2201 Views

কয়েকদিন আগে ফেসবুক নিউজফিডে এক বন্ধুর বায়ো দেখছিলাম – A depressed soul.  আজকাল নিজেকে ডিপ্রেসড দাবি করা মানুষের সংখ্যা অগণিত। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৬০% টিনএজার কোনো না কোনোভাবে ডিপ্রেশনে ভুগছে। আমাদের দেশেও এই হার নিতান্ত কম নয়। ডিপ্রেশন বা হতাশা – একটা সময়ে যা ছিল শুধুমাত্র গল্প, কবিতা গানের অনুষঙ্গ, আজ তা মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের মনোজগতে। রোজ অসংখ্য মানুষ নতুন করে হতাশায় ডুবে যাচ্ছে, আবার হতাশা কাটিয়ে ওঠা মানুষের গল্পও আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতেই দেখতে পাই। জিরো থেকে হিরো হয়ে ওঠা এসব মানুষের মত আমরাও পারি আমাদের জীবন থেকে হতাশাগুলিকে ঝেড়ে ফেলে দিতে। আসুন তবে জেনে নিই হতাশা কাটিয়ে ওঠার কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর উপায় –  

 

নিয়মিত এক্সারসাইজ করুন

 

এক্সারসাইজ বলতে শুধু ব্যায়াম বা ইয়োগা নয়। আপনি যদি চান সাঁতার কাটতে পারেন, সাইকেল চালাতে পারেন অথবা সকালবেলা পার্কে হেঁটে আসতে পারেন। শরীরের সাথে সাথে মানসিক সুস্থতার জন্যও এক্সারসাইজ খুবই দরকারি। শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়মিত সঞ্চালনের ফলে শরীরে সেরাটোনিন নামক হরমোন বেড়ে যায় এবং এর ফলে স্ট্রেস হরমোন এর কার্যকারিতা কমে যায়। সম্প্রতি প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জয়া আহসান বলেছেন, নিয়মিত ব্যায়াম করে তিনি তাঁর চেহারার কমনীয়তা ধরে রেখেছেন। তারকাখ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিদের রোজকার রুটিনে একটি বিষয় থাকে কমন, আর তা হল ব্যায়াম। তাঁরা যে শুধু শারীরিক সুস্থতার জন্যই ব্যায়াম করেন এমন কিন্তু না, বরং রোজকার হতাশা আর ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার জন্যও এটি কার্যকারী।

 

সুষম পুষ্টিকর খাবার খান

 

খাবারের সাথে ডিপ্রেশনের যোগাযোগ কিছুটা অদ্ভুতই বটে। ডিপ্রেশন এড়াতে অনেককেই খাবারের দোকানে দৌড়াতে দেখা যায়, আবার খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ না থাকলে সেক্ষেত্রেও ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। আমাদের যে সকল বন্ধু-বান্ধবকে নিয়মিত বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে চেক ইন দিতে দেখা যায়, তাদের মধ্যে অনেকেই ডিপ্রেশনজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। যুক্তরাজ্যের প্রিন্সেস ডায়না ডিপ্রেশনজনিত বুলিমিয়া রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তাই ডিপ্রেশন এড়াতে খাবারের দিকে কড়া নজর রাখা উচিত। ফলিক এসিড, ভিটামিন বি১২ এর অভাবে ডিপ্রেশন বেড়ে যেতে পারে। তাই খাবারের পাশাপাশি ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ট্যাবলেট খেতে পারেন। এর সাথে চেষ্টা করুন অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার, পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে।

 

পরিমিত ঘুম খুবই দরকারি

 

যেদিন কোনো কারণে ঠিকমত ঘুম হয় না, হয়তো পড়তে পড়তে রাত ৩ টা বেজে যায়, আবার সকালে ৮ টায় ক্লাস ধরতে হয়, কেমন যায় সেদিনটা? যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন তবে বলবো, ‘পুরো দিনটাই মাটি’। ঘুম তো হয়ই না, ক্লাসের আগামাথাও সব মাথার উপর দিয়ে যায়। আপনারও কি এমন হয়?

 

রোজ আট ঘণ্টার ঘুম আমাদের শরীর ও মন উভয়ের জন্যই প্রয়োজন। যদি আপনি খুব কম অথবা খুব বেশি ঘুমান, তা আপনার মুডের উপর প্রভাব ফেলে। তাই ঘুমের যথাযথ শিডিউল মেনে চলুন। যতই কাজ থাকুক, রাত এগারোটার মধ্যে সব শেষ করে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করুন। অনেকের অভ্যাস থাকে বেশি রাত্রে পড়াশুনা করার, সেক্ষেত্রে অন্য সময়ে পর্যাপ্ত ঘুমিয়ে নিতে হবে।

 

করতে পারেন ‘মেডিটেশন’

 

