back to top
বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৩, ২০২৬
HomeWellbeingMental Healthনেতিবাচক স্মৃতি কেন এত গভীরে থেকে যায়? জানুন মস্তিষ্কের রহস্য

নেতিবাচক স্মৃতি কেন এত গভীরে থেকে যায়? জানুন মস্তিষ্কের রহস্য

কারো সামনে প্রেজেন্টেশন দিলে, তারপর দশজন মানুষ এসে বলল “দারুণ হয়েছে”, আর একজন বলল “মাঝের অংশটা একটু দুর্বল লাগল”। রাতে বিছানায় শুয়ে ঠিক কোন কথাটা মাথায় বারবার ঘুরতে থাকে, সেটা বলে দেওয়ার দরকার নেই। কেন এমন হয়, নয়টা ভালো কথা মনে থাকে না, অথচ একটা সমালোচনা রয়ে যায় দিনের পর দিন?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের এমন একটা প্রক্রিয়ায়, যেটা কোনো দুর্বলতা না, বরং একটা survival feature। চলো দেখি, স্মৃতির ভেতরে ঠিক কী ঘটে, যার কারণে খারাপ মুহূর্তগুলো এত গভীরভাবে গেঁথে যায়, আর ভালো মুহূর্তগুলো এত সহজে ফিকে হয়ে আসে।

অ্যামিগডালা, মস্তিষ্কের ইমোশনাল অ্যালার্ম সিস্টেম

মস্তিষ্কের গভীরে বাদামের আকৃতির একটা ছোট অংশ আছে, নাম অ্যামিগডালা। এটাকে বলা যায় মস্তিষ্কের ইমোশনাল অ্যালার্ম সিস্টেম। কোনো হুমকিজনক বা কষ্টদায়ক কিছু ঘটলে, অ্যামিগডালা সাথে সাথে সেই মুহূর্তটাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে, আর মস্তিষ্কের বাকি অংশকে সংকেত পাঠায় সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার জন্য।

Yale University-র একটা গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে, যাদের অ্যামিগডালা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা ইমোশনাল আর নিউট্রাল, দুই ধরনের ঘটনাই সমানভাবে ভুলে যায়, নেতিবাচক ঘটনার প্রতি কোনো বাড়তি স্মৃতি ধরে রাখার প্রবণতা তাদের মধ্যে দেখা যায় না। এটাই প্রমাণ করে, অ্যামিগডালাই এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু।

কর্টিসল কীভাবে স্মৃতিকে আরও গভীর করে তোলে

কোনো চাপের বা ভীতিকর পরিস্থিতিতে পড়লে শরীরে কর্টিসল আর অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো শুধু হৃদস্পন্দন বাড়ায় না, এগুলো সরাসরি সেই মুহূর্তের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে তোলে। মস্তিষ্ক তখন একরকম নিজেকে বলে, এটা মনে রাখতে হবে, এখন জটিল চিন্তাভাবনায় সময় নষ্ট না করে শুধু প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে। এই কারণেই একটা দুর্ঘটনার সময় ঠিক কী পরেছিলে সেটা মনে থাকে, অথচ গত বছরের ছুটির খুঁটিনাটি মনে করতে কষ্ট হয়।

অ্যামিগডালা মূলত হিপ্পোক্যাম্পাসকে, যেটা মস্তিষ্কের মেমরি সেন্টার, নির্দেশ দেয় ঘটনাটা হাই-ডেফিনিশনে রেকর্ড করে রাখতে। ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে এই যোগাযোগটা অনেক বেশি শিথিল থাকে, ফলে সময়ের সাথে সাথে সেই স্মৃতিগুলো কম স্পষ্ট, কম বিস্তারিত হয়ে যায়।

একটা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা পোষাতে লাগে পাঁচটা ইতিবাচক অভিজ্ঞতা

