3564 Views

দুপুরবেলা হুট করে একটা চাকরির ইন্টারভিউ কল যখন এসেছিল, অর্পা তখন বেশ খুশি। পরদিন দশটায় পরিপাটি জামা পরে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে পেল প্রথম বিপত্তি। দুইটিমাত্র খালি জায়গার জন্য অপেক্ষা করছে দশজন! মনটা দূর্বল হয়ে গেল তখন থেকেই। এরপর তার ডাক যখন এলো, রুমে চেয়ারে পাশাপাশি বসা গম্ভীর চেহারার মানুষগুলোকে দেখে সে এতই ভড়কে গেল, যে তারা যতই সহজ হতে বলে, অর্পা তা আর কিছুতেই পারে না। ফলে, যে চাকরিটা সহজেই তার হতে পারতো, সেটা না পাবার আফসোস নিয়ে ফিরতে হলো বাসায়। 

 

ইন্টারভিউ নিয়ে এই অভিজ্ঞতা আছে অর্পার মত হাজার হাজার মানুষের, বিশেষ করে নতুনদের। অথচ, ইন্টারভিউ ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও এত কঠিন না যদি সামান্য কিছু প্রস্তুতি থাকে। আসুন জেনে নেই কী প্রস্তুতি নিয়ে গেলে চমৎকার একটা ইন্টারভিউ দিয়ে অর্পা বাসায় ফিরতে পারত, আশা করা যায় অন্তত আপনি পারবেন।

 

প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জানা

 

প্রথম শর্ত, যে প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন, সেটা সম্পর্কে অবশ্যই জেনে যেতে হবে। প্রযুক্তির এই যুগে কোনো কোম্পানির ওয়েবসাইটে গেলেই পেয়ে যাবেন যেকোনো তথ্য। সেখানে কাজ করে বা করেছে, এমন পরিচিতজন থাকলে তাদের সাহায্যও নিতে পারেন। মোটকথা, যেভাবেই হোক কোম্পানির সাধারণ সব তথ্য যেন আপনার নখদর্পনে থাকে। কারণ, যদি জুড়ি  বোর্ডের সদস্যরা যখম দেখবে তাদের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আপনার ধারণা এত স্বচ্ছ, তারা বুঝতে পারবে আপনি চাকরিটি কত গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন।

 

যে পোস্টের জন্য যাচ্ছেন, সেটার ব্যাপারে পূর্ণজ্ঞান রাখবেন

 

এটা একটা অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। আপনার আবেদন করতে যাওয়া পোস্টটি সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনে কখনওই যাবেন না। অনেকসময় এই ভুল করার কারনে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। তাছাড়া আপনার দায়িত্বগুলো জেনে নিয়েই ইন্টারভিউ বোর্ডে সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর তৈরি করে রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির বেছে দেওয়া দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্য থেকে কোন কোন বৈশিষ্ট্যগুলো আপনার আছে অথবা নেই সবকিছু মাথায় রেখেই দিতে হবে উত্তর।

 

আপনার ‘সেলিং পয়েন্ট’ নিয়ে নিঃসন্দেহ  থাকবেন

 

সেলিং পয়েন্ট হল আপনার এমন একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য যার কারনে ইন্টারভিউ বোর্ড আপনাকে পছন্দ বা বাছাই করতে বাধ্য হবে। সবার সেলিং পয়েন্ট একরকম না। কেউ হয়ত অনেক বেশি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, কেউ আবার খুব ভাল রেজাল্ট নিয়ে এসেছে। কাজেই আপনাকে আগে ওই পোস্টটির জন্য নিজের সেলিং পয়েন্ট সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। এবং ইন্টারভিউ শুরুর পর একদম প্রথম পাঁচমিনিটের মধ্যেই জুড়িবোর্ডকে বিষয়টি জানিয়ে দেবার চেষ্টা করবেন।
এক্ষেত্রে আগে থেকেই নিজের সব যোগ্যতা এবং বিশেষ গুণাবলীর একটি লিস্ট করে ফেলতে পারেন। এরপর আপনার অ্যাপ্লাই করা পোস্টটিতে যেসব আবশ্যক গুণাবলী প্রয়োজন, সেটার সাথে নিজের গুণগুলো মিলিয়ে দেখতে পারেন। এই দুইয়ের সমন্বয় করলেই খুঁজে পাবেন আপনার বিশেষ সেলিং পয়েন্টগুলো।

 

কমন ইন্টারভিউ প্রশ্ন-উত্তর ভালোভাবে জেনে যাবেন 

 

গুগলে কমন ইন্টারভিউ প্রশ্নউত্তর খুব সহজেই পাওয়া যায়। আপনার পছন্দমত বাছাই করে একটা লিস্ট করে ফেলুন। তারপর উত্তরগুলো সুন্দরভাবে বলা প্রাকটিস করুন। অনেকেই এই কাজটা করে না এটা ভেবে যে, সহজ উত্তর যেকোন সময় প্রস্তুতি ছাড়াই দেওয়া যায়। অথচ উত্তর গুছিয়ে বলা প্রাকটিস করলে যেকোন নার্ভাস অবস্থাতেও আপনি আমতা আমতা করবেন না। সেই সাথে জুড়ি বোর্ডের কাছে আপনার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। আর, এরমধ্যেই আপনার এক্সপেক্টেড স্যালারি নির্ধারণ করতে ভুলবেন না। এই কাজটির সুফল একবার করলেই বুঝতে পারবেন।

 

আপনার দূর্বলতার কথা মাথায় রেখে উত্তর সাজাবেন

 

