মনে আছে, ছোটবেলায় কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতেন—”বড় হয়ে কী হবে?” তখন চোখ চিকচিক করত। কেউ বলত ডাক্তার, কেউ পাইলট, কেউ শিল্পী, কেউ বা লেখক। স্বপ্নটা এত স্পষ্ট ছিল যে মনে হতো জীবনটা যেন সেই পথেই হাঁটবে।
এখন? এখন সকালে ঘুম থেকে উঠে একই রুটিন। অফিস, বাসা, দায়িত্ব, বিল পরিশোধ, আবার ঘুম। দিন যায়, মাস যায়, বছর চলে যায়। এর মাঝে কখনো কি মনে হয় না—”আচ্ছা, আমি তো এমন হতে চাইনি?”
কিন্তু এই প্রশ্নটা আমরা নিজেকে করি না। কারণ উত্তরটা হয়তো ভয়ংকর। হয়তো বুঝতে হবে যে, কোথাও একটা মোড়ে আমরা ভুল পথে হাঁটা শুরু করেছিলাম। আর সেই ভুল পথেই এখন পুরো জীবন কাটছে।
ব্যস্ততার ভেতরে এই প্রশ্নটা চাপা পড়ে যায়। কারণ থামলে, ভাবলে, মনে হবে সময় নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আসল সত্যি হলো—না থামলে, না ভাবলে, পুরো জীবনটাই হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে।
আমরা কোথায় ভুল পথে হাঁটা শুরু করি
সবকিছু শুরু হয় খুব সহজভাবে। একদিন কেউ বলে—”এই লাইনে চাকরি পাওয়া সহজ।” আরেকজন বলে—”এই পথে নিরাপত্তা বেশি।” পরিবার বলে—”তোমার স্বপ্ন তো ঠিক আছে, কিন্তু আগে একটা স্থিতিশীল কিছু করো।” আর তখন আমরা ভাবি—ঠিক আছে, আগে নিরাপত্তা। পরে স্বপ্ন। কিন্তু সেই “পরে” আর কখনো আসে না।
নিরাপত্তার নামে স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়াটা আমাদের সমাজে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। “এখন বাস্তববাদী হতে হবে”—এই এক লাইনে কত মানুষের জীবন বদলে গেছে, কে জানে।
পরিবার, সমাজ, আর্থিক পরিস্থিতি—সবাই মিলে আমাদের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আর আমরা? আমরা মেনে নিই। কারণ প্রতিবাদ করা কঠিন। একা লড়া কঠিন। তাই ধীরে ধীরে নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়। এক সময় বুঝতেই পারি না—আমি আসলে কী চাই।
হারিয়ে যাওয়া মানে ব্যর্থ হওয়া নয়
এখানে একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। মানুষ বদলায়। লক্ষ্যও বদলায়। যে ছেলেটা দশ বছর বয়সে ক্রিকেটার হতে চেয়েছিল, সে তিরিশে এসে হয়তো শিক্ষক হতে চায়। এতে কোনো সমস্যা নেই। বরং এটাই স্বাভাবিক। কারণ জীবন যত এগোয়, আমরা নিজেকে তত চিনি।
কিন্তু সমস্যা হয় যখন বদলটা নিজের ইচ্ছার বাইরে হয়। যখন আমরা নিজে চাইনি, কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের ঠেলে দিয়েছে অন্য পথে। এখানে একটা বড় পার্থক্য আছে—আপস আর আত্মসমর্পণের মধ্যে।
আপস মানে, আমি জানি আমি কী চাই, কিন্তু এই মুহূর্তে পুরোটা সম্ভব নয়। তাই একটু দিয়ে শুরু করছি। ধীরে ধীরে এগোবো। আত্মসমর্পণ মানে, আমি জানি আমি কী চাই, কিন্তু সেটা আর চেষ্টাই করছি না। হাল ছেড়ে দিয়েছি। বলছি—”আর হবে না। এভাবেই চলুক।” আর এই আত্মসমর্পণটাই আমাদের ভেতরের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলে।
যে লক্ষণগুলো বলে দেয়—আপনি নিজের থেকে দূরে
কীভাবে বুঝবেন আপনি নিজের থেকে দূরে সরে গেছেন? কিছু লক্ষণ আছে। খুব সহজ, কিন্তু ভয়ংকর।
প্রথমত, দিন কাটে, কিন্তু কোনো উত্তেজনা নেই। সকালে উঠতে ইচ্ছে করে না। কাজে মন বসে না। সন্ধ্যায় ফিরে এসে মনে হয়—আজকে কিছুই হলো না। কাল আবার একই দিন। এভাবে সপ্তাহ, মাস, বছর।
দ্বিতীয়ত, নিজের অর্জনেও তৃপ্তি আসে না। প্রমোশন হয়েছে, বেতন বেড়েছে, নতুন গাড়ি কিনেছেন—কিন্তু ভেতরে শূন্যতা। মনে হয়—”তো কী হলো? এটাই কি চেয়েছিলাম?”
