আমরা ভাবি, আমাদের সিদ্ধান্ত আমরাই নিচ্ছি, পুরোটাই আমাদের ইচ্ছাশক্তির ফল। কিন্তু বাস্তবতা একটু অন্যরকম।
আমাদের চারপাশের জায়গা, জিনিসপত্রের অবস্থান, এমনকি ঘরের আলো পর্যন্ত ঠিক করে দেয় আমরা কী করব। আর এই সত্যিটা জানার পর জীবনটাকে দেখার চোখ পুরো বদলে যায়। কারণ তখন বুঝতে পারো, নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করার আগে, চারপাশটা বদলানো অনেক সহজ আর অনেক বেশি কার্যকর।
Cornell University-এর গবেষক Brian Wansink তাঁর বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষ প্রতিদিন খাবার নিয়ে প্রায় ২০০টা সিদ্ধান্ত নেয়, অথচ তার বেশিরভাগই সচেতনভাবে না, শুধু আশেপাশের পরিবেশ দেখে। প্লেটের সাইজ, খাবারের দূরত্ব, এমনকি আলোর রং পর্যন্ত প্রভাব ফেলে কতটা খাওয়া হবে। তাহলে চলো দেখি, পরিবেশ কীভাবে আমাদের সিদ্ধান্তকে গড়ে তোলে, আর কীভাবে সেটাকে নিজের পক্ষে কাজে লাগানো যায়।
Willpower একটা সীমিত সম্পদ
মানুষ ভাবে, শক্ত মনোবল থাকলেই সব ঠিক থাকবে। কিন্তু psychologist Roy Baumeister-এর গবেষণা বলছে, willpower একটা পেশির মতো, সারাদিন ব্যবহার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়। এই ধারণাটাকে বলা হয় “ego depletion”। তাই রাতের বেলা, যখন willpower সবচেয়ে কম থাকে, তখনই সবচেয়ে বেশি ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ফোন ঘাঁটা, অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, প্ল্যান ভেঙে ফেলা।
Friction কমালে ভালো অভ্যাস সহজ হয়
জিমের কাপড় আগের রাতে গুছিয়ে রাখলে সকালে জিমে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কারণ তুমি একটা বাধা আগেই সরিয়ে ফেলেছ। BJ Fogg-এর গবেষণা বলে, একটা কাজ যত সহজ করে ফেলা যায়, সেটা করার সম্ভাবনা তত বাড়ে। এটাকেই বলা হয় “friction reduction”, ভালো অভ্যাসের পথে বাধা কমানো।
দূরত্ব বদলে দেয় সিদ্ধান্ত
চিপসের প্যাকেট চোখের সামনে থাকলে খাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়, আলমারির উঁচু তাকে রাখলে সেটা অনেক কমে যায়। এই সহজ নীতিটাই কাজে লাগে যেকোনো অভ্যাসে। যা চাও কম করতে, সেটাকে দূরে রাখো, যা চাও বেশি করতে, সেটাকে কাছে রাখো।
দৃশ্যমানতা মনে করিয়ে দেয়
টেবিলের উপর বই রাখা আর ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা, দুটোর প্রভাব সম্পূর্ণ আলাদা। যা চোখের সামনে থাকে, মস্তিষ্ক সেটাকেই অগ্রাধিকার দেয়। তাই যে কাজটা করতে চাও, সেটার সাথে সম্পর্কিত জিনিস চোখের সামনে রাখো, বাকি সব সরিয়ে দাও।
সামাজিক পরিবেশও একটা পরিবেশ
শুধু ঘরের জিনিসপত্র না, আমাদের আশেপাশের মানুষও একটা পরিবেশ। গবেষক Nicholas Christakis আর James Fowler-এর গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষের অভ্যাস তার বন্ধুদের অভ্যাসের সাথে গভীরভাবে জড়িত। যাদের সাথে বেশি সময় কাটাও, তাদের চিন্তাভাবনা আর অভ্যাস ধীরে ধীরে তোমার মধ্যেও চলে আসে।
ডিজিটাল পরিবেশও প্রভাব ফেলে
ফোনের হোম স্ক্রিনে কোন অ্যাপ আছে, নোটিফিকেশন কতবার আসছে, এগুলোও একটা পরিবেশ। distraction-এর অ্যাপগুলো এক স্ক্রিন পেছনে রাখলেই ব্যবহার কমে যায় লক্ষণীয়ভাবে, কারণ একটা ছোট friction যোগ হয়ে যায়।
একবার বদলালে, বারবার সিদ্ধান্ত নিতে হয় না
পরিবেশ ঠিক করে ফেলার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটা একবারের কাজ। প্রতিদিন সকালে সিদ্ধান্ত নিতে হয় না, জিমে যাব কিনা, কারণ কাপড় আগেই গোছানো। এভাবেই ভালো সিদ্ধান্তগুলো অভ্যাসে পরিণত হয়, প্রতিদিনের যুদ্ধ ছাড়াই।
তুমি যতটা ভাবো, নিজেকে ততটা বদলাতে হয় না। বদলাতে হয় শুধু চারপাশটা। একটা বই কাছে আনো, একটা ফোন দূরে সরাও, একটা মানুষ বেছে নাও যার পাশে থাকলে তুমি আরও ভালো হয়ে ওঠো। কারণ জীবন গড়ে ওঠে বড় বড় সিদ্ধান্তে না, প্রতিদিনের ছোট ছোট পরিবেশে। আর সেই পরিবেশটা বদলানোর ক্ষমতা, পুরোটাই তোমার হাতে।

