394 Views

আমান (ছদ্মনাম) খুব ভালো গান গাইতে পারে। বড় হয়ে গায়ক হতে চায় সে। কিন্তু তার বাবা মায়ের ইচ্ছা সে বুয়েটে পড়বে, বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। একদিকে পড়াশোনার চাপ আর বাবা-মায়ের ইচ্ছা, অন্যদিকে নিজের শখ- এসব চিন্তা মাথায় নিয়েই সে এইচএসসি পরীক্ষা দিলো। কিন্তু রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেই সে অংশগ্রহণ করতে পারলো না। তাকে নিয়ে সবাই হতাশ! আশেপাশের কাউকে মুখ দেখাতে পারছিলো না তার পরিবার। ধীরে ধীরে তার পৃথিবীটা বদলে যেতে লাগলো।

 

লাভলি বেগম (ছদ্মনাম) গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া এক কিশোরী। দিনমজুর বাবার পক্ষে তাদের পরিবারে দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের যোগান দেয়াই সম্ভব হতো না। অল্পবয়সে বিয়ের পর যৌতুকের টাকা যোগাড় না হওয়ার কারণে স্বামীর মারধর ও শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে মন ভেঙে যাচ্ছিলো লাভলির।

 

গল্প দুটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, এই দু’টি মানুষের পরিণতি হয়েছিল কিন্তু একই। সুন্দর জীবনকে ফেলে বেছে নিয়েছিলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট পথ- আত্মহত্যা। আত্মহত্যা মহাপাপ -এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু তারপরও এই প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আত্মহত্যা মানে কেবল নিজের জীবনটাই না, আপনজনদের জীবনটাও শেষ করে দেয়া। আশংকার বিষয় হচ্ছে, সম্প্রতি আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ুয়া মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও। যেখানে চান্স পাওয়া মানেই স্বপ্নকে ছোঁয়ার সুযোগ পাওয়া, তাও কেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মেধাবী শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করছে? দোষটা তাহলে কোথায় কিংবা কার? আমরা কি নিজেদের মতো করে বাঁচতে পারিনা নাকি আমাদেরকে সংগ্রাম করে বাঁচতে শেখানো হয়নি?

 

জীবনে ভালো সময় যেমন থাকে, ঠিক তেমনি খারাপ সময়ও থাকে। কখনো আসে স্বচ্ছলতা আবার কখনো অভাব-অনটন। কিন্তু এসবের কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়, সবই কিন্তু সাময়িক সময়ের জন্য। ভালো-খারাপের সংমিশ্রণেই আমাদের জীবন। আপনার জীবনে খারাপ সময় চলছে তার মানে এই নয় যে আপনার জীবনে আর কখনো ভালো সময় আসবে না। কিন্তু তাই বলে বিষণ্ণ হয়ে নিজের কাপুরুষের মতো জীবন শেষ করে ফেলাটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না।

 

একটু অন্য ভাবে চিন্তা করুন

 

আপনি কোনো একটি কাজে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন, অনেক চেষ্টা করার পরও সফল হতে পারছেন না। প্রত্যেকবার হতাশ হওয়ার পর আপনি নতুন কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কি? ব্যাপারটা এমন হলে নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনুন। পরিবর্তনের জন্য নিজেকে কিছু আলাদা সময় দিন। বুঝতে চেষ্টা করুন নিজের কোন ভুলটির কারণে বারবার অকৃতকার্য হচ্ছেন।

 

প্রত্যেক বছর বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই অনেক অকৃতকার্য কিংবা অল্পের জন্য জিপিএ-৫ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর দেখা যায়! তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উচিত, সামনে পরীক্ষা থাকলে  পরীক্ষার আগে থেকেই ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়া যাতে তারা ভালো ফলাফল করতে পারে। এতে করে যদি কোনোভাবে আশানুরূপ ফলাফল নাও আসে, তবুও আফসোস কম হবে।

 

আর যদি কোনো কারণে আপনার রেজাল্ট খারাপ হয়েও যায়, তাহলে সেটাকে একটি দুর্ঘটনা মনে করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। আপনার আজকের ব্যর্থতা, হতে পারে ভবিষ্যতের সফলতার কারণ এবং অন্যজনের প্রতি অনুপ্রেরণা!

 

আবার অনেক সময় আত্মহত্যার জন্য অভিভাবকও দায়ী থাকেন। অনেক অভিভাবক মনে করেন, জিপিএ-৫ না পেলে সন্তানের জীবনটাই বৃথা হয়ে যাবে। যার ফলে অনেক সময় ভালো রেজাল্ট করার পরও অবুঝ শিক্ষার্থীরা নিজেকে অসহায় ও ব্যর্থ মনে করে এবং আত্মহত্যার মতো ভুল পথটি বেছে নেয়।

 

আপনি যদি একজন অভিভাবক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার উচিত পরীক্ষার সময় আপনার সন্তানের প্রতি বাড়তি খেয়াল রাখা। বাড়তি খেয়াল রাখার মানে কিন্তু এই না যে আপনি তাকে সবসময় পড়ার চাপের মধ্যে রাখবেন। যে করেই হোক তাকে ভালো রেজাল্ট করতেই হবে, জিপিএ-৫ পেতেই হবে-এমন কথা বার বার বলবেন না। সন্তানকে সবসময় উৎসাহ দিতে হবে সুন্দর উপায়ে বুঝিয়ে বুঝিয়ে। কেন তার জীবনে ভালো রেজাল্ট করা প্রয়োজন-এটা বুঝানোটা আপনার কাজ। তারপরও যদি রেজাল্ট খারাপ হয়ে যায়, কখনোই বকাঝকা করা বা কটু কথা বলা উচিত নয়। কারণ রেজাল্টের চেয়ে সন্তানের ভেতর মূল্যবোধ জাগিয়ে তাকে এগিয়ে যাওয়ার পথটা দেখানোর প্রয়োজনটাই বেশি

 

পরিবারের কথা ভাবুন

 

যেকোনো খারাপ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে একটি বার প্রিয় মানুষগুলোর কথা ভাবুন, আপনার জীবনে প্রিয়জনদের অবদানের কথা ভাবুন, বাবা-মায়ের কষ্টের কথা একটু ভাবুন। শুধুমাত্র নিজের চিন্তা বাদ দিয়ে সার্বিকভাবে চিন্তা করুন। হয়তোবা এখন আপনার কাছে এই পৃথিবীটাকে মূল্যহীন মনে হচ্ছে, কিন্তু ভুলে যাবেন না, অনেকের কাছে আপনিই তাদের পৃথিবী।

 

যে পরিবার অনেক কষ্ট করে আমাদের একটা ভাল অবস্থানে নিয়ে এসেছে, আমাদেরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে, আসুন না সেই পরিবারের কথা ভেবে আত্মহত্যার মতো কাজকে না বলি।

 

নিজেকে সময় দিন

 

অনেকে আছেন প্রেম-কর্মজীবন এমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে একেবারেই হতাশ হয়ে যান। বিভিন্ন কারণে প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে, বিবাহ বিচ্ছেদ হতেই পারে। কিন্তু সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেই যে আপনার জীবন থেমে যাবে তা কখনোই না। সময়ের মতো জীবনও কারো জন্যেই থেমে থাকে না!

 

ভেবে নিন আপনি আরেকবার নিজের জীবনকে নতুন করে শুরু করার সুযোগ পেলেন। কখনো জীবনে এমন সময়ের সম্মুখীন হলে নিজেকে একটু বিরতি দিন। প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটান। প্রয়োজন হলে কয়েকদিনের জন্য একঘেয়ে জীবন থেকে ছুটি নিয়ে দূরের কোথাও থেকে ঘুরে আসুন। নিজের জীবনকে শেষ নয়, আবার নতুন করে সাজাতে শিখুন।

 

হার মেনে নিবেন না

 

আমি ব্যর্থ, আমি কিছুই পারি না, আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না, কেন আমার সাথেই এমন হলো- এরকম চিন্তা যখন একজন মানুষের মাথায় আসে, তখন সে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এসব চিন্তা মাথা থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলুন।

 

ছোটবেলা আমরা সবাই পড়েছি, “একবার না পারিলে, দেখ শত বার”। আপনি এখন কোনো কাজে সফল হতে পারছেন না, কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে আপনি ভবিষ্যতেও সফল হতে পারবেন না। জীবনে ব্যর্থতা আসতেই পারে। হতে পারে আপনি ভুল কাজ নির্বাচন করেছেন, হতে পারে আপনার চেষ্টায় কোনো কমতি ছিলো কিংবা সময় আপনার অনুকূলে ছিলো না। তাই যতো যা-ই হোক, কখনো হার মেনে নিবেন না।

 

হতেই পারে আপনার একটি স্বপ্ন পূরণ হয়নি, কিন্তু তাই বলে কী আপনি স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিবেন? নতুন করে আরো ৫টি স্বপ্ন দেখুন না! স্বপ্ন দেখার তো কোন সীমাবদ্ধতা নেই। আপনার একটি রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে, নতুন আরেকটি রাস্তা খুঁজে বের করতে হবে।  সেজন্য প্রয়োজন শুধুমাত্র নিজের উপর বিশ্বাস এবং ধৈর্য।

 

নিজের দুঃখ-কষ্ট প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুন

 

আত্মহত্যার প্রবণতা কমানোর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো কী কারণে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করছে সেই সমস্যার কথা প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করা। অনেক সময় আপনজনের সাথে কথা বলে অনেকটা আশ্বস্ত হওয়া যায়। যাদের আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা হয় তাদের একা সব সামলানোর চেষ্টা না করে অন্যের সাহায্য নেওয়া উচিত এবং দরকার হলে কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া উচিত। প্রতিটি আত্মহত্যার বিরূপ প্রভাব পড়ে আত্মহত্যাকারীর পরিবারের, আত্নীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবের উপর। একটি আত্মহত্যার ঘটনা একটি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সুখ-শান্তি কেড়ে নেয়।

 

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, “Life is not a bed of roses” যার বাংলা অর্থ হচ্ছে, “জীবন পুষ্প শয্যা নয়”। জীবনে উত্থান, পতন, সমস্যা- থাকবেই! জীবনে চলতে হলে আপনাকে এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেই হবে।

 

জীবনটা তো কোনো সিনেমা নয়, যে তিন ঘণ্টায় সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে! নিজের চারপাশে একটু লক্ষ্য করুন। শারীরিক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুটি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করে। দশ বছরের ছোট্ট শিশু অথবা সত্তরেরও বেশি বয়সের বৃদ্ধ ব্যক্তি যিনি নিজেই ঠিকমত চলতে-ফিরতে পারেন না-তিনিও কিন্তু পেটের দায়ে রিক্সা টানেন। তাঁরা তো জীবন যুদ্ধে হার মেনে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়নি। তাহলে আপনি কেন জীবন যুদ্ধে লড়তে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছেন?

 

জীবন কিন্তু একটাই। আর এই জীবনের জন্যই আমাদের সব। জীবন আছে বলেই প্রেম, অভিমান, স্বপ্ন, সুখ, দুঃখ সবকিছু আছে। জীবন অনেক সুন্দর ও মূল্যবান। তাই খারাপ সময়ে মনকে শক্ত রাখুন এবং নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী দলে যোগদান করুন ও অন্যের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখুন। ধর্মীয় কাজে মনোনিবেশ করুন। প্রয়োজন হলে মেডিটেশন ও ইতিবাচক চিন্তা করুন। কিছুটা হলেও মনে শান্তি আসবে। সবসময় মনে রাখবেন, আত্মহত্যা কখনো কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না।

 

একটু চিন্তা করে দেখুন, আত্মহত্যার মাধ্যমে আপনি কী প্রমাণ করলেন? অন্যদেরকে কী শিক্ষা দিয়ে গেলেন? হতে পারে আপনাকে অনুসরণ করে আরো ৫জন এই পথ বেছে নিবে। কিন্তু এটাই কি আপনি চেয়েছিলেন? 

 

আমাদের আপনজনরাও অনেক সময় বিষণ্ণতা, একাকীত্ব, চরম হতাশা, আর্থিক ও সামাজিকসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে থাকে। একসাথে থাকা সত্ত্বেও আমরা একজন আরেকজনের এসব খবর জানতেই পারি না! আবার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে স্ক্রল করে আমরা যা দেখছি তা-ই বিশ্বাস করে নিই, ভেবে নিই বাকিরা সবাই ভালোই আছে! কিন্তু মানুষগুলো কি সত্যিই ভালো আছে নাকি তাদের মাঝেও হতাশা থাকে? -এ খবর আমরা কয়জনই বা জানি! আচ্ছা, আমরা কি সত্যিকার অর্থে নিজেদেরকে চিনছি নাকি ইন্টারনেটে বন্দি হয়ে কেবলই নিজেদের হতাশা ডেকে আনছি?

 

আমরা যদি একটু সহানুভূতিশীল হয়ে একে অন্যের কষ্টের সময়ে পাশে থেকে, কারোর কষ্টকে তার মতো করে বুঝতে চেষ্টা করি- তাহলেই এই ভয়াবহ পথ থেকে একজন মানুষকে বের করে আনা সম্ভব। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়তই বেঁচে থাকার চেষ্টায় মগ্ন থাকি। কিন্তু আমাদের উদাসীনতার কারণে যদি আরেকটি সম্ভাবনাময় জীবন ঝরে পড়ে, তাহলে কি আমরা এর দায়ভার কখনো এড়াতে পারবো? সকলের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রইল!

Nabila Chowdhury

Blog Writer - SpikeStory

More Posts

Follow Me:
facebook LinkedIn twitter