একটা সময়ে মেডিটেশন বলতে শুধুই চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকাকে বুঝতাম। আর এখন? ইউটিউবের কল্যাণে মেডিটেশন কি, কিভাবে করতে হয়, এর সুবিধা অসুবিধা আমাদের মুখস্ত। তবে কঠিন হল সময় করে নিয়মিত মেডিটেশন করা। মেডিটেশন এর জন্য সকাল বেলাটাই উপযুক্ত। তবে সকালে সময় না হলে অন্য কোনো ফাঁকা সময়ে করে নিতে পারেন। রোজ ২০ মিনিটের মেডিটেশন শুধুমাত্র ডিপ্রেশন কমাতেই সাহায্য করে না, সাথে সাথে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা থেকেও দূরে রাখে। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এমন কোনো ওয়েবসাইট আপনি পাবেন না, যেখানে মেডিটেশন নিয়ে অন্তত দু’চারটে কথা লেখা নেই। শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণের সাথে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে মেডিটেশনের জুড়ি নেই।

 

পরিবারের সাথে সময় কাটান

 

আজকাল ছুটির দিন ছাড়া পরিবারের সবাই একসাথে বসে গল্পগুজব করা তেমন হয়ে ওঠে না। তবে আর যাই হোক, ছুটির দিনে সবাই মিলে রান্না করা, একসাথে ডাইনিং টেবিলে হইহই করতে করতে খাওয়া-দাওয়া, বিকেলে একটু হাওয়া খেতে বের হওয়া আর হাওয়া খেয়ে পেট না ভরলে সবাই মিলে ফুচকা খেতে খেতে দেখবেন হতাশাগুলো কেমন ফিকে হতে শুরু করে।

 

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলেমেয়েদের মধ্যে ডিপ্রেশন এর হার অনেক বেশি। আবার, যৌথ পরিবারে বাস করে এমন টিনএজারদের ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা অসাধারণ। আমাদের বেড়ে ওঠা, শিক্ষাজীবন, সামাজিক জীবন সবক্ষেত্রে পরিবারই আমাদের মূল ভিত্তি। চরম হতাশার মুহূর্তে আর কাউকে পাশে না পেলেও পরিবারের সবার সাহায্যে পেলে তা কাটিয়ে উঠা অসম্ভব নয়।

 

রোজ একটি করে ভাল কাজ করুন

 

ভাল কাজের সংজ্ঞা কী? খুব ছোট ছোট কাজ যা হয়তো আমরা রোজ করি, যা অন্যের সামান্য হলেও উপকার হয়। কেউ হয়তো আজকে ক্লাসে আসেনি, তাকে ক্লাসের আপডেট জানিয়ে দিলেন। পরিচিত কারো জ্বর, জ্বর কমেছে কি না তার এই খোঁজটুকু নিলেন। অথবা কেউ রাস্তা পার হতে পারছে না, তাকে হাত ধরে রাস্তা পার করে দিলেন। যাই করুন না কেন, সেগুলো একটা ডায়েরীতে টুকে রাখুন। মাস শেষে দেখবেন, ৩০টা ভালো কাজ আপনি করে ফেলেছেন। হোক না ছোট, হোক না সামান্য। ‘আমিও ভালো কিছু করতে পারি’- এই ভাবনাটাই আপনাকে সকল নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা থেকে দূরে রাখবে।

 

নিতে পারেন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

 

এতো গেল নিজে নিজে কীভাবে ডিপ্রেশন থেকে দূরে থাকা যায়, কীভাবে ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠা যায় তার বৃত্তান্ত। যদি এর পরেও হতাশা থেকে মুক্তি না পান, তাহলে দেরি না করে আপনার উচিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। আমাদের দেশে সাইক্রাটিসের কাছে যাওয়া বা কাউন্সেলিং করাকে এখনো পাগলের চিকিৎসা হিসেবে দেখা হয়। ডিপ্রেশন বা হতাশার মতো মানসিক সমস্যাকে হয় আমরা রোগ হিসেবেই ধরি অথবা মোটাদাগে পাগলামি আখ্যা দিয়ে থাকি। অভিনেত্রী দিপীকা পাড়ুকোন একটা সময়ে হতাশায় ভুগেছেন এবং তিনি তা নিয়ে মোটেও লজ্জিত নন। অন্য শারীরিক সমস্যার মত ডিপ্রেশনেরও প্রতিকার আছে। তাই কোনোরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব না রেখে আপনি একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে উপরের কাজগুলোর পাশাপাশি আপনাকে শুধু কিছু ঔষুধপত্র খেতে হতে পারে।

 

জীবনে যাই চাই, তার সব কিছু কি পাওয়া যায়? সবকিছু পাওয়া কি কখনো সম্ভব? কখনোই না। এই না পাওয়া থেকে আপনার দুঃখবোধ আসবে, হতাশা জাঁকিয়ে বসবে, যা আপনাকেই ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে। যা হয় হোক, সব ভুলে উঠে দাঁড়ান, প্রাণ খুলে হাসুন, মনের সব দরজা জানালা খুলে দিন। ভালো কিছু আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, শুধু হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরার অপেক্ষা।