তৃতীয়ত, অন্যদের জীবন দেখে বেশি ভাবনা হয়। ফেসবুকে কারো ছবি দেখে মনে হয়—”উনি তো কত সুখী। আমার জীবনে এমন কিছু নেই কেন?” ইনস্টাগ্রামে কেউ ভ্রমণ করছে, নতুন কিছু করছে—আর আপনার মনে হয় আপনি আটকে আছেন।
চতুর্থত, “আর কিছু করা উচিত ছিল”—এই আফসোস সবসময় থাকে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে হয়—”জীবনে তো আরও অনেক কিছু করার ছিল। কিন্তু কিছুই করা হলো না।”
এই লক্ষণগুলো যদি আপনার থাকে, তাহলে বুঝবেন—আপনি যে মানুষটা হতে চেয়েছিলেন, তার থেকে অনেক দূরে চলে এসেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে এই দূরত্ব বাড়ায়
এখন একটা নতুন সমস্যা যুক্ত হয়েছে—সোশ্যাল মিডিয়া। আগে আমরা শুধু নিজের জীবনের সাথে লড়াই করতাম। এখন লড়াই করতে হয় অন্যদের ঝকঝকে জীবনের সাথেও। ফেসবুক খুললে দেখি—কারো নতুন চাকরি, কারো বিদেশ ভ্রমণ, কারো নতুন ব্যবসা। ইনস্টাগ্রামে সবাই হাসিখুশি, সুন্দর। আর আমরা? আমরা বসে আছি ঘরে, একই জীবন, একই সমস্যা।
কিন্তু আমরা ভুলে যাই—এগুলো পুরো সত্যি নয়। এগুলো সাজানো জীবন। কিউরেটেড। মানুষ তাদের সবচেয়ে ভালো মুহূর্ত শেয়ার করে। দুঃখ, ব্যর্থতা, একাকিত্ব—এসব কেউ দেখায় না। কিন্তু আমরা তুলনা করি। আর এই তুলনা আমাদের ক্লান্ত করে দেয়। মনে হতে থাকে—”আমার জীবন কেন এত সাধারণ? আমি কেন কিছু করতে পারছি না?”
আস্তে আস্তে নিজের গল্পকেই ছোট মনে হতে থাকে। নিজের অর্জন, নিজের স্বপ্ন—সব তুচ্ছ লাগে। আর এভাবেই আমরা আরও বেশি নিজের থেকে দূরে সরে যাই।
বাস্তবতা: জীবন এক লাইনের গল্প নয়
এখানে একটা বড় সত্যি মেনে নিতে হবে—জীবন সোজা রেখার মতো নয়। কেউ পঁচিশ বছর বয়সে নিজের লক্ষ্য পায়। কেউ পঁয়তাল্লিশে। কেউ হয়তো ষাট বছর বয়সে বুঝতে পারে—”আরে, আমি তো এটাই করতে চেয়েছিলাম!” দেরিতে পাওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া নয়। দেরিতে পাওয়া মানে শুধু—আপনার যাত্রাটা একটু ভিন্ন।
আর অনেক সময় মনে হয় আমরা হারিয়ে গেছি, কিন্তু আসলে সেটা শুধু বিরতি। জীবনে থামা দরকার। চিন্তা করা দরকার। নিজেকে নতুন করে খুঁজে বের করা দরকার। যে মানুষ তিরিশ বছর একটা চাকরি করে হঠাৎ বুঝল—”না, এটা আমার জন্য নয়”—সে কিন্তু ব্যর্থ না। সে সাহসী। কারণ সে নিজের কথা শুনতে পারছে।
