ভাবুন একবার — ১৮টা দেশ, ১২৯ জন প্রতিযোগী, আর তাদের মধ্যে চীন, রাশিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো টেক-জায়ান্ট দেশ। এই লড়াইয়ে নেমে বাংলাদেশের তিনটা ছেলে জিতে নিল সোনা। একটা নয়, দুটো নয় — তিনটা। আর পুরো প্রতিযোগিতায় মোট সোনার পদক ছিল মাত্র দশটা।
মানে প্রতি তিনটা সোনার একটা বাংলাদেশের ঘরে। এমন অনুপাত কোনো ফ্লুক না, এটা একটা প্রস্তুতির গল্প।
এশিয়া-প্যাসিফিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াড (এপিওএআই) — এই অঞ্চলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এআই প্রতিযোগিতাগুলোর একটা, এবারই প্রথমবার অনুষ্ঠিত হলো, চীনের আয়োজনে, পুরোপুরি অনলাইনে। প্রথম আসরেই এমন কঠিন প্রতিযোগিতায় নামতে হয়েছিল ১৮টি দেশের ১২৯ জন প্রতিযোগীকে নিয়ে। প্রতিযোগিতার মান এতটাই কঠিন রাখা হয়েছিল যে মোট ৬৪টা মেডেলের বেশি দেওয়াই হয়নি — ১০টা সোনা, ২২টা রুপা, ৩২টা ব্রোঞ্জ। আর সেই ১০টা সোনার মধ্যে ৩টাই জিতে নিলো বাংলাদেশ — যেকোনো অংশগ্রহণকারী দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
যাদের হাতে এই গল্প লেখা হলো
হোমনা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির লাবিব শাহরিয়ার, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির মো. সাইদুজ্জামান, আর নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির ত্রিদিব রায় — এই তিনজনের নাম এখন বাংলাদেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার ইতিহাসে লেখা থাকবে। চূড়ান্ত র্যাঙ্কিংয়ে তারা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৪র্থ, ৫ম আর ৯ম স্থানে। এর বাইরে আরও চারজন পেয়েছে সম্মানজনক স্বীকৃতি — নাওফিল রহমান, নাঈরা নাওয়ার আহমেদ, অনন্য যারিফ আকন্দ আর মোবতাসিম চৌধুরী প্রিয়ম। মানে আট সদস্যের পুরো দলটাই কিছু না কিছু নিয়ে ফিরেছে।
লাবিবের কথাটা মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো — ফলাফলের তালিকায় নিজের নামের পাশে “গোল্ড মেডেল” লেখা দেখে তার মনে হয়েছিল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ সে। রুপা নিয়ে প্রায় নিশ্চিত ছিল, সোনার জন্য শুধু আশা করছিল। সাইদুজ্জামানের কথায় আরেকটা মাত্রা আছে — নিজের জন্য জেতাটা তার কাছে কখনোই বড় বিষয় ছিল না, কিন্তু দেশের নাম নিয়ে লড়লে পুরো ব্যাপারটাই অন্যরকম হয়ে যায়।
এই সাফল্য একদিনে আসেনি
এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডের দীর্ঘ যাত্রা — অনলাইন প্রিলিমিনারি, আঞ্চলিক পর্ব, ১৬ মে বিইউবিটিতে জাতীয় পর্ব, তারপর ২০-২৩ মে জাতীয় সিলেকশন ক্যাম্প। এই পুরো ফানেল পার হয়ে তৈরি হয়েছে আট সদস্যের দলটা। আয়োজনে ছিল বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন), হোস্ট ছিল বিইউবিটি, আর নলেজ পার্টনার হিসেবে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট।
এই প্রতিযোগিতাটা মুখস্থবিদ্যার পরীক্षা ছিল না। ছয় ঘণ্টা ধরে চারটা ভিন্ন ডোমেইনের মেশিন লার্নিং সমস্যা সমাধান করতে হয়েছে — অ্যাস্ট্রোনমি, অডিও প্রসেসিং, ওয়াইল্ডলাইফ ইমেজ আর কেমিস্ট্রি। মানে শুধু কোড লেখার দক্ষতা না, বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ে গভীর বোঝাপড়া আর সেটাকে এআই মডেলে রূপান্তরের ক্ষমতা — দুটোই দরকার পড়েছে।
দলনেতা ও আইআইটির পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেনের একটা কথা গুরুত্বপূর্ণ — নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াটা যে অর্থবহ, সেটা প্রমাণ করেছে এই শিক্ষার্থীদের ফলাফল। আর কোচ মো. আজম খানের ভাষায়, এটা স্রেফ একটা প্রতিযোগিতা ছিল না — এটা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের তরুণদের প্রতিনিধিত্ব।
এই গল্পটা কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের একজন দশম শ্রেণির ছাত্র, একটা মফস্বল স্কুল থেকে, কম্পিটিং দেশগুলোর তালিকায় চীন-জাপান-রাশিয়া রেখে সোনা জিতে আসছে — এই বাক্যটা পাঁচ বছর আগে কেউ লিখলে অতিরঞ্জন মনে হতো। আজ এটা বাস্তবতা। আর এটাই বলে দেয়, প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট পোস্টকোড বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয় — সঠিক সুযোগ আর সঠিক প্রস্তুতি পেলে সেটা যেকোনো জায়গা থেকে বিস্ফোরিত হতে পারে।
এই তিনটা সোনার পদক শুধু তিনজন কিশোরের অর্জন নয়। এটা একটা বার্তা — পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, যারা ভাবছে এআই-মেশিন লার্নিং শেখা তাদের কাজে লাগবে কিনা। ত্রিদিব রায়ের ভাষায় বলতে গেলে — নিজ দেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখার এই গল্প এখনও শেষ হয়নি, এটা সবে শুরু।