গবেষণায় দেখা গেছে, সমান তীব্রতার নেতিবাচক আর ইতিবাচক ঘটনার মধ্যেও নেতিবাচক ঘটনাটাই মনে বেশি ভার ফেলে। একটা সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ঘটনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে গড়ে প্রায় পাঁচটা ইতিবাচক ঘটনার দরকার হয় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। মনোবিজ্ঞানী রয় বাউমিস্টার আর তার সহকর্মীদের একটা বিখ্যাত গবেষণাপত্রের শিরোনামই এই ধারণাটা এক লাইনে ধরে ফেলে, “Bad Is Stronger Than Good”।

কেন ভালো মুহূর্তগুলো এত সহজে ফিকে হয়ে যায়

ইতিবাচক মুহূর্তগুলো মুহূর্তের জন্য ভালো লাগা তৈরি করে, কিন্তু সচেতনভাবে সেগুলোকে ধরে না রাখলে সেগুলো দ্রুত মিলিয়ে যায়। এর পেছনে তিনটা কারণ কাজ করে। প্রথমত, ইতিবাচক ঘটনা সাধারণত নেতিবাচক ঘটনার মতো তীব্র ইমোশনাল ট্যাগিং তৈরি করে না। দ্বিতীয়ত, মস্তিষ্ক আনন্দকে survival issue হিসেবে দেখে না, তাই সেটা মনে রাখার অগ্রাধিকারও কম থাকে। তৃতীয়ত, আমরা প্রায়ই ব্যস্ততা বা মাল্টিটাস্কিংয়ের কারণে ভালো মুহূর্তগুলো পুরোপুরি অনুভব না করেই পেরিয়ে যাই।

এই প্রবণতা প্রতিদিনের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে

এই bias শুধু স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটা আমাদের উপলব্ধি, সিদ্ধান্ত নেওয়া, আর সম্পর্কের ধরনকেও প্রভাবিত করে। সহকর্মীর একটা সাধারণ মন্তব্য, যেটা হয়তো তেমন গুরুত্বপূর্ণও ছিল না, যদি সেটা অপমান বা প্রত্যাখ্যানের মতো মনে হয়, তাহলে মস্তিষ্ক সেটা টুকে রাখে, অনেকদিন পর্যন্ত।

ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার উপায়

এই bias সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব না, এটা মস্তিষ্কের গঠনের একটা অংশ। কিন্তু কিছু সচেতন অভ্যাস দিয়ে এটাকে কিছুটা ভারসাম্যে আনা সম্ভব।

– ভালো মুহূর্তে সচেতনভাবে থেমে সেটা অনুভব করা, অন্তত কয়েক সেকেন্ডের জন্য, যাতে মস্তিষ্ক সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে এনকোড করার সুযোগ পায়

– দিনের শেষে ছোট ছোট ইতিবাচক মুহূর্ত লিখে রাখার অভ্যাস তৈরি করা, যা গবেষণায় ইতিবাচক স্মৃতির পুনরুদ্ধার বাড়াতে সাহায্য করে বলে দেখা গেছে

– একটা সমালোচনার পাশাপাশি কতগুলো প্রশংসা পেয়েছ, সেই সামগ্রিক ছবিটা মনে রাখার চেষ্টা করা, শুধু একটা মন্তব্যে আটকে না থেকে

– কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপির মতো পদ্ধতি, যেখানে নেতিবাচক স্মৃতির প্যাটার্নকে সচেতনভাবে পুনর্গঠন করার কৌশল শেখানো হয়

মস্তিষ্ক খারাপ অভিজ্ঞতাগুলো বেশি মনে রাখে, এটা কোনো ত্রুটি না, এটা লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ফসল, যা একসময় বেঁচে থাকার জন্য জরুরি ছিল। কিন্তু আধুনিক জীবনে এই একই প্রবৃত্তি মাঝে মাঝে অতিরিক্ত সমালোচনামূলক আর নেতিবাচক একটা মানসিকতা তৈরি করে দেয়। এই সত্যিটা জানা মানেই নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করা, আর একই সাথে সচেতনভাবে ভালো মুহূর্তগুলোকে একটু বেশি সময় দেওয়ার চেষ্টা করা, যাতে সেগুলোও মনের গভীরে জায়গা করে নিতে পারে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular