1148 Views

কিছুদিন আগেই আমি সর্বাধিক বিক্রিত লেখক ব্রুস ওয়েইনস্টাইনের একটি প্রবন্ধ পড়লাম। তিনি “Ethical Intelligence” “The Good Ones” এর মত বিখ্যাত বইয়ের রচয়িতা । তার প্রবন্ধ “Should vs Would” লেখাটি প্রথমে “নাইট রাইডার ট্রিবিউন” নিউজ সার্ভিসে এবং পরবর্তীতে “ক্যান্সেসিটি ডট কম”  এ প্রকাশিত হয়। ওয়েইনস্টাইনকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে “আপনি কী করবেন?” এবং “আপনার কী করা উচিত?” এর মধ্যে পার্থক্য কী?

 

আমার কাছে আলোচনাটি নীতিশাস্ত্র এবং নৈতিকতার মত কঠিন বিষয়ের উপর কৌতুহল উদ্রেককারী, কিন্তু সহজপাঠ্য বলে মনে হয়েছে। চলুন আমরা দেখে আসি, এ ব্যাপারে ওয়েইনস্টাইনের উত্তরটি কী ছিল। 

 

মানবিকতা বনাম নৈতিকতা 

 

ওয়েইনস্টাইন বলেন যে প্রশ্নটির প্রথম যে অংশ, “আপনি কী করবেন?” – একটি মানবিক প্রশ্ন। তিনি বোঝান যে, মনোবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে আমরা যা করি তা কেন করি। প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশটি, “আপনার কী করা উচিত?” একটি নৈতিক প্রশ্ন। আর নৈতিকতা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি কিনা।

 

মানবিকতা মূলত সেই বৈশিষ্ট্যগুলো যা একজন মানুষকে “আশরাফুল মাখলুকাত” এর আসনে পর্যবসিত করে।অপরদিকে নৈতিকতা বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যাপার। নৈতিকতা হচ্ছে তাই যা আমাদের বিবেক বোধের জাগরণ ঘটায়, ন্যায় ও অন্যায়ের বিভেদ শেখায় ও সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে।

 

বাস্তব জীবনে প্রয়োগ

 

সমগ্র বিষয়টি বুঝতে কঠিন মনে হলে আসুন উদাহরণের সাহায্যে আমরা বোঝার চেষ্টা করি। চলুন দেখি ওয়েইনস্টাইন কোন উদাহরণে কিভাবে এটি ব্যবহার করেন।

 

“যদি আপনি একজন মা অথবা বাবা হন, তবে আপনার সন্তানকে জিজ্ঞাসা করুন যে, সে পরীক্ষায় একজনকে নকল করতে দেখলে কী করবে। আপনার সন্তান যদি বাকি দশটা বাচ্চার মত হয়, তাহলে তার উত্তর হবে যে তারা বিষয়টি নিজের কাছে রাখবে, টিচারকে জানাবে না।”

 

এইবার একই প্রশ্ন করার সময় শব্দ ব্যবহারে একটু পরিবর্তন প্রস্তাব করুন। যেমন, আমরা যদি জিজ্ঞেস করি “তোমার বন্ধুকে নকল করতে দেখলে তোমার কী করা উচিত?”। তাহলেই হয়তো উত্তরটি সম্পূর্ণ বদলে যাবে। কারণ, এইবারের প্রশ্নটি তার মনে বিবেকবোধের জাগরণ ঘটাবে। হয়ত সে উত্তর দিবে যে, আমি সেই বন্ধুর সাথে কথা বলবো এবং প্রয়োজনে শিক্ষককেও ব্যাপারটা জানাবো। এইভাবেই একটিমাত্র শব্দের পরিবর্তন এনে দিতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রতিক্রিয়া।

 

এমন আরো অনেক উদাহরণ দিয়েই এই বিষয়টি তুলে ধরা যায়। তার মধ্যে শুধু এই একটি উদাহরণ দিয়েই ওয়েনস্টাইন আমাদের প্রকৃত আচরণ ও করণীয় আচরণের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরলেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে।

 

একটি সাধারণ শব্দ বদলে দেয় সবকিছু

 

ওয়েইনস্টাইনের পরামর্শমতে, আমরা যখন কোনো সমস্যা নিয়ে কোন বন্ধুর কাছে সাহায্য চাইতে যাবো, তখন যেন আমরা আমাদের বলা কথা ও বন্ধুর ব্যক্ত প্রতিক্রিয়ার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেই। উদাহরণস্বরূপ, আমরা হয়ত বললাম যে “এই কাজটা আমি করতে পারছি না, তুমি কি আমায় সাহায্য করবে?”। সে বলতে পারে যে সে ব্যস্ত বা দেখাতে পারে অন্য যেকোনো অজুহাত । কিন্তু, আমরা যদি একটু অন্যভাবে প্রশ্নটা করি, যেমন, “আমি তো এই কাজটা করতে পারছি না, তোমার কী মনে হয় আমার কী করা উচিত?” বা “তুমি কী করা ঠিক মনে করো?”।

 

তাহলে হয়তো তার সাহায্য করার বা করতে চাওয়ার সম্ভাবনা আরো বেশি থাকবে। কারণ, শুধুমাত্র এই উচিত শব্দটাই আমাদের কথা বলার ধরণটাই সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ওয়েইনস্টানের মতে, বাক্যের সামান্য একটি গঠনগত পরিবর্তন  বন্ধুকে তার উত্তরের স্বপক্ষে ন্যায্যতা প্রকাশ করতে বাধ্য করবে। তাই আপনি কোন প্রশ্নে কোন শব্দ কিভাবে ব্যবহার করছেন এবং কেউ কিভাবে সেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে সেই বিষয়ে মনোনিবেশ করুন। তাহলেই, নিজের জীবনেই ওয়েনস্টাইনের ব্যাখ্যার অসংখ্য বাস্তব উদাহরণ দেখতে পারবেন।

 

প্রশ্নেই প্রয়োজনীয় আপিল তৈরি

 

ওয়েনস্টাইনের ব্যাখ্যায় মূলত, “আপনি কী করবেন?” প্রশ্নটি মনোবিজ্ঞানের একটি আপিল; যেখানে “আপনার কী করা উচিত?” প্রশ্নটি নৈতিকতার একটি আপিল। সাধারণ একটি প্রশ্ন যার দুইটি রূপ, তবে উভয়েরই গভীর প্রভাব রয়েছে।

 

নিজেদের কথার মাধ্যমে আমাদের প্রয়োজনীয় আপিলটি অন্যের সামনে তৈরি করতে হবে। তবেই আমাদের কার্যোদ্ধার করার পথ সুগম হবে। কেননা বাক্যের গঠনগত সামান্য পরিবর্তন  যে কোনো কাহিনীর প্রেক্ষাপটের প্রতিক্রিয়াই বদলে দিতে সক্ষম। পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরও উচিত আমাদের নৈতিক দায়িত্বগুলো পালন করা।

 

পরিশেষে, শব্দের ব্যবহার কোন বাক্যে কতটা প্রভাব ফেলে তা বুঝতে উইলিয়াম শেরউড ফক্সের নিম্নলিখিত উদ্ধৃতি দিয়ে এখানেই শেষ করবো, “আমরা একটি সহজ প্রশ্ন করবো এবং আমাদের ইচ্ছা শুধু তাই; জেলেরা কি সব মিথ্যাবাদী হয়? নাকি জেলে হয় শুধু মিথ্যাবাদীরাই ?” 

 

“We ask a simple question, and that is all we wish: Are fishermen all liars? Or do only liars fish?”

 

উনি কী বলতে চেয়েছেন বুঝতে পারলেন কি?

Sanghita

A sleepy girl with loads of dreams. A Bangladesh girl with opinions! A seemingly headstrong girl with a belief that everyone and everything has a good side whether we see it or not.

More Posts

Follow Me:
facebook LinkedIn twitter