বাংলাদেশের গল্পটা একটু অন্যরকম।
আমরা যখন অর্থনীতির কথা বলি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির বিশাল চিমনি, রেমিট্যান্স, কিংবা বড় বড় কর্পোরেট হাউজের নাম। কিন্তু আসল গল্পটা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। মহল্লার মোড়ের ছোট্ট ওয়ার্কশপে, একজন নারীর ঘরে বসে চালানো অনলাইন বুটিকে, কিংবা একজন তরুণের গ্যারেজে শুরু হওয়া স্টার্টআপে।
এরাই SME। আর এরাই আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
সংখ্যাগুলো কী বলছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে SME খাতের GDP-তে অবদান ছিল ২৪.৪৫ শতাংশ, যেখানে ২০২১ সালে এটি ছিল ২৩.৩৬ শতাংশ। অন্যান্য পরিসংখ্যান বলছে, দেশে SME খাত GDP-র ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ অবদান রাখে, অথচ মোট শিল্প-কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশই এই খাত থেকে আসে।
ভাবুন তো, চারভাগের একভাগ অর্থনীতি, কিন্তু কর্মসংস্থানের পাঁচভাগের চারভাগ। এই অনুপাতটাই বলে দেয় কেন এই খাতকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
আর সংখ্যাটা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এর পেছনে আছে মানুষ। ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারি বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ১.১৮ কোটি অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে, যার বিশাল অংশই micro, small আর medium enterprise। এর মানে, লাখো পরিবারের রুটি-রুজি সরাসরি এই খাতের সঙ্গে জড়িত।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই খাত
বড় শিল্পকারখানা গড়তে লাগে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ, বছরের পর বছরের পরিকল্পনা। কিন্তু একটা SME শুরু করা যায় তুলনামূলক অল্প পুঁজিতে। একটা সেলাই মেশিন, একটা ল্যাপটপ, কিংবা একটা ছোট্ট দোকান দিয়েই শুরু করা যায়।
এই সহজলভ্যতাই SME-কে বানিয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ন্যায্যতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। যে নারী চাকরির বাজারে সুযোগ পাননি, তিনি ঘরে বসে অনলাইন ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। যে তরুণ বড় কোম্পানিতে চাকরি না পেয়ে হতাশ ছিল, সে নিজের একটা উদ্যোগ দাঁড় করিয়ে আজ অন্যদের চাকরি দিচ্ছে।
কোভিডের সময় এই সত্যিটা আরও স্পষ্ট হয়েছিল। যখন আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল, তখন হাজার হাজার নতুন ছোট উদ্যোগ অনলাইনে জন্ম নিয়েছিল, টিকে থাকার লড়াইয়ে।
কিন্তু লড়াইটা এখনও কঠিন
সত্যি বলতে, গল্পটা শুধু ফুলেল না। SME Foundation-এর হিসেবে, ২০২৪ সালের শুমারিতে দেখা গেছে দেশের ৫৬ শতাংশেরও বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়ে গেছে। মানে নেই ব্যাংক ঋণের সুবিধা, নেই আইনি স্বীকৃতি, নেই প্রবৃদ্ধির পথ সহজ করার কাঠামো।
আর ঋণের সংকট তো আছেই। ব্যাংকগুলো বড় কোম্পানিকে ঋণ দিতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, ছোট উদ্যোক্তার বেলায় ঠিক ততটাই দ্বিধা করে। জামানতের অভাব, ক্রেডিট হিস্ট্রির অভাব, সবকিছু মিলিয়ে পথটা কঠিন হয়ে যায়।
ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয়। ভিয়েতনামে SME সংখ্যা কম হলেও তাদের গড় আউটপুট অনেক বেশি, কারণ সেখানে এই খাত আরও সংগঠিত, আরও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাপ্রাপ্ত। বাংলাদেশে আমাদের সংখ্যা বেশি, কিন্তু প্রতিটা উদ্যোগের গড় উৎপাদনশীলতা অনেক কম। এর মানে দাঁড়ায়, সমস্যাটা সংখ্যায় নয়, সক্ষমতায়।
২০৩০-এর স্বপ্ন
সরকার ও SME Foundation-এর লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে GDP-তে SME খাতের অবদান ৩৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ সহজ না হলেও অসম্ভবও নয়, যদি ডিজিটাল ব্যাংকিং, সহজ ঋণ প্রক্রিয়া আর দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ এই উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়।
কারণ এই খাতের প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা গল্প আছে। কেউ হয়তো নিজের সংসার চালাচ্ছে এই ছোট্ট ব্যবসা দিয়ে, কেউ হয়তো গড়ে তুলছে আগামী দিনের বড় কোনো ব্র্যান্ডের ভিত্তি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি একটা শরীর হয়, তাহলে SME তার মেরুদণ্ড। হয়তো সবচেয়ে আলোচিত অঙ্গ নয়, কিন্তু এটাই পুরো শরীরটাকে সোজা দাঁড় করিয়ে রাখে। আর এই মেরুদণ্ডকে যত শক্তিশালী করা যাবে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ততটাই দাঁড়াবে নিজের পায়ে।