জীবনের কোনো নির্ধারিত সময়সীমা নেই। কোনো বয়সসীমা নেই। আপনি যদি আজ বুঝতে পারেন—”আমি ভুল পথে আছি”—তাহলে আজই শুরু করার সময়। কাল নয়, পরশু নয়—আজ।
নিজেকে ফিরে পাওয়ার প্রথম ধাপ
তো এখন প্রশ্ন হলো—কীভাবে ফিরে পাবেন সেই হারিয়ে যাওয়া নিজেকে? প্রথম ধাপ খুবই সহজ, কিন্তু অনেকে করে না। লিখুন। হ্যাঁ, কলম-কাগজ নিয়ে লিখুন।
প্রথমে লিখুন—আপনি কে হতে চেয়েছিলেন। ছোটবেলার স্বপ্ন। কৈশোরের আকাঙ্ক্ষা। তরুণ বয়সের লক্ষ্য। সব লিখুন। লুকিয়ে রাখবেন না। কাউকে দেখাতে হবে না। শুধু নিজের জন্য।
তারপর আলাদা পাতায় লিখুন—এখনকার আপনি কী চান। এখন, এই মুহূর্তে, আপনার কাছে জীবনের অর্থ কী? কী করলে খুশি হবেন? কোন কাজে মন বসে? কোন কথায় হৃদয় নড়ে?
এই দুটো তালিকা মিলিয়ে দেখুন। হয়তো দেখবেন, অনেক কিছু বদলে গেছে। যা আগে চেয়েছিলেন, এখন আর চান না। এটা ঠিক আছে। কিন্তু এসেন্স দেখুন। মূল সুরটা দেখুন।
ধরুন, ছোটবেলায় চেয়েছিলেন ডাক্তার হতে। এখন আর চান না। কিন্তু ভেবে দেখলেন—আসলে চেয়েছিলেন মানুষের সেবা করতে। তাহলে এখন সেই সেবার কাজ অন্যভাবেও করতে পারেন। শিক্ষকতা করতে পারেন। সামাজিক কাজ করতে পারেন। স্বেচ্ছাসেবী হতে পারেন।
মূল বিষয় হলো—স্বপ্নকে হুবহু না, তার সারাংশ ধরে রাখুন।
ছোট পদক্ষেপে বড় পুনর্গঠন
এখন অনেকের মনে হবে—”ঠিক আছে, বুঝলাম। কিন্তু এখন তো চাকরি আছে, পরিবার আছে, দায়িত্ব আছে। সব ফেলে তো নতুন করে শুরু করতে পারব না!” একদম ঠিক কথা। আর তা করতে হবেও না। জীবনের সব বদল একসাথে দরকার নেই। বরং ছোট ছোট পদক্ষেপ নিন। ধীরে ধীরে।
সপ্তাহে তিরিশ মিনিট নিজের জন্য রাখুন। শুধু তিরিশ মিনিট। এই সময়টুকু করুন সেই কাজ যা আপনি ভালোবাসেন। ছবি আঁকা, লেখা, গান শোনা, নতুন কিছু শেখা—যা খুশি।
ছোট ছোট সৃজনশীল বা কৌতূহলী কাজ করুন। যেমন ধরুন, আপনি লিখতে ভালোবাসতেন। তাহলে প্রতি সপ্তাহে একটা ছোট লেখা লিখুন। কাউকে না দেখিয়েও লিখতে পারেন। শুধু নিজের জন্য। অথবা আপনি গাছপালা ভালোবাসেন? তাহলে একটা ছোট টবে গাছ লাগান। দেখুন কীভাবে বাড়ে।
এগুলো খুবই ছোট। কিন্তু এই ছোট কাজগুলোই আপনাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে।
আর সবচেয়ে জরুরি—নিজের সাথে সৎ কথোপকথন করুন। প্রতিদিন একবার নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—”আজকে কেমন লাগলো? আমি কি খুশি? আমার কি মনে হচ্ছে আমি ঠিক পথে আছি?”
এই ছোট ছোট প্রশ্ন, ছোট ছোট পদক্ষেপ—এগুলোই একদিন বড় পরিবর্তন আনে।
ভয়টাই আসল বাধা
এতক্ষণে হয়তো মনে হচ্ছে—”হ্যাঁ, এসব ঠিক আছে। কিন্তু আসলে করতে পারব তো?” এখানেই আসে আসল বাধা—ভয়।
“এখন আর সময় নেই।” এই ভয়টা সবচেয়ে বড়। মনে হয়, আমার বয়স হয়ে গেছে। এখন আর নতুন করে শুরু করা যাবে না। কিন্তু এটা মিথ্যা। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে কেউ নতুন ব্যবসা শুরু করেছে। পঞ্চাশ বছর বয়সে কেউ নতুন পড়াশোনা শুরু করেছে। ষাট বছর বয়সেও মানুষ নতুন জীবন শুরু করেছে। সময় আছে। সবসময়ই আছে।
“মানুষ কী বলবে?” এই ভয়টা আমাদের সমাজে খুব প্রবল। কিন্তু সত্যি বলতে—মানুষ তো কিছুদিন বলবে, তারপর ভুলে যাবে। তারা তাদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আপনার জীবন আপনার। আপনি যদি নিজের মতো না চলেন, তাহলে সেই মানুষগুলো এসে আপনার জীবন চালিয়ে দেবে না। তাই নয় কি?
“ব্যর্থ হলে কী হবে?” এই ভয়টাও খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ভেবে দেখুন—চেষ্টা না করলে তো ব্যর্থতা নিশ্চিত। চেষ্টা করলে অন্তত সম্ভাবনা আছে। আর ব্যর্থতা মানে শেষ নয়। ব্যর্থতা মানে শেখা। পরের বার আরও ভালো করা।
এই ভয়গুলোই আপনাকে আটকে রাখে। এই ভয়গুলোই আপনার আর সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটার মধ্যে দেয়াল তৈরি করে। কিন্তু মনে রাখবেন—ভয় থাকবেই। সাহসী মানে ভয় নেই, তা নয়। সাহসী মানে ভয় সত্ত্বেও এগিয়ে যাওয়া।
হারানো মানুষটা এখনো আপনার ভেতরেই
শেষ কথা হলো—যে মানুষটা আপনি হতে চেয়েছিলেন, সে হারায়নি। সে কোথাও চলে যায়নি। সে এখনো আপনার ভেতরেই আছে। শুধু চুপ করে আছে। অপেক্ষা করছে। কখনো রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যখন নীরবতা নামে, তখন কি একটা ফিসফিস শোনেন? “তুমি তো এটা করতে চাওনি। তুমি তো অন্য কিছু চেয়েছিলে।” সেটা ওই মানুষটার কণ্ঠস্বর। আপনার আসল সত্তা।
সে ফিরবে। কিন্তু একদিনে নয়। ধীরে ধীরে। একটু একটু করে। প্রতিটা ছোট পদক্ষেপ, প্রতিটা সৎ কথোপকথন, প্রতিটা নিজের জন্য করা কাজ—এসবের মাধ্যমে সে ফিরে আসবে। জীবন আবার শুরু করার জন্য আলাদা অনুমতি লাগে না। নতুন বছরের অপেক্ষা করতে হয় না। কারো কাছ থেকে ছাড়পত্র নিতে হয় না। শুধু একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়—”আমি নিজের কাছে ফিরে যাব।” আর তারপর ছোট একটা পদক্ষেপ। তারপর আরেকটা। তারপর আরেকটা।
আপনি যে মানুষটা হতে চেয়েছিলেন—সে কোথাও যায়নি। সে শুধু আপনার ডাকের অপেক্ষায়।
এখন সময় এসেছে ডাকার। সময় এসেছে নিজের কাছে ফেরার। আর মনে রাখবেন—দেরি হয়ে গেছে, এমনটা কখনো হয় না। যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন সম্ভাবনা আছে। ততদিন আশা আছে। ততদিন নতুন করে শুরু করা যায়।
তো আর দেরি কেন? আজ থেকেই শুরু করুন। নিজের সাথে কথা বলুন। নিজেকে খুঁজতে বের হোন। কারণ সেই মানুষটা—যে আপনি সত্যিই—সে এখনো অপেক্ষা করছে।

