back to top
সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬
HomeWellbeingMental Healthজেন জি আর মিলেনিয়ালদের মধ্যে আসল পার্থক্যগুলো কোথায়?

জেন জি আর মিলেনিয়ালদের মধ্যে আসল পার্থক্যগুলো কোথায়?

“ওকে বুমার” থেকে “চিল ব্রো”—দুই জেনারেশনের ভাষাই আলাদা। কিন্তু পার্থক্যটা শুধু স্ল্যাং বা মিমে সীমাবদ্ধ নয়। জেন জি আর মিলেনিয়ালদের মধ্যে যে ফারাক, সেটা তৈরি হয়েছে তাদের বেড়ে ওঠার সময়, প্রযুক্তির সাথে সম্পর্ক, এবং জীবন সম্পর্কে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থেকে। চলুন দেখি কোথায় কোথায় এই দুই প্রজন্মের আসল পার্থক্য লুকিয়ে আছে।

১. বেসিক ডিফারেন্স: কোন জেনারেশন কারা?

প্রথমে টাইমলাইনটা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক:

Millennials (মিলেনিয়াল): সাধারণত ১৯৮১–১৯৯৬ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া মানুষ। এরা ২০২৬ সালে প্রায় ৩০–৪৫ বছর বয়সী।

Gen Z (জেন জি): সাধারণত ১৯৯৭–২০১২ সালের মধ্যে জন্ম। এদের বয়স এখন ১৪–২৯ বছর।

এই জন্মসালের পার্থক্যই তাদের শৈশব, কৈশোর এবং তারুণ্যের পুরো “দুনিয়া” আলাদা করে দিয়েছে। একজন ১৯৮৫ সালে জন্ম নেওয়া মিলেনিয়াল যখন কলেজে, তখন ফেসবুক সবে চালু হয়েছে। আর একজন ২০০৫ সালে জন্ম নেওয়া জেন জি যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে, তখন আইফোন আর ইউটিউব ইতিমধ্যে তাদের জীবনের অংশ।

২. টেকনোলজির সাথে সম্পর্ক: “ডিজিটাল ইমিগ্র্যান্ট” বনাম “ডিজিটাল নেটিভ”

মিলেনিয়ালরা বড় হয়েছে: ডায়াল-আপ ইন্টারনেট, এমএসএন মেসেঞ্জার, অর্কুট আর ফ্রেন্ডস্টারের যুগে। তারা দেখেছে কীভাবে কম্পিউটার আর ইন্টারনেট ধীরে ধীরে জীবনে প্রবেশ করেছে। তাদের কাছে ডিজিটাল জগৎটা একটা “নতুন আবিষ্কার” ছিল—যেটা শিখতে হয়েছে, মানিয়ে নিতে হয়েছে।

জেন জি বড় হয়েছে: স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, হাই-স্পিড ইন্টারনেট যখন থেকে তারা নিজেদের মনে করতে পারে, তখন থেকেই এসব তাদের আশেপাশে ছিল। তাদের কাছে “অনলাইন” আর “অফলাইন” জীবন আলাদা কিছু নয়—বরং একই জীবনের দুটো স্তর।

ফলাফল:

  • জেন জি স্বাভাবিকভাবেই ফাস্ট, ভিজ্যুয়াল, শর্ট-ফর্ম কন্টেন্টে অভ্যস্ত। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলস, স্ন্যাপচ্যাট—এসবই তাদের কমিউনিকেশনের প্রধান মাধ্যম।
  • মিলেনিয়ালরা তুলনামূলকভাবে লং-ফর্ম কন্টেন্ট, ইমেইল, ব্লগ পোস্ট, ফেসবুকের দীর্ঘ স্ট্যাটাসে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

জেন জি যেখানে ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে পুরো গল্প বলে ফেলতে পারে, মিলেনিয়াল সেখানে একটা থ্রেড লিখে ফেলবে।

৩. কাজ, ক্যারিয়ার, লাইফস্টাইল: দুই ভিন্ন ফিলোসফি

মিলেনিয়ালদের মানসিকতা: “ক্যারিয়ার বানাই, তারপর স্থির হই, তারপর লাইফ ব্যালেন্স আসবে।” তারা বড় হয়েছে এমন সময়ে যখন “ভালো ডিগ্রি → ভালো চাকরি → নিরাপদ ভবিষ্যৎ” এই ফর্মুলা কাজ করত—অন্তত তাদের বাবা-মায়ের জেনারেশনে। তাই তারা শুরুতে হার্ড ওয়ার্ক, লয়্যালটি, “হাসল” মানসিকতা নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিল। অনেকেই unpaid internship, ওভারটাইম, “কোম্পানির জন্য সব” মেনে নিয়েছিল এই আশায় যে একদিন স্ট্যাবিলিটি আসবে।

জেন জির মানসিকতা: “ব্যালেন্স, ফ্লেক্সিবিলিটি, মেন্টাল ওয়েলবিইং—এখনই চাই।”

তারা দেখেছে তাদের বড় ভাই-বোন, কাজিন, এমনকি বাবা-মা কীভাবে “সব ঠিকঠাক করেও” নিরাপত্তা পায়নি। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পরবর্তী প্রভাব, কোভিড-১৯, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার খরচ—এসব দেখে তারা বুঝেছে যে “সিস্টেম” আর নির্ভরযোগ্য নয়। তাই তারা প্রথম থেকেই তাদের শর্তে জীবন সাজাতে চায়।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন দেশের সার্ভেতে দেখা গেছে, ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স এখন অনেক তরুণের কাছে বেতনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জেন জি রিমোট ওয়ার্ক, ফ্লেক্সিবল আওয়ার, সাইড হাসল, মাল্টিপল ইনকাম স্ট্রিম—এসব নিয়ে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। তাদের কাছে একটা কোম্পানিতে ২০ বছর কাজ করা “লয়্যালটি” নয়, বরং “রিস্ক”।

৪. “ট্রমা টাইমিং”: কোন সংকট কখন তাদের ছুঁয়েছে

জেনারেশনাল পার্থক্য বুঝতে হলে বুঝতে হবে তারা কোন সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে এবং কখন।

মিলেনিয়ালরা দেখেছে:

  • ৯/১১ হামলা (টিনেজ বা তরুণ বয়সে)—এটা তাদের “নিরাপত্তা” সম্পর্কে ধারণাই বদলে দিয়েছিল।
  • ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট (ক্যারিয়ার শুরুর সময়)—ডিগ্রি নিয়েও চাকরি নেই, লোন শোধ করা যাচ্ছে না, স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে।

ফলাফল: মিলেনিয়ালদের মধ্যে একটা “হাসল মেন্টালিটি” তৈরি হয়েছে—সবকিছু করতে হবে, একাধিক দক্ষতা থাকতে হবে, নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। একইসাথে তারা লয়্যালটির বিনিময়ে স্ট্যাবিলিটি খুঁজেছে, কিন্তু সেটা সবসময় পায়নি।

জেন জি দেখেছে:

  • ২০০৮ সালের সংকটের পরবর্তী স্ট্রাগল (শৈশবে পারিবারিক চাপ, অনিশ্চয়তা দেখে বড় হওয়া)।
  • কোভিড-১৯ (কৈশোর বা তরুণ বয়সে)—স্কুল, কলেজ, প্রথম চাকরি সব ডিসরাপ্ট হয়ে গেছে।
  • ক্লাইমেট ক্রাইসিস, সামাজিক অস্থিরতা—এসব তাদের জন্ম থেকেই কনভার্সেশনের অংশ।

ফলাফল: জেন জির মধ্যে একটা মনোভাব হলো, “কোনো সিস্টেমই নির্ভরযোগ্য নয়।” তাই তারা সাইড হাসল করে, মাল্টিপল ইনকাম স্ট্রিম খোঁজে, “YOLO কিন্তু সাবধানে” মানসিকতা নিয়ে চলে।

৫. টাকা-পয়সা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি

মিলেনিয়াল:

“Experiences over things” মুভমেন্ট তারাই শুরু করেছিল। বড় বাড়ি, গাড়ির চেয়ে ভ্রমণ, কনসার্ট, খাওয়াদাওয়ায় খরচ করতে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। কিন্তু এখন অনেকেই বুঝতে পারছে যে প্রপার্টি কেনা, আর্থিক নিরাপত্তা পাওয়া তাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে গেছে। তাই তাদের মধ্যে একধরনের হতাশা কাজ করছে।

জেন জি:

তারা মিলেনিয়ালদের “experiences over things” কালচার inherit করেছে, কিন্তু একইসাথে আর্থিকভাবে অনেক বেশি সচেতন এবং মিতব্যয়ী। অল্প বয়স থেকেই তারা ইনভেস্টিং অ্যাপস, ক্রিপ্টো, ফিনটেক ব্যবহার করছে। তাদের মধ্যে একটা ট্রেন্ড হলো: “লাক্সারি দেখাতে চাই কিন্তু বাজেটে।” থ্রিফটিং, ডুপ (নকল কিন্তু সাশ্রয়ী প্রোডাক্ট), লাইফ হ্যাকস—এসব তাদের কালচারের অংশ।

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ জেন জির দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত (ডেটিং, সেভিংস, ক্যারিয়ার) পর্যন্ত প্রভাবিত করছে। অনেকেই “ফিন্যান্সিয়াল সেফটি” কে প্রথম অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

৬. মেন্টাল হেলথ নিয়ে কথা বলা

মিলেনিয়াল:

তারাই প্রথম জেনারেশন যারা মেন্টাল হেলথ, থেরাপি, সেলফ-কেয়ার নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা নর্মাল করেছে। তাদের বাবা-মায়ের জেনারেশনে এসব “দুর্বলতার লক্ষণ” ছিল। মিলেনিয়ালরা সেই ট্যাবু ভাঙতে শুরু করেছে। তবে অনেকেই “suffer in silence → তারপর speak up” এই প্যাটার্নের মধ্য দিয়ে গেছে।

জেন জি:

তাদের কাছে মেন্টাল হেলথ জন্ম থেকেই কনভার্সেশনের অংশ। বাউন্ডারি সেট করা, টক্সিক রিলেশনশিপ/এনভায়রনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসা, নিজের যত্ন নেওয়া—এসব তাদের কাছে “নরমাল লাইফ স্কিল।”

তবে একইসাথে “পারফরমেটিভ ভালনারেবিলিটি” (দেখানোর জন্য দুর্বলতা প্রকাশ), ওভারশেয়ারিং, মেন্টাল হেলথ টার্মের অতিরিক্ত ব্যবহার—এসবও একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৭. কর্তৃত্ব আর প্রতিষ্ঠানের প্রতি মনোভাব

মিলেনিয়াল:

তারা সিস্টেমের ভেতর থেকে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে। “Disruption” তাদের একটা প্রিয় শব্দ—কিন্তু সেটা একটা structure-এর মধ্যে থেকে। স্টার্টআপ কালচার, টেক ইন্ডাস্ট্রির উত্থান—এসবের পেছনে মিলেনিয়ালদের অবদান অনেক।

জেন জি:

তারা মূলত সিস্টেমেই বিশ্বাস করে কম। তাদের কাছে ডিসেন্ট্রালাইজড সল্যুশন, কমিউনিটি-বেসড অ্যাক্টিভিজম, গ্রাসরুট মুভমেন্ট বেশি আকর্ষণীয়। “Cancel culture” যতই সমালোচিত হোক, এটা আসলে জবাবদিহিতার (accountability) দাবির একটা রূপ। জেন জি মনে করে, যদি প্রতিষ্ঠান তাদের দায়িত্ব না নেয়, তাহলে জনগণই নেবে।

৮. সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা

মিলেনিয়াল:

তারা সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা, পরিবেশ রক্ষা—এসব নিয়ে সচেতন হয়েছে ধীরে ধীরে। অনেকেই কলেজে গিয়ে বা কর্মজীবনে এসে এসব ইশু নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।

জেন জি:

তাদের কাছে এসব ইশু childhood থেকেই present। ক্লাইমেট চেঞ্জ, LGBTQ+ রাইটস, রেসিয়াল জাস্টিস—এসব তাদের কাছে “নতুন আন্দোলন” নয়, বরং বেসিক হিউম্যান রাইটস। তারা অনেক বেশি ইনক্লুসিভ, অনেক বেশি সরাসরি, এবং নিজের বিশ্বাসের জন্য দাঁড়াতে দ্বিধা করে কম। একইসাথে তারা performative activism আর real action-এর পার্থক্যও বোঝে।

আসল কথা

জেন জি আর মিলেনিয়াল—দুই জেনারেশনই মূলত একই রকম জিনিস চায়: ন্যায্যতা, জীবনের অর্থ, ভারসাম্য, সম্মান। কিন্তু পার্থক্য হলো জেন জি এগুলো negotiable মনে করে না, মিলেনিয়ালরা negotiate করতে শিখেছিল।

এটা “entitled” (বেশি দাবিদার) হওয়া নয়। এটা তাদের রিয়েলিটি। তারা দেখেছে তাদের বড়রা “সঠিক কাজ” করেও সিকিউরিটি পায়নি, তাই নিজেদের শর্তে জীবন সাজাতে চাইছে। তারা জানে যে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তাই বর্তমানটাকে যতটা সম্ভব নিজেদের মতো বানাতে চাইছে।

মিলেনিয়ালরা “আশা করেছিল” সিস্টেম কাজ করবে। জেন জি “জানে” সিস্টেম ভাঙা—এবং তারা নতুন করে সবকিছু ভাবছে।

এবং এই পার্থক্যটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular