীদের নিরাপদ আর উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে স্থানান্তর করাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।

আসল পরীক্ষাটা কী

অধ্যাপক আসাদউল্লাহর মতে, ১ কোটি চাকরির লক্ষ্যটা একটা নির্ভরযোগ্য কর্মসংস্থান পরিকল্পনার চেয়ে বেশি একটা উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল আর ম্যানুফ্যাকচারিং ইতিমধ্যে চাপে থাকা অবস্থায়, নতুন উৎপাদনশীল সক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান, আর পেশা ঠিক কোথা থেকে আসবে সেটা স্পষ্ট করা জরুরি। তার আর তৌফিকুলের মূল কথাটা একই জায়গায় মেলে, প্রশ্নটা শুধু কতগুলো চাকরি তৈরি হলো তা না, বরং সেই চাকরিগুলোর মান আর প্রকৃতি কেমন, সেটাই আসল বিষয়।

সংখ্যায় বড় একটা লক্ষ্য ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু সেই লক্ষ্যের পেছনের অনুমানগুলো বাস্তবতার সাথে কতটা মেলে, সেটাই আসল পরীক্ষা। পরিসংখ্যানের হিসেবে ১ কোটি চাকরি তৈরি হলো কিনা, সেটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই চাকরিগুলো মানুষকে সত্যিকারের নিরাপত্তা আর যথাযথ মজুরি দিতে পারবে কিনা। আগামী পাঁচ বছরে এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে, লক্ষ্যটা আসলে একটা পরিকল্পনা ছিল, নাকি শুধু একটা আশাবাদী সংখ্যা।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular