বাংলাদেশে এমন কোনো পরিবার খুব কমই আছে, যারা “ভিকারুননিসা” নামটা শোনেনি। ঢাকার বেইলি রোডে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্কুলটা — যেখান থেকে বেরিয়ে হাজারো মেয়ে ডাক্তার হয়েছে, প্রকৌশলী হয়েছে, দেশ গড়েছে। কিন্তু সেই স্কুলের নামের পেছনে যে মানুষটি আছেন, তাঁকে ক’জন চেনেন?
তিনি বাংলাদেশি নন। তিনি ভারতীয়ও নন। তিনি অস্ট্রিয়ায় জন্মানো একজন নারী — যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, পাকিস্তান আন্দোলনে লড়েছিলেন, তিনবার জেলে গিয়েছিলেন, এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হয়েছিলেন।আর এর ফাঁকে ফাঁকে — তিনি বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য এমন একটি স্কুল গড়ে গিয়েছিলেন, যা আজও লক্ষ লক্ষ মেয়ের জীবন বদলে দিচ্ছে।
এটা তাঁর গল্প।
শুরুটা অস্ট্রিয়ায়, বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডে
১৯২০ সালের জুলাই মাসে অস্ট্রিয়ায় জন্মেছিলেন ভিক্টোরিয়া। বন্ধুরা তাঁকে ডাকতেন “ভিকি” বলে। শৈশব ও শিক্ষা হয়েছিল ইংল্যান্ডে — নিজেকে ভাবতেন একজন “ইংরেজ মেয়ে” হিসেবে। কে জানত, এই মেয়েটাই একদিন উপমহাদেশের রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে পড়বে, তিনবার গ্রেফতার হবে, এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে যাবে?
যে পরিচয় সব বদলে দিল
লন্ডনে থাকাকালীন তাঁর সাথে পরিচয় হয় ফিরোজ খান নুনের — তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার, পাঞ্জাবের এক প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের সন্তান। ১৯৪৫ সালে বোম্বেতে তাঁদের বিয়ে হয়।
বয়সের পার্থক্য ছিল ২৭ বছর। কিন্তু দুই মানুষের মধ্যে যা গড়ে উঠেছিল, তা শুধু দাম্পত্য নয় — ছিল এক অসাধারণ রাজনৈতিক ও মানবিক অংশীদারিত্ব। বিয়ের পর ভিক্টোরিয়া ইসলাম গ্রহণ করলেন। নাম বদলে হলো ভিকার-উন-নিসা — যার অর্থ “নারীদের শ্রেষ্ঠত্ব।” আর এই নামটাই একদিন বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত স্কুলের পরিচয় হয়ে উঠবে।
লড়াই, কারাগার, এবং একটি দেশের জন্মের সাক্ষী
বিয়ের পরপরই শুরু হলো আসল জীবন। ১৯৪৫ সালে ফিরোজ খান ভাইসরয়ের কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করে মুসলিম লীগের পক্ষে পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিলেন। ভিকি শুধু স্ত্রী হিসেবে নয়, সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে দাঁড়ালেন।
পাঞ্জাব প্রাদেশিক মুসলিম লীগের নারী শাখার সদস্যা হলেন। মিছিল, প্রতিবাদ, রাজনৈতিক প্রচারণা — কোথাও পিছিয়ে থাকলেন না। ব্রিটিশ-সমর্থিত খিজর মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্স আন্দোলনে তিনি তিনবার গ্রেফতার হলেন। তিনবার! একজন বিদেশি নারী, যিনি স্বেচ্ছায় এই লড়াইয়ে নেমেছিলেন।
দেশভাগের সময় পূর্ব পাঞ্জাবে তাঁদের পারিবারিক বাড়িতে আগুন দেওয়া হলো। স্থানীয় একজন হিন্দু রাজার আশ্রয়ে থেকে তিনি প্রাণে বাঁচলেন, এরপর পাকিস্তানে ফিরে এলেন। এরপর শরণার্থী শিবিরে ছুটে গেলেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্দশায় হাত বাড়িয়ে দিলেন। রেড ক্রিসেন্টের সাথে যুক্ত হলেন, যেখানে তিনি পরবর্তী দুই দশক কাজ করেছেন।
ঢাকায় এলেন এবং ইতিহাস গড়লেন
১৯৫০ সালের ৩১ মার্চ ফিরোজ খান নুন পূর্ব বাংলার প্রথম পাকিস্তানি গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হলেন এবং ৫ এপ্রিল শপথ নিলেন। লেডি নুনও এলেন ঢাকায়। তিনি দেখলেন, পূর্ব বাংলার মেয়েদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। একটা স্বপ্ন জন্ম নিল মনে।
১৯৫২ সালে বেইলি রোডে প্রতিষ্ঠিত হলো ভিকারুননিসা নুন স্কুল। মাত্র কয়েকজন মেয়ে নিয়ে শুরু। আজ সেই স্কুলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। শুধু ঢাকায় নয়। ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতেও তিনি আরেকটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন — ভিকার-উন-নিসা নুন গার্লস হায়ার সেকেন্ডারি ইন্সটিটিউট। দুই পাকিস্তানে দুটো স্কুল। একজন অস্ট্রিয়ান নারীর হাতে।
গোয়াদর: যে কূটনীতি ইতিহাস বদলে দিল
১৯৫৬ সাল। গোয়াদর বন্দর তখনও ওমানের নিয়ন্ত্রণে। লেডি নুন লন্ডনে গিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও হাউস অব লর্ডসে লবিং করলেন, যাতে গোয়াদর পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। তাঁর এই প্রচেষ্টা চুক্তি সম্পন্ন করার পথ খুলে দিল।
১৯৫৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে গোয়াদরের সার্বভৌমত্ব অর্জন করল। আজ গোয়াদর CPEC-এর কেন্দ্রবিন্দু। সেই ইতিহাসের একটা বড় অধ্যায় লেখা আছে লেডি নুনের নামে।
প্রথম লেডি থেকে রাষ্ট্রদূত
১৯৫৭ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ফিরোজ খান নুন পাকিস্তানের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভিকার-উন-নিসা তখন দেশের প্রথম লেডি। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার নিশান-ই-ইমতিয়াজ প্রদান করে।
এরপরও তিনি থামেননি। ১৯৭৮ সালে তিনি পাকিস্তান ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের প্রধান হন এবং ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত পর্তুগালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেন।
অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজের স্বপ্ন
জীবনের শেষ পর্যায়ে, ইংল্যান্ডে তাঁর সৎ বোন ও ভগ্নিপতির রেখে যাওয়া অর্থ উত্তরাধিকারে পেয়ে, তিনি সেই পুরো অর্থ একটি ফাউন্ডেশনে ঢেলে দিলেন — যাতে মেধাবী কিন্তু অসচ্ছল পাকিস্তানি ছাত্রছাত্রীরা অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজে পড়তে পারে। শর্ত ছিল একটাই, পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে আসতে হবে।
নিজের সন্তান ছিল না। কিন্তু হাজারো সন্তান তৈরি করে গেলেন তিনি — স্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সমাজে।
বিদায়, কিন্তু বিস্মৃতি নয়
২০০০ সালের ১৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে ৭৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ভিকার-উন-নিসা নুন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আজও বেইলি রোডে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন হাজারো মেয়ে যখন ভিকারুননিসা নুন স্কুলের গেটে ঢোকে, তারা হয়তো জানে না যে, এই স্কুলের ভেতরে একজন বিদেশিনীর স্বপ্ন, সাহস আর ভালোবাসা মিশে আছে।
একজন অস্ট্রিয়ান মেয়ে, যিনি হতে পারতেন ইউরোপের কোনো শহরে আরামদায়ক জীবন কাটানো একজন সাধারণ নারী তিনি বেছে নিয়েছিলেন উপমহাদেশের ধুলো-মাটি, রাজনীতি, কারাগার, এবং লক্ষ মেয়ের ভবিষ্যৎ।
এটাই ভিকার-উন-নিসা নুনের গল্প। ইতিহাস সবসময় রাজা-বাদশাহদের কথা বলে না। কখনো কখনো ইতিহাস বলে সেইসব মানুষের কথা — যাঁরা নামের পরিবর্তে স্বপ্ন রেখে গেছেন।