একদম পারফেক্ট হওয়া তো সম্ভব না। কিছু দুর্বলতা থাকবেই। আপনি যদি আগেই জেনে যান, এই পোস্টে কাজ করতে আপনার সম্ভাব্য দুর্বল দিকগুলো কি কি, তাহলে সে ব্যাপারে জুড়ি বোর্ডের কঠিন প্রশ্ন থেকে নিজেকে রক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে রাখবেন। চাইলে কোনো সুন্দর উত্তর তৈরি করতে পারেন, অথবা কথার মোড় ঘুরিয়ে নেবার বুদ্ধিও বের করতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, কখনোই যেন এমন পরিস্থিতিতে না পড়তে হয় যে আপনার পক্ষ থেকে চুপ থাকা ছাড়া উপায় নেই! উপস্থিতবুদ্ধি, কৌশল দক্ষতা দিয়ে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করতে হবে।

 

বিব্রতকর পরিস্থিতি সামাল দেবার মনোভাব রাখতে হবে

 

জুড়ি বোর্ডে অনেকসময়ই পড়তে হয় বিব্রতকর অবস্থায়। অনেকেই বিশেষ গোষ্ঠী বা  জাতিবিদ্বেষী, বর্ণবাদী মন্তব্য করেন। এধরনের পরিস্থিতিতে পড়ার মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। মাথা ঠাণ্ডা রেখে পদক্ষেপ নেয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। তবে যদি কোনো অন্যায় কিছু আপনার সাথে করা হয় বা কোনো ব্যক্তিগত ব্যাপারে আক্রমণ করে কথা বলা হয়, তাহলে সেখান থেকে অবস্থা বুঝে প্রতিবাদ করে চলে আসতেও পিছপা হবেন না। সব অবস্থাতেই নিজের আত্মসন্মানবোধ অটল থাকতে হবে।

 

আত্মবিশ্বাসই এনে দেবে সাফল্য

 

আত্মবিশ্বাসী মানুষ কে না পছন্দ করে। নিজেকে তুলে ধরতে আত্মবিশ্বাসের কোন বিকল্প নেই। আর এই আত্মবিশ্বাস তখনি আসবে, যখন আপনি নিজে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবেন, সত্যিই আপনি কাজটির জন্য উপযুক্ত। অনেকে আত্মবিশ্বাসের সাথে দাম্ভিকতাকে মিলিয়ে ফেলে সমস্যায় পড়ে যায়। আপনার কথা শুনে যেন কোনভাবেই মনে না হয় যে আপনি নিজেকে নিয়ে অহংকার করে কিছু বলছেন। বরং আপনি যে সত্যি যোগ্য তা খুব স্পষ্টভাবে কিন্তু নম্রসুরে বলুন। আপনার সব আচরনেই যেন এই আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে।

 

মনে রাখবেন, “If you have no confidence in self, you are twice defeated in the race of life.” -Marcus Garvey

 

হাসিমুখে কথা শেষ করুন

 

কথায় আছেসব ভাল তার, শেষ ভাল যার।”

 

খুব ভালো একটা ইন্টারভিউ যদি শেষ হয় অসমাপ্ত ভাবে, তাহলে পুরোটাই পণ্ডশ্রম! কথা শেষ করুন হাসিমুখে। মনে রাখবেন, আপনার সেলিং পয়েন্ট পরিষ্কারভাবে না বুঝিয়ে চলে আসবেন না। আত্মবিশ্বাসী হাসি দিয়ে বিদায় সম্ভাষণ জানাবেন। যেন, আপনি বের হয়ে যাবার পর জুড়ি বোর্ডের মনে হয়, খুব ভাল একটি ইন্টারভিউ শেষ হয়েছে।

 

এছাড়া ছোট কিছু ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। যেমনঃ

 

১। পরিপাটি পোষাক পরতেই হবে। এতে শুধু দেখতে ভালো লাগবে তাই না,  আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। যেই কোম্পানিতে ইন্টারভিউ, তাদের বিশেষ কোন বিধিনিষেধ আছে কিনা, সেটাও জেনে নিতে হবে।

 

২। সমৃদ্ধ একটি সিভি অবশ্যই তৈরি করতে হবে। ইন্টারভিউ বোর্ডে সাধারণত সিভি দেখেই প্রশ্ন করে। কাজেই সেখানে যেন কোনোভাবেই বানানের ছোট বড় কোন ভুল না থাকে। তাছাড়া, খামে ভরে সিভির একটি হার্ডকপি নিতেও ভুলবেন না।

 

সবশেষে মনে রাখবেন, ইন্টারভিউ খারাপ কিনবা ভাল, যাই হোক না কেন, প্রতিবারই আপনি নতুন কিছু শিখবেন। যেটা আপনাকে প্রস্তুত করবে পরের যুদ্ধের জন্য। তাই, ঘাবড়ে না গিয়ে, আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করুন। সাফল্য আসবেই। 

Rifat Rahman Papri

নিজেকে একজন উৎসাহী এবং ইতিবাচক মানুষ হিসেবে ভাবি। আমি অনেক কিছু চিন্তা করি। প্রায়ই সেই চিন্তা অন্যদেরও জানাতে ইচ্ছা করে। তখন সৃজনশীলতাকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেই। লেখা, আঁকা, কিংবা সুর, ক্যানভাস যেটাই হোক, সবসময় চেষ্টা করি তাতে করা শিল্পকর্মটা যেন নিখুঁত হয়।

More Posts

Follow Me:
facebook LinkedIn twitter