সম্পর্ক বলতে মূলত আমরা কি বুঝি?

সম্পর্ক এই শব্দটি যেন সব কিছু থেকে ভিন্ন। সম্পর্কের শ্রেণীবিভাগও আছে অসংখ্য। কত ধরনের যে সম্পর্ক হতে পারে তা হয়তো কিছু মানুষের বোধেই আসবে না। তেমনিভাবে সম্পর্কের টানাপরাও হয় বিভিন্নভাবে। তার শুরু হয় যেমন ভিন্ন তেমনি তার শেষটাও। সম্পর্কের সুতো যেন অদৃশ্য। কিন্তু তারপরেও মানুষ এর টান ঠিক অনুভব করতে পারে প্রতিনিয়ত। সেই টানে কিছুটা ঢিল পড়লেই তারও অভিযোগ কম কিছু নয়।

 

‘The word relationship is a completely different thing’

 

সম্পর্ক মূলত কি

 

এটা কি একটি পারিপার্শ্বিক আকর্ষণ, নাকি পিতা-মাতা থেকে চলে আশা জিনেটিক একটি প্রতিফলন। তাই যদি হতো তবে  সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি মানুষকে একটি সম্পর্ক কিভাবে এক নতুন বাঁধনে বেঁধে ফেলতে পারেতাহলে কি আমরা বলতে পারি না সম্পর্ক মূলত একটি পারস্পরিক চর্চা যাকে পরিচর্যার মাধ্যমে আমরা একটি নতুন রূপ দিয়ে থাকি। পূর্বেই বলেছি সম্পর্কের কোন শ্রেনীবিভেদ নেই কিন্তু সম্পর্কের বিভিন্ন নামকরণ হয়। এই সম্পর্কেই আমরা কখনো হয়ে উঠি বন্ধু, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, ভাই-বোন বা বিভিন্ন আত্মীয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পর্কগুলোও হয়ে ওঠে ভিন্ন। কখনো কাছের মানুষ দূরে চলে যায় আবার কখনও সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ হয়ে ওঠে কাছের।

 

তাহলে এই যে সম্পর্ক তার ভিত্তি কি?

 

কিছু মানুষিক গঠন নাকি সামাজিক কিছু বিধি। সম্পর্ক তার ডালা নিয়ে আমাদের কাছে আসে না আমরা তার থেকে আমাদের সুবিধা মতো সম্পর্কগুলো পছন্দ করি। অদ্ভুত এই সম্পর্কের ধরন কখনো হয়তো এমন হয়ে যায় যে ঐ সম্পর্ক ছাড়া আমরা যেন কিছুই ভাবতে পারি না, জীবন যেন থেমে গেছে মনে হয়। নিজেদেরকে অসম্পূর্ণ মনে হতে শুরু করে এবং কখনোবা বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন মনে হয়। তাই এই সম্পর্কের ভিত্তি নির্দিষ্টভাবে বলা কিছুটা জটিল।

 

তাহলে সম্পর্ককে কি বলা যায়?

 

সম্পর্ক একটি ফুলের মালা যা শুকিয়ে গেলে নষ্ট হয়,  যা ছিড়ে গেলেও নষ্ট হয় আবার ধুলো লাগলে কিংবা মলিন হলেও আমরা তা বুঝতে পারি। তাহলে কি বলা যায় না সম্পর্ক অনেক সংবেদনশীল। যাকে ছোঁয়া বা স্পর্শ করা যায় না কিন্তু যা পুরাতন কিংবা নষ্ট হয়ে যাবার ভয় থাকে।

 

সম্পর্ক যেন একটি উপলব্ধি। মানুষ তার নিজের গণ্ডী থেকে তা রচনা করে থাকে। সম্পর্ক সম্পূর্ণ অচেনা কিছু মানুষকে জীবনের অংশ করে তোলে। কখন যে এই মানুষগুলো নিজের অস্তিত্বের অংশ হয়ে যায় মানুষ তা বুঝতেও পারে না। মানুষে মানুষে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ জীবন পথের উঁচু নিচু রাস্তাগুলো পাড় করতে যে লোকগুলো এগিয়ে আসে তাদেরকেই হয়তো দুহাতে জড়িয়ে নিয়ে মানুষ গড়ে তোলে নতুন সম্পর্ক। সম্পর্কের কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এটি কখন কার সাথে কিভাবে গড়ে উঠবে মানুষ তা নিজেও বলতে পারে না। 

 

সম্পর্ক মূলত কিসের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে?

একটি সম্পর্ক মূলত কতগুলো উপাদানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। কিংবা বলা যায় যে একটি সম্পর্কের কাঠামো মূলত কতগুলো উপাদানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। উপাদানগুলো নিম্নরূপঃ

১। সততা:  সততা একটি মানবিক গুনাবলি। এটি একজন মানুষকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। সততা একটি অত্যন্ত সুন্দর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যা একটি মানুষকে অন্যদের কাছে সম্মানিত করে তোলে।

২। ওয়াদা বা কথা দিয়ে কথা রাখার প্রবণতাঃ ওয়াদা একটি কঠিন শব্দ যার গুরুত্ব অনেক এই মানব জীবনে। যে লোক কথা দিয়ে কথা রাখে না সে কখনো নিজেকে একজন ভাল মানুষ বলে দাবী করতে পারে না। যেকোনো ধরনের সম্পর্ক ওয়াদার মাধ্যমে গড়ে ওঠে।

৩। বিশ্বস্ততাঃ যেকোনো সম্পর্কের মাঝে বিশ্বস্ততা থাকা জরুরী। অন্যথায় কোন সম্পর্কই টিকে থাকে না। বিশ্বস্ততা অনেকটা দায়বদ্ধতার সাথেও সম্পর্কিত। তাই বর্তমান সমাজে এই বিশ্বস্ততায় খুব সহজেই চির ধরতে দেখা যায়।

 

৪। বন্ধুত্তঃ বন্ধুত্বের মত মিষ্টি সম্পর্ক বোধহয় আর কোথাও নেই। বন্ধুত্ব এমন একটি বাঁধন যা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির বা আচরণের মানুষের সাথে গড়ে উঠতে পারে নিমিষেই। বন্ধুত্ব খুব সহজেই দুটি মানুষের মাঝে প্রাণের সখ্যতা গড়ে তোলে এবং তা আলোয় আলোয় ভরিয়ে দেয়। 

 

৫। দায়িত্ব নেয়ার ক্ষমতাঃ দায়িত্ব যা কিনা একটি ভারি শব্দ। প্রতিটি মানুষই এর ভার বহন করতে কিছুটা কুণ্ঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু যেকোনো সম্পর্ক গড়তে গেলেই এই শব্দটি চলে আসে। যেকোনো সম্পর্কের ভিত্তি যেন এই শব্দটির সাথে জড়িত। তাই যে মানুষের এই দায়িত্ব নেয়ার ক্ষমতা বেশি থাকে সে খুব সহজেই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে থাকে।

 

৬। বোঝার ক্ষমতাঃ একটি সুন্দর সম্পর্ক অনেকটা নির্ভর করে একে অপরের বোঝার ক্ষমতার উপর। যখন একজন অন্যজনের প্রয়োজন সুবিধা- অসুবিধা,  রাগ-অনুরাগ বিভিন্ন অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করে এবং কিছুটা বুঝতে পারে তখনই একটি সুন্দর সম্পর্কের সৃষ্টি হয়।

 

৭। স্বচ্ছতাঃ মনের দুয়ার যার স্বচ্ছ কাঁচের মত তার দৃষ্টি হয় সুন্দর ও মলিন। আর এমন একটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে থাকে সে হয়ে যায় অনন্য।

 

৮। ভালোবাসাঃ  ভালোবাসা শব্দটি একটি অনুভূতির সাথে জড়িত। পৃথিবীতে মনে হয় কেবল মানুষই আছে যেকিনা ভালোবাসার অনুভূতিগুলো ব্যক্ত করতে জানে সুন্দর সুগভীর শব্দ চয়নে।

 

এ সকল উপাদানের মিশ্রণে একটি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারপরেও কিছু থেকে যায় যা কিনা মানুষ তার ব্যক্তিগত দক্ষতা বা গুণাবলীর দ্বারা অতিক্রম করে যায়।

 

খুব স্বাভাবিক একটি সম্পর্ক বৈবাহিক সম্পর্ক তা মূলত কি?

 

বিয়ে মূলত একটি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। যা কিনা সমাজ ২ টি মানুষ কে দিয়ে থাকে এবং এর মাধ্যমে ২ জন মানুষ একসাথে থাকার অঙ্গীকার দিয়ে থাকে। এর সাথে দেশের কিছু আইনও জড়িত থাকে। যা কিনা একে অপরের প্রতি  একটি দায়বদ্ধতার সৃষ্টি করে। এর ফলে ২ টি মানুষ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় এবং কিছু দায়িত্বে জড়িয়ে পড়ে একে অপরের প্রতি।

 

এখন প্রশ্ন চলে আসে  বৈবাহিক সম্পর্কে না গিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক ভাল/ একত্রে থাকার প্রবণতা ভাল। এটি নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে।

 

লিভিং রিলেশনসিপকে খুব খারাপ বলা যায় ব্যপারটা তা নয়। যখন ২ টি মানুষ ওয়াদাবদ্ধ হয় কিন্তু নিজেদের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায় তখন এধরনের সম্পর্ক হতেই পারে। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এখনও এতটা উদার নয়। তাই এক্ষেত্রে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যায় না। এবং নিজেদের বাচ্চাদের জন্য এটি একটি পরিচয় সঙ্কট হয়ে দাঁড়ায়। যা কিনা কোন  বাচ্চার মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকারক।

 

সর্বোপরি বলা যায়, সম্পর্ক এবং তার রেশ মানুষের মনে রয়ে যায় আজীবন। সম্পর্ক মূলত এক অদ্ভুত উপলব্ধিরই নাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *